Published : 05 Jun 2026, 04:56 PM
মানবসভ্যতার ইতিহাসে কিছু ঘটনা কেবল অতীতের যুদ্ধ বা ধ্বংসের কাহিনি হয়ে থাকে না, ভবিষ্যতের রাজনীতির জন্য এক ধরনের সতর্কবার্তায় পরিণত হয়। পারস্যের বিখ্যাত নগরী নিশাপুরের ধ্বংস তেমনই একটি উদাহরণ, যেখানে প্রতিশোধের আগুন একটি সমৃদ্ধ শহরকে ইতিহাসের মানচিত্র থেকে প্রায় মুছে দিয়েছিল।
জনশ্রুতি ও কিছু ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ আছে, চেঙ্গিস খানের কন্যা, যাকে বিভিন্ন সূত্রে ‘তুমেলুন’ নামে উল্লেখ করা হয়, শপথ করেছিলেন: যে নগরীতে তার স্বামী নিহত হয়েছেন, সেই নগরীকে এমনভাবে ধ্বংস করতে হবে যেন সেখানে কোনো প্রাণের অস্তিত্ব না থাকে। যদিও এই কাহিনির ভাষ্য ও নামের ভিন্নতা আছে, তবুও এর কেন্দ্রে রয়েছে এক নির্মম প্রতিশোধের গল্প, যা ১৩শ শতকের মোঙ্গল অভিযানের প্রকৃতি বোঝাতে গুরুত্বপূর্ণ।
নিশাপুর ছিল খোয়ারিজম সাম্রাজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ নগরী, যা ১২শ ও ১৩শ শতকে পারস্যের (বর্তমান ইরান) অন্যতম সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। এটি ছিল কবি, দার্শনিক ও জ্ঞানীদের আবাসস্থল। বিশেষ করে বিখ্যাত পারস্য কবি ও গণিতবিদ ওমর খৈয়ামের নাম এই শহরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। শহরটি সিল্ক রোডের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়ায় বাণিজ্যিক দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
উল্লেখ্য, খোয়ারিজম সাম্রাজ্য ছিল মধ্য এশিয়া ও পারস্য অঞ্চলের একটি শক্তিশালী সুন্নি মুসলিম সাম্রাজ্য। ১১শ শতকের শেষভাগে কুতুবউদ্দিন মুহাম্মদের হাতে এর স্বাধীন যাত্রা শুরু হয়। সুলতান আলাউদ্দিন খোয়ারিজম শাহের আমলে এটি এশিয়ার অন্যতম সমৃদ্ধ সাম্রাজ্যে পরিণত হলেও, ১২১৯ সালে চেঙ্গিস খানের মোঙ্গল বাহিনীর আক্রমণে সাম্রাজ্যটির পতন ঘটে।
১২১৯ থেকে ১২২১ সালের মধ্যে চেঙ্গিস খান খোয়ারিজম সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে এক ব্যাপক সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন। এর পেছনে ছিল রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক বিরোধ, বিশেষ করে ওতরার শহরে মঙ্গল বণিকদের হত্যার ঘটনা। এই ঘটনার প্রতিশোধ হিসেবে চেঙ্গিস খান একের পর এক নগরী আক্রমণ করতে থাকেন।
নিশাপুর অবরোধের ক্ষেত্রে মোঙ্গল সেনাপতি তোগাচার বা তোকুচার নেতৃত্ব দেন। শহরটি অবরোধ করে রাখার সময় শহর প্রতিরক্ষাবাহিনীর নিক্ষিপ্ত এক তীরে তিনি নিহত হন। তার মৃত্যু মোঙ্গলদের মধ্যে তীব্র প্রতিশোধস্পৃহা সৃষ্টি করে।
তোগাচার ছিলেন চেঙ্গিস খানের কন্যা তুমেলুনের স্বামী। তার মৃত্যুর সংবাদ শোনামাত্র তুমেলুন ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। তিনি তার পিতাকে বলেন, “বাবা, আমি এ নগরীর বিনাশ চাই। যে নগরীর জন্য আমার স্বামী মারা গেল, সে নগরীকে চিরদিনের জন্য বিরানভূমি করে দিতে হবে।”
চেঙ্গিস খান তার পুত্র তোলুই খানকে নির্দেশ দেন নিশাপুরকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করার। তোলুই ছিলেন চেঙ্গিস খানের চতুর্থ পুত্র এবং মোঙ্গল সাম্রাজ্যের একজন দক্ষ সেনাপতি। বিশাল এক সেনাবাহিনী নিয়ে তিনি নিশাপুর অভিমুখে যাত্রা করেন এবং শহরটি ঘেরাও করেন।
নিশাপুরের শাসনকর্তা শরাফ আল-দিন আমির মজলিশ এই বিপদ বুঝতে পেরে একজন দূত পাঠান তোলুইয়ের কাছে। তিনি নগরীর পক্ষ থেকে দয়া ও সন্ধির আবেদন জানিয়েছিলেন। শর্ত সাপেক্ষে কর দিতেও রাজি হয়েছিলেন।
