Published : 18 Jun 2026, 06:39 PM
বর্তমান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে এখন পর্যন্ত মোট তিনটি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি গঠিত হয়েছে। সংসদীয় কার্যক্রমে গতিশীলতা আনতে এবং নির্বাহী বিভাগের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে দ্রুত ১০ সদস্যের সংসদীয় কমিটিগুলো গঠন করা খুব জরুরি।
২০০৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কার্যপ্রণালী বিধি সংশোধন করে প্রতিটি নতুন সংসদ গঠনের পর তৃতীয় অধিবেশনের মধ্যে স্থায়ী কমিটিগুলো গঠনের আইনি বাধ্যবাধকতা আনা হয়। আশা করা যায়, আগামী অধিবেশনের মধ্যেই বাকি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিগুলো গঠিত হয়ে যাবে।
স্থায়ী কমিটিগুলোর সৌন্দর্য হলো, এখানে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সকল সংসদ সদস্য নিজেদের রাজনৈতিক পার্থক্যকে আলাদা করে দেশের জন্য মঙ্গলজনক বিষয়গুলো নির্মোহভাবে বিশ্লেষণ করে সুপারিশ করে থাকেন। যদিও এর অন্যথার উদাহরণও রয়েছে প্রচুর।
তবে এই নিবন্ধ লেখার উদ্দেশ্য, অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে সদস্য হিসেবে এরই মধ্যে আলোচিত ও সমালোচিত হয়ে পড়া স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের অন্তর্ভুক্তি, এর আইনি এবং গণতান্ত্রিক দিক পর্যালোচনা করা।
সংসদীয় গণতন্ত্রকে শক্তিশালী ও গতিশীল করতে সঠিক সদস্যদের নিয়ে স্থায়ী কমিটি গঠন এবং তা কার্যকর করার কোনো বিকল্প নেই। সংসদ অধিবেশনের স্বল্প সময়ে সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। সে কারণেই এই স্থায়ী কমিটিগুলো গঠন করা হয়। সেখানে ক্ষমতাসীন দলের পাশাপাশি বিরোধী দলগুলোর সংসদীয় শক্তি অনুসারে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হয়ে থাকে। প্রতিটি মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও অধিদপ্তরের কার্যক্রম আলাদাভাবে আলোচিত হয় এবং সদস্যরা সুপারিশ করেন। সে কারণেই স্থায়ী কমিটিগুলোকে বলা হয় ‘মিনি পার্লামেন্ট’।
স্থায়ী কমিটির কার্যক্রম নিয়ে কথা বলতে গেলে একটু পেছনের দিকে তাকাতে হবে।
১৯৯৬ সালের জুন মাসে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে সপ্তম সংসদ গঠিত হওয়ার আগ পর্যন্ত মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি হতেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী। এর ফলে স্থায়ী কমিটির যে মূল দায়িত্ব, মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সেটি অর্জিত হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই ছিল না। এই বিবেচনায় সংসদীয় ব্যবস্থা সংস্কারের অংশ হিসেবে সপ্তম সংসদে মন্ত্রীদের বাদ দিয়ে ‘ব্যাকবেঞ্চার’ অর্থাৎ সাধারণ সংসদ সদস্যদের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি করতে কার্যপ্রণালী বিধি সংশোধন করা হয়। এর ফলে সংসদীয় গণতন্ত্রের অন্যতম লক্ষ্য নির্বাহী বিভাগের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে সংসদ সদস্যরা বেশ অবদান রাখতে শুরু করেন।
কার্যপ্রণালী বিধিতে মন্ত্রীদের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ব্যতীত অন্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য হতে বাধা নেই। সেই হিসাবে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিতে অন্তর্ভুক্তিতে বিধি লঙ্ঘিত হয়নি।
তবে সরকারি হিসাব কমিটি, অনুমিত হিসাব কমিটি ও সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটিতে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের সভাপতি অথবা সদস্য হিসেবে স্থান দেওয়ার বিধান রাখা হয়নি। কোনো মন্ত্রীর নাম ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হলেও তাদের বাদ দেওয়া হয়েছে। যেমন, বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের নেতৃত্বে অষ্টম সংসদে ২০০৩ সালের ১২ মে ১৫ সদস্যের সরকারি হিসাব কমিটিতে তৎকালীন কৃষি প্রতিমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে নির্বাচিত করা হয়। কার্যপ্রণালী বিধিতে বাধা থাকায় স্পিকারের নির্দেশে তার নাম বাদ দিয়েই সেই কমিটি গঠন করা হয়।
