Published : 20 Jun 2026, 07:01 AM
কিছুদিনের মধ্যে পরপর দুটি ধর্ষণ মামলার বিচার প্রক্রিয়া ও রায় খুব দ্রুত সম্পন্ন হয়েছে। রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার পর চট্টগ্রামের বাকলিয়ার চেয়ারম্যানঘাটা এলাকায় ২১ মে সাড়ে তিন বছরের শিশুকে ধর্ষণের ঘটনার মাত্র ২৮ দিনের মাথায় মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে। এতে আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে মহানগরের শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল।
আমরা দেখেছি, রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলাটির বিচারিক কার্যক্রম শেষ হয়েছে মাত্র পাঁচ কার্যদিবসে। এছাড়াও ঘটনার ১৬ দিনের মধ্যেই শেষ করা হয় মামলার তদন্ত। তার ওপর ভিত্তি করে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয় এবং গঠন করা হয় অভিযোগ। একই সঙ্গে গ্রহণ করা হয় সাক্ষ্য এবং সম্পন্ন করা হয় জেরা। আইন অনুযায়ী আসামিদের দেওয়া হয় আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ। এরপরের ধাপের সবকিছু শেষ করে আদালত রায় ঘোষণা করে। আমরা ইতোমধ্যে জেনেছি, রায়ে প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
আমাদের নিশ্চয়ই মনে আছে গত বছর মাগুরায় ঘটা আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলার কথা। সেই মামলার বিচার কাজ মাত্র ১৪ কার্যদিবসেই সম্পন্ন হয়েছিল। সেই রায়ে মামলার আসামির সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। সেখানেও মাত্র ১৪ কার্যদিবসে তদন্ত, সাক্ষ্যগ্রহণ, জেরা ও যুক্তিতর্ক সম্পন্ন করা হয়। সব কিছু বিবেচনা করে মাগুরার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল ধর্ষণ মামলার আসামি হিটু শেখকে মৃত্যুদণ্ড দেয়।
এই তিনটি আলোচিত ধর্ষণ মামলায় দ্রুত বিচার সম্পন্ন হওয়ায় সংবাদমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই এটিকে বিচার বিভাগের একটি ইতিবাচক উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন এবং এক ধরনের ‘শান্তি’ পেয়েছেন।
কেন এই ‘শান্তি’র অনুভূতি? কারণ জনমানুষের স্মৃতি বলে বাংলাদেশে ধর্ষণ মামলা নিয়ে আলাপ-আলোচনা হয় কিন্তু সাজার হার খুবই কম। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও ব্র্যাকের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পদ্ধতিগত প্রতিবন্ধকতা এবং উক্ত প্রতিবন্ধকতাসমূহ নিরসনের কার্যকর উপায় চিহ্নিতকরণ’ শীর্ষক গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় সাজার হার মাত্র তিন শতাংশ। প্রায় ৭০ শতাংশ মামলায় খালাস পেয়ে যায় আসামিরা। বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, দুর্বল প্রমাণ, সাক্ষীর অনুপস্থিতি ও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে । তবে তার চেয়েও এখনকার বড় প্রশ্ন হলো, যে বিচারের রায়ে আমরা খুশিতে বাকুম-বাকুম করছি, সেটি আদৌ বাস্তবায়ন হবে তো?
আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায় ঘোষণার পরপরই, ২০২৫ সালের ২১ মে মাগুরার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল থেকে মামলার যাবতীয় নথি ও ডেথ রেফারেন্স সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে পাঠানো হয়। নিয়ম অনুযায়ী, প্রধান আসামি হিটু শেখ হাইকোর্টের এই ডেথ রেফারেন্সের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল দায়েরের সুযোগ পান। যতদূর জেনেছি বর্তমানে মামলাটি হাইকোর্ট বিভাগে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।
বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ধর্ষণের যে হিসাব নিয়ে আমরা কথা বলছি, তা হলো স্রেফ পুলিশের কাছে রেকর্ড হওয়া বা আদালতে দায়ের করা মামলার হিসাব। কিন্তু দেখা গেছে যে, প্রায় অর্ধেকের বেশি ধর্ষণের ঘটনায় কোনো মামলাই হয় না। কেন হয় না? আর মামলা হওয়ার পরও ভুক্তভোগীকে কী কী বিষয়ের মুখোমুখি হতে হয়? মামলার শেষ পর্যন্ত কতজন মামলা চালিয়ে নিতে পারেন? কতজন মাঝপথেই ছিটকে পড়েন? আর বিচারের রায়ের পর আসলে কী কী ঘটে?
