Published : 19 Jun 2026, 06:40 AM
চার মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র এমন এক চুক্তিতে পৌঁছেছে, যা শুধু এই অঞ্চলের রাজনীতিকেই নয়, ভবিষ্যতে পুরো পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলোর শক্তির ভারসাম্যকেও নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারে। এই চুক্তি ইতোমধ্যে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে এ কারণে যে, ১৯৭৯ সালের ’ইসলামি বিপ্লবের’ ৪৭ বছর পর যুক্তরাষ্ট্র শুধু ইরানকে কূটনৈতিকভাবে স্বীকৃতিই দেয়নি, কার্যত মেনে নিয়েছে যে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে ইরান একটি অনিবার্য শক্তি। এশিয়া ও আফ্রিকার সংযোগস্থলে অবস্থিত, তেলসমৃদ্ধ ও ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মুসলিমপ্রধান এই অঞ্চলটিকে বিশ্ব রাজনীতিতে যে ভূ-রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ে ‘মধ্যপ্রাচ্য’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়—সেখানে ইরানের এই অবস্থান এখন অনস্বীকার্য। অন্যদিকে, নিজেদের ভুল স্বীকার করে যুক্তরাষ্ট্র একাধিকবার জানিয়েছে যে, ইরানের ওপর এই হামলা তাদের জন্য একটি মারাত্মক ভুল ছিল।
১৯৭৮ সালে শুরু হওয়া গণ-অভ্যুত্থানের ফলে ১৯৭৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-সমর্থিত মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভীর রাজতন্ত্রের পতন ঘটে। এরপর নির্বাসন থেকে ফিরে আসা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে দেশটি একটি ইসলামি প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়। সেই থেকে আর কখনো ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাভাবিক সম্পর্ক ছিল না।
এ বছরের ফেব্রুয়ারির ২৮ তারিখে যখন যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, তখন কে ভেবেছিল যে এই যুদ্ধের পরিণতি এমন হবে? যুদ্ধের প্রথম দিনেই ইরান তার সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনিসহ সরকারের বহু জ্যেষ্ঠ সদস্যকে হারিয়েছে। এরপর গত চার মাসে তেহরানসহ দেশের নানা শহরে হাজার হাজার ভবন ধ্বংস হয়েছে, অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়েছে, অবকাঠামো ভেঙে পড়েছে। সাধারণ চোখে দেখলে মনে হওয়ার কথা, এমন ভয়াবহ আঘাতের পর একটি রাষ্ট্র হয়তো দ্রুত ভেঙে পড়বে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ইরান ভাঙেনি; নিজেদের আরও সংহত করেছে। আরও স্পষ্ট করে বললে, এ যুদ্ধে আসলে ইরানেরই জয় হয়েছে।
এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ ছিল জনগণের সমর্থন।
ইরানের শাসনব্যবস্থা নিয়ে জনগণের অসন্তোষ নতুন কিছু নয়। শরিয়াভিত্তিক শাসনব্যবস্থা, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন ও অর্থনৈতিক সংকট—সব মিলিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের অভ্যন্তরে খামেনি সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ ছিল। ফেব্রুয়ারির যুদ্ধ শুরু হওয়ার মাস তিনেক আগেও লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছে এবং সেই বিক্ষোভে মারা গেছে তিন হাজার থেকে ১৩ হাজার মানুষ। কিন্তু এরপর যখন বিদেশি শক্তির সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ শুরু হলো, তখন সেই ক্ষোভের জায়গা দখল করলো তীব্র জাতীয়তাবোধ। ইরানের মানুষ বুঝিয়ে দিল, নিজেদের সমস্যা তারা নিজেরা সমাধান করবে; বাইরের শক্তির হস্তক্ষেপ মেনে নেবে না।
ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে, বহিরাগত আগ্রাসন অনেক সময় অভ্যন্তরীণ বিভক্তিকে সাময়িকভাবে দূর করে সবাইকে একত্র করে দেয়। ইরানের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। সরকারবিরোধী মানুষও তখন রাষ্ট্রের পক্ষে দাঁড়িয়েছে। এই ঐক্যই যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে, কারণ ইরানের সরকারকে তখন আর ঘর সামলানোর জন্য নিজেদের শক্তি খর্ব করতে হয়নি।
যুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে আরও কিছু তথ্য সামনে আসে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। 'মিডল ইস্ট আই'-এর রিপোর্টে উঠে আসে, জানুয়ারির বিক্ষোভে ব্যাপক প্রাণহানির পেছনে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ জড়িত ছিল। সিসিটিভিসহ নানা ক্যামেরায় ধরা পড়ে, কীভাবে বিশেষ পোশাক পরিহিত সম্পূর্ণ অচেনা লোকজন বিভিন্ন বিক্ষোভে ঢুকে মিছিলকারীদের হত্যা করেছে। এরপর যুদ্ধ যত গড়িয়েছে, এটি ক্রমশ স্পষ্ট হয়েছে যে, এই সংঘাত শুধু ইরান বনাম যুক্তরাষ্ট্র নয়; বরং পশ্চিম এশিয়ার বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের অংশ। সারা পৃথিবী জেনেছে যে, হরমুজ প্রণালির প্রবাহে ব্যাঘাত ঘটলে গোটা পৃথিবীর অর্থনীতিতে টান পড়ে।
এবার চুক্তিতে কী আছে, সেদিকে নজর দেওয়া যাক। ১৪ দফা চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, শুধু ইরান-যুক্তরাষ্ট্র নয়, ইসরায়েল ও লেবাননসহ সকল ফ্রন্টে সামরিক অভিযান বন্ধ করার বিষয়টি এতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, ইরান শুধু নিজের স্বার্থেই দরকষাকষি করেনি; তার আঞ্চলিক মিত্রদের অবস্থানও আলোচনায় গুরুত্বের সঙ্গে এনেছে। ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে লেবাননের হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে আসছে। তাদের দাবি, হিজবুল্লাহ মূলত ইরান সরকারের মদদপুষ্ট ইসরায়েলবিরোধী একটি বাহিনী।
চুক্তি অনুযায়ী, দুই দেশ আপাতত দুই মাসের জন্য একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না। আগামী ৬০ দিনের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী একটি বিস্তৃত চুক্তি স্বাক্ষরের প্রস্তুতি নেওয়া হবে। যুক্তরাষ্ট্র তাদের নৌ অবরোধ তুলে নেবে এবং হরমুজ প্রণালিতে যুদ্ধ-পূর্বাবস্থায় জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হবে। ইরানও বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো অর্থনৈতিক অবরোধ প্রত্যাহার। গত কয়েক দশকে ইরানের ওপর আরোপিত বহু নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হবে। এর ফলে ইরান আবার বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে পূর্ণমাত্রায় প্রবেশ করতে পারবে।
বিভিন্ন পর্যায়ে আটকে থাকা অর্থ ছাড় হওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে, যা অর্থনৈতিকভাবে ইরানের জন্য বিশাল স্বস্তি বয়ে আনবে। সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক দিকটি হলো, এই যুদ্ধে ধসে পড়া ইরানের অবকাঠামো পুনর্নির্মাণে অন্তত ৩০ হাজার কোটি ডলার ক্ষতিপূরণ দেবে আমেরিকা। মূলত এই টাকাটা আসবে উপসাগরীয় অঞ্চলে আমেরিকার অন্যান্য মিত্র দেশ থেকে।
অবশ্য চুক্তিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্তও রয়েছে; ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির উদ্দেশ্যে ইউরেনিয়াম মজুদ করতে পারবে না। দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে থাকা এই ইস্যুতে আপস করে ইরান হয়তো কৌশলগতভাবে বড় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা নিশ্চিত করতে চেয়েছে। কিন্তু আগের মতোই কৌশলে তারা ইউরেনিয়াম মজুদ করা অব্যাহত রাখবে কিনা, সেই সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