কিন্তু তোলুইয়ের উত্তর ছিল নির্মম: তোগাচারের রক্তের মূল্য দিতে হবে নগরবাসীকে। এমনকি সেই দূতকেও ফিরে যেতে দেওয়া হয়নি। শেষ পর্যন্ত মোঙ্গলরা নগরের প্রাচীর ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে এবং শরাফ আল-দিনকে হত্যা করে।
এরপর যা ঘটেছিল, তা ইতিহাসের জঘন্যতম গণহত্যাগুলোর একটি। নারী, পুরুষ, শিশু, বৃদ্ধ—কাউকেই বাঁচানো হয়নি। ইতিহাসবিদদের মতে, এমনকি গৃহপালিত জন্তু—কুকুর, বেড়াল পর্যন্ত রক্ষা পায়নি। নগরের বাইরে নিহতদের মাথা আলাদাভাবে তিনটি বিশাল পিরামিডের আকারে সাজানো হয়েছিল—পুরুষের মাথা, নারীর মাথা ও শিশুদের মাথা দিয়ে। কথিত আছে, ধ্বংসস্তূপের ওপর বার্লি ও লবণ ছড়িয়ে দেওয়া হয়, যাতে নতুন কোনো উদ্ভিদ জন্মাতে না পারে এবং আর কখনও এই ভূমিতে নতুন বসতি গড়ে না ওঠে। তুমেলুন সেই ধ্বংসস্তূপের ওপর দিয়ে ঘোড়া ছুটিয়েছিলেন, যা ছিল তার প্রতিশোধের চূড়ান্ত প্রকাশ। কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে, এই ধ্বংসযজ্ঞে প্রায় ১৭ লাখ ৪৭ হাজার মানুষ নিহত হয়েছিল।
নিশাপুরের ধ্বংসের ফলে শহরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ওমর খৈয়ামের সমাধিও এই ধ্বংসযজ্ঞে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। পরবর্তীকালে তার কবর পুনর্নির্ধারণ ও পুনর্নির্মাণ করা হয়। আধুনিক ইরানে নিশাপুরে খৈয়ামের একটি স্মারক সমাধি ও জাদুঘর রয়েছে, যেখানে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও ঐতিহাসিক উপকরণ সংরক্ষিত আছে।
এই ঘটনার মূল শিক্ষা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। যেখানে প্রতিশোধ রাষ্ট্রীয় নীতি হয়ে ওঠে, সেখানে ধ্বংস কোনো সীমা মানে না। ইতিহাসবিদরা মনে করেন, নিশাপুর কেবল একটি শহরের পতনের ইতিহাস নয়, বরং প্রতিশোধনির্ভর রাজনীতির চূড়ান্ত পরিণতির প্রতীক।
নিশাপুরের ধ্বংসের ঘটনাটি ইতিহাসের এক বড় প্রশ্নও তুলে ধরে—প্রতিশোধের আগুনে আসলে কী শেষ হয়? তুমেলুন কি সত্যিই স্বামীর মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে পেরেছিলেন? সম্ভবত না। কারণ তার স্বামীর মৃত্যু হয়েছিল এক যুদ্ধে, যা ছিল যুদ্ধেরই অনিবার্য পরিণতি। কিন্তু তার বদলে তিনি যে গণহত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন, তাতে অসংখ্য নির্দোষ মানুষের প্রাণ গিয়েছে। প্রতিশোধ কখনো শোককে নিরাময় করে না, বরং আরও শোকের জন্ম দেয়।
আজকের বাংলাদেশের রাজনীতির দিকে তাকালেও আমরা একই প্রতিশোধের দুষ্টচক্র দেখতে পাই। এই প্রতিশোধের রাজনীতির সূচনা হয়েছিল সামরিক শাসকদের হাত ধরে, যা এখনও বিভিন্ন রূপে বহমান। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিভিন্ন সময় ক্ষমতাকেন্দ্রিক দ্বন্দ্বে প্রতিশোধমূলক রাজনীতির অভিযোগ উঠেছে। একসময় খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন, মামলা ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত করার অভিযোগ যেমন উঠেছিল, তেমনি পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে বিএনপি ও খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ব্যাপক আইনি ও প্রশাসনিক চাপ প্রয়োগের অভিযোগও আলোচনায় এসেছে। এরপর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করার প্রয়াস চালানো হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য ভাঙচুর থেকে তার স্মৃতিবিজড়িত ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। শেখ হাসিনাসহ দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারা দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। যারা পালাতে পারেননি, তারা দিনের পর দিন জেল খাটছেন। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হয়নি। শেখ হাসিনার আমলেও এমনটা ঘটেছে, দলগতভাবে বিএনপির ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ না করা হলেও ছলেবলে-কৌশলে দলটিকে নির্বাচন থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে। বহু সমালোচিত ‘আয়নাঘরে’ গুম থাকা মানুষেরা পরবর্তীতে ফিরে এসে শুনিয়েছেন তাদের নির্যাতিত হওয়ার ভয়াবহ সব গল্প।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আয়নাঘরের মতো বিগত আমলের সব ঘটনা উদ্ঘাটনের পাশাপাশি প্রায় চব্বিশ হাজার রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারের যে উদ্যোগ নিয়েছিল, তা এক ইতিবাচক পদক্ষেপ হতে পারত। কিন্তু যুদ্ধাপরাধে দণ্ডিতদের রায়, একুশে অগাস্টের গ্রেনেড হামলা ও ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলার মতো অসংখ্য আলোচিত ও সংবেদনশীল মামলার আসামিদের 'রাজনৈতিক হয়রানি' বিবেচনায় খালাস দেওয়া, এমনকি উগ্রবাদী গোষ্ঠীর দণ্ডিত সদস্যদের জামিন ও মামলা প্রত্যাহারের ঘটনাগুলো এই প্রক্রিয়াকে বিতর্কিত করেছে। আবার একই সময়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, সাংবাদিক, খেলোয়াড় ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের বিরুদ্ধে যেভাবে গণহারে নতুন ‘গায়েবি মামলা’ দায়ের করা হয়েছে, তা ন্যায়বিচার প্রক্রিয়ার মূল উদ্দেশ্যকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। অতীতের পক্ষপাতদুষ্ট বিচার ব্যবস্থার সংস্কার ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার যে প্রতিশ্রুতি নিয়ে এই সরকার যাত্রা শুরু করেছিল, তা নতুন করে দায়ের হওয়া এসব হয়রানিমূলক মামলার কারণে আজ চরমভাবে বিতর্কিত।
ক্ষমতার পালাবদলের চেনা রূপে কোনো পরিবর্তন তারেক রহমানের শাসনামলে পরিলক্ষিত হচ্ছে না। আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক আচরণের অভিযোগ রাজনৈতিক বিতর্ককে আরও সরব রেখেছে।
এই ধারাবাহিকতা একটি প্রশ্ন সামনে আনে—রাজনীতি কি কেবল ক্ষমতার পালাবদলের নাম, নাকি এটি প্রতিশোধের চক্রে আটকে থাকা এক অবিরাম পুনরাবৃত্তি? যখন প্রতিটি সরকার পূর্ববর্তী সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিশোধকে ন্যায়বিচার বা শুদ্ধিকরণ হিসেবে তুলে ধরে, তখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে আস্থাহীন হয়ে পড়ে। আইনের শাসন দুর্বল হয়, রাজনৈতিক সংস্কৃতি সহনশীলতার বদলে প্রতিশোধপ্রবণ হয়ে ওঠে।
রাজনৈতিক প্রতিশোধের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এটি একসময় চলমান প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়। এক পক্ষ প্রতিশোধ নিলে অন্য পক্ষ পাল্টা প্রতিশোধে নামে, এবং এই চক্র চলতেই থাকে। এর ফলে রাষ্ট্র একটি স্থিতিশীল ব্যবস্থার পরিবর্তে অস্থিরতার ধারাবাহিকতায় আটকে যায়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাও অনেকটাই প্রতিশোধ আর পাল্টা প্রতিশোধের এই চক্রে বন্দি। এখানে শাসক পরিবর্তন মানেই বিরোধী পক্ষের বিরুদ্ধে নতুন করে আইনগত, প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি।
আজ নিশাপুরের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে ওমর খৈয়ামের সমাধি এবং একটি উন্মুক্ত জাদুঘর ছাড়া আর কিছু অবশিষ্ট নেই। কিন্তু চেঙ্গিস খানের কন্যা তুমেলুন বা পুত্র তোলুই খানের কোনো স্মারক নেই। তারা ইতিহাসে ধ্বংসের প্রতীক হিসেবেই রয়ে গেছেন। বাংলাদেশের রাজনীতির ক্ষেত্রেও প্রশ্ন একই—আমরা কি প্রতিশোধের এই চক্র ভাঙতে পারব, নাকি চেঙ্গিস খানের আরও অনেক পুত্রকন্যা জন্মাতে দেখব?
চিররঞ্জন সরকার লেখক ও কলামনিস্ট। ই-মেইল: [email protected]