Published : 19 Jun 2026, 10:41 AM
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে টাঙ্গুয়ার হাওরের জন্য প্রায় ২৫৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। কাগজে-কলমে অঙ্কটা বেশ বড়, যা পরিবেশ সংরক্ষণে রাষ্ট্রের অঙ্গীকারের প্রতিফলন বলেই মনে হয়। কিন্তু টাঙ্গুয়ার হাওর তো শুধু অর্থের অভাবে পিছিয়ে নেই। সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি, জবাবদিহি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবে এখানে বারবার ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি ঘটছে।
গত দুই দশকে টাঙ্গুয়ার হাওরে প্রকল্পের কোনো অভাব হয়নি। দেশি-বিদেশি অর্থায়নে একের পর এক উদ্যোগ এসেছে—সহ-ব্যবস্থাপনা, কমিউনিটি ম্যানেজমেন্ট, সচেতনতা বৃদ্ধি, নানা রকম সংগঠন তৈরি; খরচ হয়েছে কোটি কোটি টাকা। এত কিছুর পরেও হাওরে মাছের প্রাচুর্য কমেছে, জীববৈচিত্র্য সংকুচিত হয়েছে, নড়বড়ে হয়ে পড়েছে প্রাকৃতিক ভারসাম্য। এমনকি স্থানীয় মানুষের জীবনেও কোনো মৌলিক পরিবর্তন আসেনি।
টাঙ্গুয়ার হাওর বাংলাদেশের অনন্য এক জলাভূমি। প্রায় ১১ হাজার একর জুড়ে বিস্তৃত এই জলরাশি দেশীয় মাছের প্রধান প্রজনন ক্ষেত্র, পরিযায়ী পাখির নিরাপদ আশ্রয়স্থল এবং জীববৈচিত্র্যের এক সমৃদ্ধ কেন্দ্র। ১৯৯৯ সালে এই হাওরটিকে ‘ইকোলজিক্যালি ক্রিটিক্যাল এরিয়া’ (ECA) ঘোষণা করা হয় এবং পরে ‘রামসার সাইট’ হিসেবেও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়। এর ফলে এই হাওর শুধু আমাদের জাতীয় সম্পদ নয়, বৈশ্বিক পরিবেশগত ঐতিহ্যের অমূল্যে অংশ পরিণত হয়েছে।
রামসার কনভেনশনের মূল দর্শন হলো ‘ওয়াইজ ইউজ’—অর্থাৎ প্রকৃতি সংরক্ষণ এবং তা ব্যবহারের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা। মানুষকে বাদ দিয়ে নয়, মানুষকে সঙ্গে নিয়েই টিকে থাকে প্রকৃতি। কিন্তু টাঙ্গুয়ার হাওর ব্যবস্থাপনায় এই ভারসাম্যের বড় বেশি অভাব রয়েছে। একদিকে সংরক্ষণের নামে নানা বিধিনিষেধ, অন্যদিকে জীবিকার তাগিদে মানুষের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার—এই দুইয়ের টানাপোড়েনে হাওরের প্রাকৃতিক কাঠামো আজ নাজুক।
এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা আমাদের সামনে আসে। পরিবেশ রক্ষার আহ্বান তখনই কার্যকর হয়, যখন স্থানীয় মানুষ নিজেকে এর অংশ মনে করে। একজন জেলে, একজন কৃষক বা একজন দিনমজুর যদি বিকল্প জীবিকা না পান, তবে প্রকৃতি সংরক্ষণের আলাপ তার কাছে অর্থহীন বলে মনে হবে। ফলে প্রকল্প শেষ হতে না হতেই হাওরের ওপর আগের মতো চাপ ফিরে আসবে।
এ কারণেই এবারের বাজেটে সবচেয়ে বড় জোর দেওয়া উচিত বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে।
টাঙ্গুয়ার হাওরপাড়ের জনগোষ্ঠীকে হাওরের ওপর নির্ভরশীলতা থেকে ধীরে ধীরে বের করে আনা ছাড়া প্রকৃত সংরক্ষণ অসম্ভব। এর জন্য কৃষি ও মৎস্যভিত্তিক শিল্প, ফিশ প্রসেসিং ইউনিট, নেসেন্ট ব্রুড হ্যাচারি, রিস্টকিং সেন্টার, উচ্চমূল্যের কৃষিপণ্যভিত্তিক উদ্যোগ এবং স্থানীয় উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে নতুন অর্থনৈতিক ভিত্তি দাঁড় করাতে হবে। তবেই মানুষ নিজেদের প্রাণ-প্রকৃতির প্রতিপক্ষ নয়, অংশীদার বলে ভাবতে উদ্বুদ্ধ হবে।
একই সঙ্গে টাঙ্গুয়ার হাওরের প্রশাসনিক কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করা জরুরি। এত বড় একটি জলাভূমি সীমিত জনবল আর জোড়াতালির মনিটরিং দিয়ে রক্ষা করা সম্ভব নয়। আধুনিক প্রযুক্তি, জিআইএস ভিত্তিক পর্যবেক্ষণ এবং নিয়মিত তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থাপনা ছাড়া প্রকল্পভিত্তিক এই সংরক্ষণ কখনোই টেকসই হবে না।