এই যুদ্ধ আরেকটি বাস্তবতা সামনে নিয়ে এসেছে: আধুনিক যুদ্ধের চরিত্র বদলে গেছে। তুলনামূলকভাবে কম ব্যয়ের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহার করে একটি রাষ্ট্র কীভাবে বৃহৎ শক্তির সামরিক পরিকল্পনাকে ব্যাহত করতে পারে, ইরান তার একটি বড় উদাহরণ স্থাপন করেছে।
আরেকটি বড় কারণ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক একাকীত্ব। ইংল্যান্ড থেকে শুরু করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মিত্র দেশগুলো—অতীতের মতো এবার পূর্ণমাত্রায় যুক্তরাষ্ট্রের পাশে দাঁড়ায়নি। ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী আমেরিকার তোপের মুখে পড়ে কোনোমতে এ যাত্রায় বেঁচে গেছেন। উপসাগরীয় অঞ্চলের মার্কিন মিত্ররাও বেশ সীমিত ভূমিকা নিয়েছে। স্পষ্ট করে বললে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে গা বাঁচিয়ে থাকতে চেয়েছে। এতে বোঝা গেছে, এই অঞ্চলে পুরনো জোট কাঠামো আগের মতো কার্যকর নেই। অপরদিকে চীন ও রাশিয়া থেকে ইরান বড় ধরনের কৌশলগত সমর্থন পেয়েছে।
এই যুদ্ধ বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা-নির্ভরতা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। বহু বছর ধরে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল সামরিক উপস্থিতির ওপর নির্ভর করেও তারা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে পারেনি; এমনকি অনেককে দুবাইয়ের বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ফেলে পালাতেও হয়েছে। এই যুদ্ধ তাদের বুঝিয়েছে, নিরাপত্তার পুরনো কৌশল হয়তো আর যথেষ্ট নয়।
ইরান এই যুদ্ধে অনেক কিছু হারিয়েছে। কয়েক হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে, সম্পদের বিপুল ক্ষতি হয়েছে, অবকাঠামো ভেঙে পড়েছে এবং দেশটি কয়েক স্তরের নেতৃত্বশূন্য হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে তারা অর্জন করেছে নতুন কিছু: জাতীয় ঐক্য, আঞ্চলিক গ্রহণযোগ্যতা এবং আন্তর্জাতিক দরকষাকষির নতুন অবস্থান। ইসরায়েলের যুদ্ধবাজ নেতা নেতানিয়াহুর সঙ্গে আমেরিকার দূরত্ব সৃষ্টি হওয়াটাও ইরানের বড় অর্জন।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, সামনের দিনগুলোতে এই অর্জনকে তারা কীভাবে ব্যবহার করবে?
যদি ইরানের সরকার এই যুদ্ধ-পরবর্তী ঐক্যকে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠনের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করতে পারে—যেখানে মত-পথ নির্বিশেষে সবাই সমানভাবে জায়গা পাবে—তাহলে এই যুদ্ধ শুধু একটি সামরিক সংঘর্ষ হিসেবে নয়, রাষ্ট্র পুনর্গঠনের এক ঐতিহাসিক মোড় হিসেবেও স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে অনেক রাষ্ট্র উঠে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু ইতিহাসে খুব কম রাষ্ট্রই ধ্বংসের ভেতর থেকে নিজেদের আরও শক্তিশালী রাজনৈতিক বাস্তবতায় রূপান্তর করতে পেরেছে।
ইরান কি সেই পথে হাঁটতে পারবে?
রাজু নূরুল উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ ও লেখক। বর্তমানে সোমালিয়া সরকারের অর্থ, পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র অ্যাডভাইজার হিসেবে কর্মরত। যোগাযোগ: [email protected]