কার্যপ্রণালী বিধিতে বাধা না থাকলেও বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন অষ্টম জাতীয় সংসদসহ বিগত সংসদগুলোতে কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের অন্য কোনো মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি এবং সদস্য হিসেবে সাধারণ সংসদ সদস্যদের নির্বাচিত করা হয়। এই রেওয়াজটি মোটামুটি শক্তভাবেই রক্ষা করা হয়েছে। আইনি নিষেধ না থাকলেও বিষয়টি রেওয়াজ হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে এবং সংসদীয় গণতন্ত্রে রেওয়াজ আইনের চেয়ে কোনোক্রমেই কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। রেওয়াজগুলোই একসময় বিধিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। যেমন, সপ্তম সংসদে পাইলট কার্যক্রম হিসেবে প্রতি বুধবার প্রধানমন্ত্রীর জন্য ৩০ মিনিট প্রশ্নোত্তর পর্ব চালু করা হয়। ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বরে সেই রেওয়াজকে কার্যপ্রণালী বিধিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে (বিধি ৪১)।
তবে প্রশ্ন হলো, কোনো মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী অথবা উপমন্ত্রীকে অন্য কোনো স্থায়ী কমিটির সদস্য নির্বাচিত করা হলে সমস্যা কোথায়? সমস্যা রয়েছে। বিষয়টির ব্যাখ্যা হলো, সংসদীয় গণতন্ত্রের মূল কথা হলো প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি মন্ত্রিসভা থাকবে এবং মন্ত্রিসভা সম্মিলিতভাবে সংসদের কাছে দায়বদ্ধ থাকবে। মন্ত্রিসভার মূল নেতৃত্ব থাকে প্রধানমন্ত্রীর হাতে। প্রত্যেক মন্ত্রী সকল মন্ত্রণালয়কে সহায়তা করবেন এবং একটি নির্বাচিত সরকারের নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জন করতে এবং জনগণের কাছে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে একে অপরকে সহায়তা করবেন। সেই হিসাবে একজন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী অথবা উপমন্ত্রীকে তার সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ব্যতীত অন্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য করা হলে সেখানে তার ভূমিকা হবে সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। সে ক্ষেত্রে তাকে তার আরেক সহকর্মী মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী অথবা উপমন্ত্রীকে প্রশ্ন করতে হবে এবং সরকারের বিভিন্ন কাজের ব্যাপারে প্রশ্ন তুলতে হবে, যা তিনি পারেন না। সরকারের যে কোনো সিদ্ধান্তের সঙ্গে মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে তিনিও নির্বাহী বিভাগের কাজের জন্য দায়ী। সে ক্ষেত্রে তিনি যদি বেসরকারি সদস্য হয়ে যান এবং বিষয়টি ‘কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট’ অর্থাৎ স্বার্থের দ্বন্দ্ব হয়ে পড়ে। অনেকটা একই অঙ্গে দুই রূপের মতো।
আরেকটি বাস্তব সমস্যা রয়েছে। কোনো মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী অথবা উপমন্ত্রীকে নিজের মন্ত্রণালয় ব্যতীত অন্য কোনো মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সাধারণ সদস্য নির্বাচিত করা হলে নির্বাহী বিভাগের মধ্যে এক মন্ত্রী অন্য মন্ত্রীর বিরুদ্ধে লেগে পড়তে পারেন। দেখা যাবে কোনো মন্ত্রীর সঙ্গে আরেক মন্ত্রীর রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব রয়েছে। আর সেই মন্ত্রী যদি তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য হয়ে যান, তাহলে মারাত্মক পরিণতি হতে পারে। তিনি স্থায়ী কমিটিতে প্রতিপক্ষ মন্ত্রীকে ঘায়েল করতে কাজ করে যাবেন, যা সরকারের মধ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। একে অপরের বিরুদ্ধে লেগে পড়তে পারেন তারা। ফলে মন্ত্রিসভার মধ্যে সম্মিলিত দায়িত্ববোধ থাকবে না। সরকার ব্যর্থ হবে এবং একপর্যায়ে স্থায়ী কমিটির মাধ্যমে নির্বাহী বিভাগের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ব্যবস্থাই প্রশ্নের মুখে পড়বে। ক্ষতিগ্রস্ত হবে সংসদীয় গণতন্ত্র।
এখন প্রশ্ন হলো, কেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য নির্বাচিত করা হলো! এর পেছনে অন্য কোনো বাস্তবিক রাজনৈতিক কারণ থাকতে পারে, যা আমরা অতীত সংসদগুলোতে দেখেছি।
প্রত্যেকটি স্থায়ী কমিটির সদস্যদের নাম সংসদ নেতা অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক অনুমোদিত হতে হয়। তবে বিরোধীদলীয় সদস্যদের নাম সংশ্লিষ্ট দলের পছন্দ মতোই হয়ে থাকে। এটিই সঠিক নিয়ম।
এই প্রসঙ্গে নবম জাতীয় সংসদের একটি ঘটনা উল্লেখ করতে চাই। ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর বিচারিক আদালতের দুই বিচারককে বিধিবহির্ভূতভাবে আইন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বদলির ঘটনায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছিল। প্রশ্ন ওঠে, স্বাধীন বিচার বিভাগের কাজে কেন সরকার হস্তক্ষেপ করল?
