Published : 13 Jun 2026, 07:19 PM
দুটি দেশ। যে দুটি দেশের জনসংখ্যা ১৬০ কোটিরও অধিক, যা পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ। অথচ সেখানে মানুষেরই মূল্য নেই। দুই দেশেই নানাভাবে মূল্যহীন মানুষের পরিচয় মেলে। দুই দেশের সীমান্তে প্রতিনিয়ত মানুষের মূল্যহীনতা দৃশ্যায়িত হয়। সেই প্রতিবেশী দেশ দুটি যে ভারত ও বাংলাদেশ নাম না বললেও তা আঁচ করা সম্ভব। গত ১০ জুন মানুষ জন্মানোর এই উর্বরভূমির শূন্যরেখায় দুই দেশের মানুষ আবারও সাক্ষী হলো—সেখানে যে মানুষের মর্যাদা কতটা হীন। রাষ্ট্রের নির্মম সীমানা রাজনীতির কাছে একজন নাগরিক কতটা নিরুপায় হতে পারে।
শূন্যরেখায় দাঁড়িয়ে একজন ষাটোর্ধ্ব মানুষ। দুই দেশের কেউ তাকে নাগরিক বলে স্বীকৃতি দিচ্ছে না। দুই দেশের সীমান্তরক্ষী ও জনগণের আচরণ দেখে মনে হয়, তিনি কোনো এক আদিম মানুষ যিনি ভারত ও বাংলাদেশের শূন্যরেখায় এসে আকাশ থেকে পড়েছেন; যার কোনো রাষ্ট্র নেই, পরিচয় নেই। দিনব্যাপী নির্মমতার দৃশ্যায়ন শেষে প্রমাণিত হয়, এই আদিম মানুষটির নাম ষষ্ঠীচন্দ্র বর্মণ। তিনি বাংলাদেশের নাগরিক। পরে সীমান্তরক্ষীদের সহায়তায় পরিবারের কাছে পৌঁছাতে সক্ষম হন। বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষীরা পরিবারের সন্ধান করে তাকে পরিজনের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। কাজটি অত্যন্ত প্রশংসনীয়।
কিন্তু ঊনমানুষি প্রেক্ষাপটে দৃশ্যায়িত এই ছোট গল্পের এখানেই শেষ নয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা এই সীমান্ত থেকে ওই সীমান্ত দৌড়াদৌড়ি, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এবং অস্ত্রের হুমকির মুখে দাঁড়িয়ে থাকা ষষ্ঠীচন্দ্র বর্মণ আমাদের অনেকগুলো প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। আইনি না বা বেআইনি, বৈধ না বা অবৈধ—এমন প্রশ্ন ছাপিয়ে যে প্রশ্নটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তাহলো ষষ্ঠীচন্দ্র যে ভারতের নাগরিক নন, সেটি তো ভারত আগেই জেনে ফেলেছে এবং তাকে এই অমানবিক পরিস্থিতিতে ঠেলে দিয়েছে। কিন্তু ষষ্ঠীচন্দ্র যে বাংলাদেশের নাগরিক, সেটি জানতে আমাদের এতটা সময় লাগল কেন? কেন ষষ্ঠীচন্দ্রকে এমন অমর্যাদাকর পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হলো?
নিজ দেশের সীমান্তরক্ষী ও জনগণের সামনে একজন নাগরিককে কেন এমন বিভীষিকাময় পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হলো? সীমান্তরক্ষীদের দায়িত্ব শুধু আইনের চশমা পরে পাহারা দেওয়া নয়; নাগরিকদের রক্ষা এবং সম্মান নিশ্চিত করাও তাদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। সব কিছুর একটি বৈধ উপায় আছে এবং সেই প্রশ্নে নাগরিক দোষী হলে তার বিচার হতে পারে। কিন্তু আইনের দোহাই দিয়ে তাকে তো এভাবে সীমান্তের শূন্যরেখায় দাঁড় করিয়ে রাখা যায় না; কারণ এই মাটির অধিকার সবার সমান। তাহলে তার সঙ্গে এমন আচরণ কেন?
