Published : 20 Jun 2026, 09:55 AM
এখানে এখন গভীর রাত। জানালার বাইরে অচেনা শহরের আলো জ্বলছে, ভাষাটাও অচেনা বলে চারপাশটা কেমন চুপচাপ। দেশ থেকে আমি হাজার মাইল দূরে। এত দূরে যে এখানে ভোর হলে দেশে দুপুর গড়িয়ে যায়। ঘুম আসছিল না, তাই ফোনটা হাতে নিয়েছিলাম। আর তখনই চোখের সামনে ভেসে উঠল একটা শিরোনাম: ‘পোস্তগোলায় রাস্তা পার হওয়ার সময় গাড়ির ধাক্কায় পথচারী নিহত।’
পোস্তগোলা। শ্যামপুর। ঢাকা। আমার শহর। আমার বাবার শহর।
ভয় পেলে মনে হয় শরীর মনের আগে টের পায়। আমার হাতটা হঠাৎ অবশ হয়ে গেল। বুকের ভেতরে এমন ধক করে উঠল যেন ভেতর থেকে কেউ দরজায় জোরে জোরে কড়া নাড়ছে। বয়স লেখা, পঞ্চান্ন। আমার বাবার বয়সও তো ওনার কাছাকাছি। সকাল সোয়া আটটা, ঠিক এই সময়টাতেই বাবা হাঁটতে বেরোন। যাত্রীছাউনির সামনে, ওখান থেকেই তো বাবা প্রতিদিন বাজারে যান।
ফোন বের করলাম, বাবাকে কল করব। তারপর আঙুল থেমে গেল। যদি রিং হয়, আর কেউ না ধরে? টিকিটের জন্য ওয়েবসাইট খুললাম, আজ ভোরে কোনো ফ্লাইট আছে কিনা। পাসপোর্টটা কোথায় রেখেছি যেন। মাকে কল করব নাকি ছোট ভাইকে, কাকে আগে, কী বলব, "মা, বাবা ঠিক আছে তো?" এই একটা বাক্য ভাবতে গিয়েই গলা শুকিয়ে কাঠ। বিদেশে এসে খুব বুঝেছি যে, দূরত্ব জিনিসটা শুধু মাইলে মাপা যায় না।
খবরটা আবার পড়লাম, এবার আস্তে আস্তে। নাম লেখা আছে। অজিত বাবু।
অজিত বাবু আমার বাবা নন।
লম্বা একটা শ্বাস ফেললাম। চোখে জল এসে গেল, স্বস্তির জল। বাবা বেঁচে আছেন। আজ সকালেও চা খেয়েছেন নিশ্চয়ই, পত্রিকা উল্টেছেন, এবং এর এক ফাঁকে হয়তো আমার কথাও ভেবেছেন।
আর ঠিক তার পরের মুহূর্তেই একটা লজ্জা এসে চেপে ধরল। আমি স্বস্তি পাচ্ছি কেন? শুধু এই জন্য যে, মানুষটা আমার পরিচিত, কাছের কেউ নয়?
অজিত বাবুও তো কারও বাবা ছিলেন।
খবরের শেষে আরেকটা লাইন ছিল। "নাম আর বয়স বাদে নিহত ব্যক্তির আর কোন পরিচয় জানা যায়নি।" এত সাদামাটা একটা বাক্য, অথচ ভেতরে কী ভয়ংকর একটা শূন্যতা। একজন মানুষ পঞ্চান্ন বছর বেঁচে ছিলেন। কারও ছেলে, কারও স্বামী, হয়তো কারও বাবা। চায়ের দোকানে তার বাঁধা একটা জায়গা ছিল হয়তো, একটা পুরোনো বহুল ব্যবহৃত ছাতা কিংবা আগামী পুজোতে পরার জন্য যত্ন করে তুলে রাখা একটা ধুতি-পাঞ্জাবি। কেউ একজন হয়তো আজ দুপুরেও তার ভাতটা ঢেকে রাখবে, এই ভেবে যে মানুষটা ফিরবে। সকাল সোয়া আটটায় একটা মাইক্রোবাস এসে সেই গোটা জীবনটাকে কাগজের এক লাইনে নামিয়ে আনল।
আমরা এই লাইনগুলো রোজ পড়ি। চোখ বুলিয়ে পাতা উল্টে পরের পাতায় চলে যাই। কারণ আমরা জানি না যে, কোন এক নিঝুম রাতে হাজার মাইল দূরে কোনো সন্তান এই এক লাইন পড়ে শ্বাস বন্ধ করে বসে আছে কিনা।
কিছু দিন আগে একটা হিসাব চোখে পড়েছিল। গত বছর শুধু পথচারীই মারা গেছেন প্রায় দেড় হাজার। ভাগ করলে দাঁড়ায়, রোজ চারজনের মতো। মানে আজকের অজিত বাবুর মতো আরও তিনজন আজই কোথাও না কোথাও। চারটি পরিবার। যারা হয়তো কাছে কিংবা দূর কোনো শহরে বসে কাঁপা হাতে ফোন তুলেছিল, কেউ ওপাশে চেনা গলা পেয়েছে, কেউ পায়নি।