এই ঘটনা আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভায় আলোচনার জন্য নির্ধারণ করেন কমিটির সভাপতি সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। আইনমন্ত্রী ছিলেন টেকনোক্র্যাট শফিক আহমেদ এবং প্রতিমন্ত্রী ছিলেন কামরুল ইসলাম।
সংসদের দ্বিতীয় তলায় কেবিনেট কক্ষের বাইরে আমরা কয়েকজন সাংবাদিক বৈঠক শেষ হওয়ার অপেক্ষায়ছিলাম। বৈঠক শেষে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত আমাদের সঙ্গে কথা বলতে এগিয়ে এলেন। তাকে পাশ কাটিয়ে প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম বেরিয়ে যাচ্ছিলেন। এর মধ্যেই সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ঠোঁট বাঁকা করে জোরে কামরুল ইসলামকে ডাকলেন। বললেন, “ওই শুইনা যাও সাংবাদিকরে কি কইতাছি। গিয়া তো উল্টাপাল্টা লাগাইবা।” অর্থাৎ সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলতে চেয়েছিলেন, কামরুল ইসলাম হয়তো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে তার সম্পর্কে মিথ্যা-বানোয়াট কথা বলবেন। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত সেই সময়ে সংস্কারপন্থী হিসেবে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে কোণঠাসা। সেই জন্যই কামরুল ইসলামকে ব্রিফিংয়ে থাকতে বলেছিলেন।
সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের ডাকে এগিয়ে এলেন কামরুল ইসলাম। তার পাশে দাঁড়ালেন। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত আমাদের সঙ্গে কথা বলা শুরু করলেন। কথার এক ফাঁকে তিনি বললেন, “আমরা বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরকে অবহিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমাদের মাঝে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধি আছেন।” এই কথা বলে তিনি অনেকটা তাচ্ছিল্যের সুরে কামরুল ইসলামের গায়ে হাত রেখে বললেন, “এই যে আমাদের এজেন্ট অব দা প্রাইম মিনিস্টার!” তার এই মন্তব্যে কামরুল ইসলামের মধ্যে কোন অপমানবোধ দেখা গেল না। বরং আমাদের কাছে মনে হলো, সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের এই ‘এজেন্ট অব দা প্রাইম মিনিস্টার’ অভিধাতে তিনি বেশ গর্ব বোধ করছেন।
যে কারণেই হোক না কেন, শাহে আলমকে অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য করা হয়েছে সংসদ নেতার সম্মতিতে, সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। ইতোমধ্যে মীর শাহে আলম বেশ বিতর্কিত হয়ে পড়েছেন। তার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবেন দলীয় প্রধান। তবে তাকে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে রেখে সংসদীয় কমিটিরও সদস্য করে এতদিনে গড়ে উঠা রেওয়াজ ভেঙে ফেলা ভালো দৃষ্টান্ত হবে না। বরং সার্বিক বিবেচনায় কার্যপ্রণালী বিধি সংশোধন করে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের অন্য কোনো কোনো মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটিতে অন্তর্ভুক্তির পথ বন্ধ করার সময় এসেছে।
কামরান রেজা চৌধুরী পেশায় সাংবাদিক–সংসদীয় রাজনীতি নিয়ে প্রতিবেদক হিসেবে কাজ করছেন দুই দশকেরও বেশি। ই-মেইল: [email protected]