ষষ্ঠীচন্দ্র যদি অবৈধভাবে দেশের সীমানা পার হয়ে থাকেন, তাহলে সেটি অপরাধ। কিন্তু সেই জন্য তাকে শূন্যরেখায় দাঁড় করিয়ে রেখে আইনের দোহাই দেওয়া তো তার চেয়ে বেশি অপরাধ। ষষ্ঠীচন্দ্র বর্মণের ভাগ্য সুপ্রসন্ন যে, তার পরিস্থিতি ইরানি শরণার্থী মেহরান কারিমি নাসেরির মতো বা ফিলিস্তিনি শরণার্থী মোহাম্মদ আল বাহিশের মতো হয়নি।

মেহরান কারিমির ঘটনা সারাবিশ্বে বেশ পরিচিত; কারণ পৃথিবীতে দীর্ঘ সময় দেশহীন থাকার সবচেয়ে বড় উদাহরণ ছিল এটি। মেহরান কারিমি নাসেরি বেলজিয়াম থেকে রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়ার পর যুক্তরাজ্যে যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিলেন। তার প্যারিসের একটি রেলস্টেশনে তার ব্রিফকেসটি চুরি যাওয়ায় নথিপত্র হারিয়ে যায়। নথিপত্র ছাড়াই তিনি লন্ডনে পৌঁছান, কিন্তু ব্রিটিশ ইমিগ্রেশন তাকে ফেরত পাঠিয়ে দিলে তিনি প্যারিসের শার্ল দ্য গল বিমানবন্দরের এক নম্বর টার্মিনালে পৌঁছানোর পর সেখানে আটকা পড়েন। ভিসা না থাকায় তিনি ফ্রান্সে প্রবেশ করতে পারছিলেন না এবং পরিচয়পত্র ছাড়া অন্য কোনো দেশে যাওয়ার জন্যও বিমানে উঠতে পারছিলেন না। যার ফলে তিনি ওই বিমানবন্দরের ১ নম্বর টার্মিনালে টানা ১৮ বছর বাস করতে বাধ্য হন। তার এই কাহিনি অবলম্বনেই বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘দ্য টার্মিনাল’ নির্মিত হয়েছিল। জগৎবিখ্যাত পরিচালক স্টিভেন স্পিলবার্গ এই কাহিনি নিয়ে ‘দ্য টার্মিনাল’ নামে সিনেমাটি তৈরি করেন। সেখানে কারিমির নামভূমিকায় অভিনয় করেন অন্যতম বিখ্যাত অভিনেতা টম হ্যাংকস।

মোহাম্মদ আল-বাহিশের সীমানায় হেনস্তার ঘটনা এমন বিখ্যাত না হলেও সেটি রাষ্ট্রের নির্মমতার অন্যতম উদাহরণ। ফিলিস্তিনি এই শরণার্থী তার প্রেমিকাকে বিয়ে করার উদ্দেশ্যে কাজাখস্তানে রওনা দেন। কিন্তু কাজাখস্তানের আলমাতি বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর সেখানকার ইমিগ্রেশন তার ফিলিস্তিনি শরণার্থী হিসেবে পাওয়া ভ্রমণ নথির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে এবং তার কাজাখ ভিসা বাতিল করে দেয়। এদিকে তার ভ্রমণ ভিসার মেয়াদও শেষ হয়ে যায়। তখন তিনি সেখান থেকে তুরস্কে যান কাজাখস্তানের ভ্রমণ ভিসা নবায়নের জন্য, কিন্তু সীমান্ত থেকে তাকে আবার ফেরত পাঠানো হয়। এভাবে তাকে চারবার বিমানে করে এদেশ থেকে ওদেশ নিয়ে যাওয়া হয় এবং কোনো দেশই তাকে প্রবেশের অনুমতি দেয়নি। অবশেষে ১৫০ দিন পর রোমানিয়ায় অবস্থিত ইউএনএইচসিআর-এর শরণার্থী ট্রানজিট কেন্দ্রে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে ফিনল্যান্ডে তাকে আশ্রয় প্রদান করা হয়।
ষষ্ঠীচন্দ্রের এক বিমানবন্দর থেকে অন্য বিমানবন্দরে যেতে না হলেও তাকে এই সামান্য সময় এই দেশের সীমানা থেকে ওই দেশের সীমানায় ঠেলে দেওয়া হয়েছে অনেকবার। শূন্যরেখায় রাষ্ট্রহীন মানুষের মতো অসহায় চোখে তাকিয়ে থাকতে হয়েছে তার।