আমরা এদের নাম দিই ‘সড়ক দুর্ঘটনা’। কিন্তু যে রাস্তায় বছরের পর বছর পথচারীর পার হওয়ার একটুকরো নিরাপদ জায়গা রাখিনি, যেখানে গাড়ি ছোটে বেপরোয়া গতিতে, যেখানে পার হতে হলে হয় প্রাণ হাতে নিয়ে দৌড়, নয়তো বুড়ো হাঁটু নিয়ে ফুট-ওভারব্রিজের খাড়া সিঁড়ি বেয়ে ওঠা, সেখানে এই মৃত্যু কি সত্যিই ‘দুর্ঘটনা’? হয়তো আগে থেকে লিখে রাখা একটা অপেক্ষমাণ নিশ্চয়তার খাতা, যার নম্বর আছে, নাম আছে, আছে তারিখ আর স্থান।
যারা এই শহর চালান, রাস্তা বানান, আইন লেখেন আর মানান, আমি জানি, আপনারাও কারও সন্তান, কারও বাবা, কারও মা। আপনার পকেটেও একটা ফোন আছে, যেটা ভুল সময়ে বাজলে আপনার হাতও ঠান্ডা হয়ে যাবে।
আপনাদের প্রতি শুধু একটা অনুরোধ। একবার পোস্তগোলার ওই যাত্রীছাউনির সামনে এসে দাঁড়ান। শুধু পাঁচটা মিনিট। দেখুন, একজন বয়স্ক মানুষ দুই হাত শূন্যে তুলে বা প্রায় হাত জোড় করে, গাড়ির দিকে অসহায়ভাবে তাকিয়ে, ছুটন্ত গাড়ির ফাঁক গলে রাস্তা পার হচ্ছেন। ওই মানুষটাকে আকাশে ওঠার সিঁড়ি দেওয়ার দরকার নেই; দরকার মাটিতেই, ঠিক যেখানে তিনি পার হন সেখানেই, একটা নিরাপদ পথ। জেব্রা ক্রসিংটা যেন শুধু রঙে রঙিন হয়ে না থাকে, ক্রসিংয়ের জায়গাটা একটু উঁচু করে দিন, রাস্তা উঁচু হলে গাড়ি নিজেই গতি কমাতে বাধ্য হয়। মাঝখানে দাঁড়িয়ে এক দণ্ড দম নেওয়ার একটুখানি জায়গা রাখুন, যাতে একসঙ্গে গোটা রাস্তা পেরোতে না হয়। আর সবচেয়ে বড় কথা, গাড়ির গতিটা কমান। কারণ হিসাবটা নিষ্ঠুর রকম সহজ, ঘণ্টায় ত্রিশ কিলোমিটারের ধাক্কা থেকে মানুষ অনেক সময় উঠে দাঁড়ায়, ষাটের ধাক্কা থেকে আর ওঠে না। গোটা পার্থক্যটা ওই গতিটুকুরই।
অজিত বাবুকে এতে ফেরানো যাবে না, সে আমিও জানি। কিন্তু পরের অজিত বাবুকে হয়তো রক্ষা করা যাবে। আপনার আজকের নেওয়া একটা সিদ্ধান্ত হয়তো কারও বাবাকে আগামী কোন এক সন্ধ্যায় সুস্থ স্বাভাবিকভাবে তার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতে পারে।
রাত ফুরিয়ে আসছে। জানালার বাইরে আকাশ ফরসা হচ্ছে। আমি শেষমেশ মোবাইলটা তুললাম। দেশে এখন ভর দুপুর। বাবা ধরলেন একদম প্রথম রিংয়ে।
‘কী, এত সকালে?"
কিছু বলতে পারলাম না। কাঁদলাম, আর কাঁদতে কাঁদতেই হেসে ফেললাম। বাবা কিছুই বুঝলেন না। একটু চুপ থেকে বললেন, "পাগল একটা।"
বাবা জানলেন না, আজ সকালে কয়েক মিনিটের জন্য আমি তাকে হারিয়ে আবার ফিরে পেয়েছি।
অজিত বাবুকে আমি চিনতাম না। কোনোদিন দেখার কোনো সুযোগ না রেখে চলে গেছেন। তবু আজ থেকে তিনি কেমন যেন আমারও বাবা হয়ে গেলেন। ভবিষ্যতের অজিত বাবুদের সন্তানদের জন্য আমার একটাই প্রার্থনা, পরের কোনো ভোরে, বিদেশে থাকা কোনো সন্তানের ফোনের ওপাশে যেন নীরবতা না থাকে। যেন একটা চেনা, ক্লান্ত, ভালোবাসায় ভেজা গলা একটু বিরক্ত হয়ে বলে ওঠে, ‘পাগল মেয়ে একটা।’
মানুষ তো ফুরিয়ে যায়ই, আগে বা পরে, এই যা। কিন্তু একজন মানুষ পুরোপুরি ফুরিয়ে যায় ঠিক তখন, যখন আমরা তার মৃত্যুটাকে এক লাইনের খবর বানিয়ে নির্বিকার মুখে পাতাটা উল্টে দিই।
মাহমুদ উজ জামান সহকারী অধ্যাপক, নগর ও গ্রামীণ পরিকল্পনা বিভাগ, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে থাইল্যান্ডে পরিবহন প্রকৌশলে উচ্চতর পড়াশোনা করছেন। ই-মেইল: [email protected]