টাঙ্গুয়ার হাওরের আরেকটি গভীর সংকট হলো এর জলজ জীববৈচিত্র্যের বিপর্যয়। একসময় যাদুকাটা, পাটলাই ও বৌলাই নদী হয়ে সুরমা অববাহিকার সঙ্গে মাছের চলাচলের যে পথ ছিল, তা আজ অনেকাংশেই বাধাগ্রস্ত। মাছের প্রজনন ও চলাচলের ওই স্বাভাবিক চক্র পুনরুদ্ধার করা না গেলে দীর্ঘমেয়াদে মৎস্যসম্পদ ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে। একইভাবে দেশীয় মাছের বিলুপ্ত ও বিপন্ন প্রজাতি কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে ফিরিয়ে আনা, উদ্ভিদের বীজ ও চারা সংরক্ষণ এবং সংরক্ষিত বনাঞ্চল তৈরি করার কোনো বিকল্প নেই। পরিযায়ী পাখির নিরাপদ আবাস, খাদ্যসংস্থান এবং বন্যপ্রাণী চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা ছাড়া এই বাস্তুতন্ত্র কখনোই পূর্ণতা পাবে না।
তবে টাঙ্গুয়ার হাওরের সংকট শুধু অভ্যন্তরীণ নয়। সীমান্তের ওপারে মেঘালয় অঞ্চলের খনিজ উত্তোলন ও খনিজনিত দূষণের প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই পরিবেশগত উদ্বেগ রয়েছে, যা আন্তঃরাষ্ট্রীয় পরিবেশ ব্যবস্থাপনার বিষয়। তাই যৌথ বৈজ্ঞানিক গবেষণা, তথ্য বিনিময় এবং জোরালো কূটনৈতিক উদ্যোগ ছাড়া এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
হাওরপাড়ের কৃষিতেও বড় পরিবর্তন আনতে হবে। অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে জৈব কৃষির দিকে অগ্রসর না হলে জলজ পরিবেশ রক্ষা করা যাবে না। তবে কৃষকদের যথাযথ ভর্তুকি, প্রশিক্ষণ এবং বাজার সুবিধা নিশ্চিত করতে না পারলে জৈব কৃষির ডাক কথার কথাই রয়ে যাবে।
অনিয়ন্ত্রিত পর্যটনে নিয়ন্ত্রণ আনতে হবে সর্বাগ্রে। যে হাওরের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য ছিল তার আদিম নীরবতা, সেখানে আজ দিন-রাত শোনা যায় ইঞ্জিনচালিত নৌকার শব্দ। দানবাকৃতির হাউসবোটের ভিড় লেগেই থাকে। বিনোদনের নামে চলে উচ্চশব্দে গান-বাজনা। প্রকৃতিবান্ধব পর্যটন সম্পর্কে অজ্ঞ পর্যটকদের হইচই হাওরের নৈঃশব্দ্য কেড়ে নিয়েছে। হাজার হাজার পর্যটকের ফেলে যাওয়া প্লাস্টিক বর্জ্য, যত্রতত্র ফেলে যাওয়া মদ ও মাদকদ্রব্যের কাঁচের বোতল আর যান্ত্রিক নৌকার পোড়া মবিল ও জ্বালানি সরাসরি আঘাত করছে হাওরের সংবেদনশীল জীববৈচিত্র্যকে।
স্থানীয় পর্যবেক্ষণ ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে পর্যটন-সংশ্লিষ্ট নানা অনিয়ম, সামাজিক অস্থিরতা এবং পরিবেশগত অবক্ষয়ের চিত্র বারবার উঠে এসেছে। এসব কিছু শুধু পরিবেশের ক্ষতি করছে না, স্থানীয় সামাজিক ভারসাম্যও নষ্ট করছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশকর্মীদের স্পষ্ট অভিমত, রামসার সাইট বা ইসিএ নীতিমালার তোয়াক্কা না করে যেভাবে পর্যটন চলছে, তা টাঙ্গুয়ার হাওরের বাস্তুতন্ত্রকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। পরিবেশ-প্রতিবেশগত চরম সংকটাপন্ন এই হাওরে পরিবেশবিধ্বংসী পর্যটন কার্যক্রমের বিরুদ্ধে এখনই কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
টাঙ্গুয়ার হাওর আসলে একটি পরীক্ষাগার, যেখানে রাষ্ট্রের ‘উন্নয়ন দর্শন’ পরীক্ষা দিচ্ছে। আমরা কি প্রকৃতিকে কেবলই লুটেপুটে খাওয়ার সম্পদ হিসেবে দেখব, নাকি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বেঁচে থাকার উপযোগী করে বাঁচিয়ে রাখব? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এই ২৫৯ কোটি টাকার প্রকৃত মূল্য।
প্রকৃতি বাজেটের অঙ্ক মেনে চলে না, সে আমাদের সিদ্ধান্তের ভালো-মন্দটুকুই ফিরিয়ে দেয়। কয়েক বছর পর এই বাজেটের হিসাব যখন ধুলোমাখা কাগজে পরিণত হবে, তখন আমরা দেখব টাঙ্গুয়ার হাওরকে পুনরুজ্জীবিত করার সুযোগ হাতছাড়া হয়ে গিয়েছে। তাই টাঙ্গুয়ার হাওর বাঁচানোর পরীক্ষাটা এখনই দিতে হবে।
রাসেল আহমদ সাংবাদিক ও সমাজকর্মী। ই-মেইল: [email protected]