এই অমানবিকতার প্রশ্ন ছাপিয়ে এই দৃশ্য আরও একটি প্রশ্ন সামনে এনেছে, তাহলো রাষ্ট্র তার নিজের নাগরিকের প্রতি এমন আচরণ কেন করল? সেটি কি তার নামের কারণে? নাকি তিনি প্রান্তিক মানুষ হওয়ার কারণে? এমন প্রশ্ন স্বভাবতই আসছে; কারণ আমাদের রাষ্ট্র প্রতিদিন প্রমাণ করে চলেছে যে, এই রাষ্ট্র ক্ষমতাশালীদের, এই রাষ্ট্র বিত্তশালীদের। তাই হলফ করে বলে দেওয়া যায় যে, ষষ্ঠীচন্দ্র যদি সাহেবি পোশাকের কোনো ভদ্রলোক হতেন, তাহলে দুই পাশের সীমান্তরক্ষীরা তার সঙ্গে অন্তত এমন ঊনমানুষি আচরণ করতেন না। প্রকৃতার্থে ষষ্ঠীচন্দ্ররা হলেন চিত্তহীন এই জাতিরাষ্ট্রের সেই প্রান্তিক মানুষ, যাদের কোনো দেশ থাকে না; যারা জাতিরাষ্ট্রের মানুষ না, ক্রীড়নক হয়ে বেঁচে থাকেন।

ষষ্ঠীচন্দ্রের এই একদিনের পরিচয়হীনতা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে, তাহলো নাগরিকদের নিরাপত্তা। শুধু ষষ্ঠীচন্দ্র নন, বিদেশের মাটিতে আমরা এমন অনেক উদাহরণ দেখেছি, যেখানে বাংলাদেশ রাষ্ট্র তার নাগরিককে সুরক্ষা দেওয়া তো দূরের কথা, ঠিকঠাক সহযোগিতা করতে ব্যর্থ হয়েছে। কারণ একটি রাষ্ট্র যদি তার নিজের নাগরিক চিনতে ব্যর্থ হয়, তাহলে তা এমন অনেক ভয়াবহ ঘটনার জন্ম দেয়। বাংলাদেশের আছে বহু বছর থেকে পরিচয়পত্রভিত্তিক শক্তিশালী তথ্যভাণ্ডার। অথচ সেখানে আমাদের সীমান্তরক্ষীরা সে তথ্যের সংযোগ ছাড়াই দেশ পাহারা দিচ্ছে। কে দেশের নাগরিক আর কে দেশের নাগরিক নয়, সেটি নির্ণয়ের ক্ষমতা না থাকলে সেটি একটি দেশ ও জাতির জন্য বিরাট নিরাপত্তা সংকট তৈরি করতে পারে।
সমরকৌশল বিদ্যার ভাষায় এটি একটি দেশের 'নন-ট্র্যাডিশনাল' নিরাপত্তার অংশ; কারণ একটি দেশ যদি না জানে কে তার নাগরিক আর কে তার নাগরিক নয়—তাহলে সেটি যে কোনো সময় বড় রাষ্ট্রীয় বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। কারণ এই একবিংশ শতাব্দীতে সীমান্তে লাঠি বা বন্দুকের চেয়ে বেশি শক্তিশালী হতে পারে তথ্যভাণ্ডার, যে তথ্যভাণ্ডার দিয়ে একটি দেশ সহজেই বুঝতে পারবে কে তার দেশের নাগরিক আর কে নয়। সেটি নিশ্চিত করা গেলে রাষ্ট্রের ‘অগতানুগতিক’ নিরাপত্তা শক্তিশালী হয়। ইউরোপের দেশগুলোতে নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা দেখে আমরা প্রায়শই বিস্মিত হই। এই বিস্ময়কর নিরাপত্তার অন্যতম কারণ হলো তাদের তথ্যসমৃদ্ধ সীমান্ত ব্যবস্থাপনা। তাই বলাই বাহুল্য যে, তথ্যভিত্তিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনা করতে সক্ষম হলে সীমান্তে এই ধরনের উত্তেজনা আরও মানবিকভাবে মোকাবেলা করা সম্ভব হবে, দেশের নাগরিকদের আরও বেশি সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব।
এম. টি. ইসলাম জার্মানির একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। ই-মেইল: [email protected]