গবেষণার তথ্য বলছে, বেশিরভাগ ধর্ষণের পর মেয়ে শিশু বা নারীরা কয়েক দফা গোসল করে বা তাদের করানো হয়, যার কারণে অনেক আলামত নষ্ট হয়ে যায়। এর কারণ, তখন থেকেই ধর্ষণের শিকার নারীকে ‘অপবিত্র’ ভাবা শুরু হয়। এরপর থানায় গেলে প্রথমে তারা ধর্ষণকারীর নাম-পরিচয় জানার চেষ্টা করে এবং এরপরই শুরু হয় আসল নড়াচড়া অথবা অলসতা, কিংবা মামলা নেওয়া-না নেওয়ার প্রবণতা। বাস্তব সমস্যার মধ্যে অন্যতম সমস্যা হলো, ধর্ষণের শিকার শিশু কিংবা নারীকে নিরাপদে গাড়িতে করে নিকটস্থ হাসপাতাল কিংবা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নেওয়ার ক্ষেত্রে সহযোগিতা বেশিরভাগ থানাই করতে পারে না। তখন ধর্ষণের শিকার শিশুর অভিভাবককেই বলা হয় হাসপাতালে গিয়ে মেডিকেল পরীক্ষা করাতে।
হাসপাতালে আসলে কী ঘটে? ভুক্তভোগী কখন হাসপাতালে পৌঁছেছেন, সেই সময়টিও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় ধর্ষণকারীর নাম-পরিচয় পাওয়ার পর চিকিৎসকরা সেই পরীক্ষা করতে গড়িমসি করেন। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ডাক্তারি পরীক্ষার ‘টু ফিঙ্গার টেস্ট’ বাতিল হলেও এখন পর্যন্ত শুধুমাত্র ‘যোনি’-কেন্দ্রিক পরীক্ষাই করা হয়। অর্থাৎ যোনি আক্রান্ত হয়েছে কি না এবং সেখানে ‘প্রতিরোধের’ চিহ্ন রয়েছে কি না, কেবল তা-ই দেখা হয়। এখন অনেক ক্ষেত্রে অনেককে অজ্ঞান করে ধর্ষণ করা হয় এবং অনেকেই ধর্ষণের শিকার হয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন; যে কারণে ঠিক সে সময়ে শুধুমাত্র যোনিকেন্দ্রিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা দিয়ে ধর্ষণের মতো ভয়াবহ অপরাধকে মাপা—অনেকটাই ধর্ষকের পক্ষে যায়। গবেষণায় আমরা দেখতে পেয়েছি, খুব কম চিকিৎসকই এই ‘নির্ধারিত’ ছকের বাইরে অন্য কোনো কিছু পরীক্ষা করেন।
এখানে আরও বিষয় আছে, যা এই বিচার প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করে। বাংলাদেশে সরকারি চাকরি বিধি অনুযায়ী তিন বছর পরপর বদলি হন সরকারি কর্মকর্তারা। তিন বছর পর চিকিৎসকরাও বদলি হন। বাংলাদেশে এখনও আদালত থেকে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য প্রচলিত ধারায় চিঠি যায়, কিন্তু দেখা যায় সেই চিকিৎসক আগের ঠিকানায় আর নেই। তখন আবার নতুন করে ঠিকানা নিয়ে চিঠি পাঠানো হয়। এগুলো করতেও অনেক সময় চলে যায়।
গবেষণায় আমরা এমনও পেয়েছি যে, বড় মেয়ে ধর্ষণের শিকার হয়েছে (তার বয়স ৯) এবং মামলার বাদী তার মা; কিন্তু তার আরও ছোট ভাই-বোন থাকায়, তাদেরকে নিরাপদে রাখার জন্য কাউকে না পেয়ে তিনিও শুনানির দিন আদালতে যেতে পারেননি। কারণ এখনও অভিযোগকারীর পরিবারের নিরাপত্তার বিধান আমাদের দেশে করা হয়নি।
আদালতের লড়াইয়ে আরও যে জিনিসটি প্রয়োজন হয়, সেটি হলো অর্থ। এখানে আমাদের মনে রাখতে হবে, সব ধর্ষণ মামলার বাদী রাষ্ট্রপক্ষ নয়। সেখানে সাড়ে তিন মাসের মধ্যে মামলার কার্যক্রম শেষ হওয়ার কথা থাকলেও সেটি গড়ায় ৫ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত। এত দীর্ঘ সময় মামলা চালানোর আর্থিক ক্ষমতা অনেক পরিবারেরই থাকে না। সরকারিভাবে বিনা পয়সায় আইনজীবী পাওয়ার ব্যবস্থা থাকলেও সেই তথ্যটি যেমন অনেকেই জানেন না, তেমনি সরকারিভাবে খুব বেশি টাকা-পয়সা পান না বলে আইনজীবীরাও এসব মামলায় খুব বেশি শ্রম দিতে চান না। যার ফলে মামলার অর্ধেক পথে অনেকেই হতাশ হয়ে সরে যান। অন্যদিকে বাড়তে থাকে ভয়। কারণ ধর্ষক জামিনে ছাড়া পেয়ে প্রথমেই যে কাজটি করে, তা হলো ‘প্রতিশোধ নেওয়া’।
আমাদেরকে আপাত ‘শান্তি’ দিয়ে শান্ত করার এই কয়েকটি বিচারই কি শেষ ধাপ? যে বিচারগুলো সম্পন্ন হয়ে এখনই কি সেগুলোর রায় কার্যকর হবে? আমাদের দেশে একটি আক্ষেপ আমরা অনেক সময়ই দেখি, যার বেশিরভাগ আসে ধর্ষণ বা হত্যার শিকার হওয়া ব্যক্তির স্বজনদের কাছ থেকে। আর তা হলো, ‘রায় তো হলো, এটির বাস্তবায়ন দেখে যেতে পারব তো?’ তার মানেই হলো বাস্তবায়নেও রয়েছে বিশাল ধাপ এবং বাস্তবায়নের হার খুবই কম। ২০২০ সালের ১৬ অক্টোবর দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে, দেশে ধর্ষণসংক্রান্ত মামলায় গত ১১ বছরে (২০২০ এর আগের) পাঁচজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। এরপর ধর্ষণ মামলার আর কোনো রায় কার্যকর হয়েছে কিনা জানতে পারা যায়নি। তাহলে খুব সহজেই অনুমেয় যে, রায়ের বড় অংশ বাস্তবায়িত হয় না।
কেন হয় না? রায়ের পর তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুমোদনের জন্য হাইকোর্ট বিভাগে পাঠানো হয়, আইনি ভাষায় যাকে ‘ডেথ রেফারেন্স’ বলা হয়। হাইকোর্টে মামলার অভিযোগ, সাক্ষ্য-প্রমাণ, সংশ্লিষ্ট তদন্ত, বিচারিক কার্যক্রম ও আইনি দিকগুলো পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়। হাইকোর্ট আবারও আইনি ধারা অবলম্বন করে আগের রায় অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখতে পারে, কিংবা সাজা কমিয়ে-বাড়িয়ে দিতে পারে। আবার এসব মামলা থেকে আসামি খালাসও পেয়েছে, এমন উদাহরণও রয়েছে অনেক।
আসামি হাইকোর্টের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে আপিল করতে পারেন। সেই আপিল আবেদন খারিজ হলে আসামি আবার সেই আপিলের বিরুদ্ধে রিভিউ আবেদন করতে পারেন। এরপরেও থাকে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন। তবে এসব ক্ষেত্রে বড় ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব কাজ করে। আমাদের দেশে রাষ্ট্রপতিরা বিভিন্ন সময়ে যাদের প্রাণভিক্ষা দিয়েছেন, সেগুলো মূলত রাজনৈতিক বিবেচনাতেই হয়েছে।
বিচার আর রায় বাস্তবায়ন এক কথা নয়; তাই রাষ্ট্রের চাওয়াতে কোনো কোনো বিচার খুব দ্রুত হয়, যদিও বেশিরভাগের ক্ষেত্রেই তা হয় না। এর পরে সেটি বাস্তবায়নের আকাঙ্ক্ষা জনগণের থাকলেও, বেশিরভাগ সময়ই রাষ্ট্রের মাঝে আগের মতো ক্ষিপ্রতা থাকে না। কেন? সেই প্রশ্নের উত্তর অনুমান করা যায় হয়তো, কিন্তু তা কখনো নিশ্চিত করে জানা হয়ে ওঠে না।
জোবাইদা নাসরীন শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ইমেইল: [email protected]