Published : 22 Jun 2026, 06:18 PM
আমাদের শিক্ষামন্ত্রী নকল বন্ধে অসম্ভবরকম খ্যাতি অর্জন করেছেন। কিন্তু নকল রোগের লক্ষণ, রোগ নয়। রোগের লক্ষণ কমাতে পারলে রোগের উপশম হয়, তবে সুস্থ হওয়ার জন্য রোগের কারণ দূর করা বেশি প্রয়োজন। তা করলে জাতি আরও বেশি উপকৃত হবে। ছেলেমেয়েরা নকল কেন করে? পড়া না পারায়। কেননা পরীক্ষায় তো পাশ করতে হবে। পরীক্ষায় পাশের জন্য যারা দেখে লেখে তারা নকলের দায়ে অভিযুক্ত। আর যারা না দেখে লেখে ভালো নম্বর পেয়ে পরীক্ষায় পাশ করে তারা মেধাবী হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু এ ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করেছেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
‘শিক্ষার বাহন’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন: “মুখস্থ করিয়া পাস করাই তো চৌর্যবৃত্তি। যে ছেলে পরীক্ষাশালায় গোপনে বই লইয়া যায় তাকে খেদাইয়া দেওয়া হয়; আর যে ছেলে তার চেয়েও লুকাইয়া লয়, অর্থাৎ চাদরের মধ্যে না লইয়া মগজের মধ্যে লইয়া যায় সেই বা কম কী করিল? সভ্যতার নিয়ম অনুসারে মানুষের স্মরণশক্তির মহলটা ছাপাখানায় অধিকার করিয়াছে। অতএব যারা বই মুখস্থ করিয়া পাস করে তারা অসভ্যরকমে চুরি করে অথচ সভ্যতার যুগে পুরস্কার পাইবে তারাই?”
তার মতে যারা দেখে লেখে না, তারাও তো নকলই করে। দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য হলো একজন জনসমক্ষে করে দুর্ভাগ্য হলে ধরা খায়, অন্যদিকে আরেকজন মুখস্থ করে অর্থাৎ মনের মাঝে উত্তর টুকে এনে পরীক্ষার খাতায় উগড়ে দেয় বলে পরীক্ষকের চোখে পড়ে না। তার মানে নকল করা দোষের নয়, ধরা পড়াটাই দোষের মাত্র। যারা এই সত্য জানে তারা কেউ কেউ আবার পকেটের মাঝে লুকিয়ে রাখা নকল বের করে ধরা না পড়ে পরীক্ষায় উচ্চ নম্বর পেতে পারে। এরা ওই দুই দল নকলবাজের মাঝে সবচেয়ে বেশি মেধাবী, এরা যে মেধার জগতে চ্যাম্পিয়ন এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু শিক্ষা বলতে এই তিন ধরনের একটাও বোঝায় না।
শিক্ষার মূল উপকরণ তিনটি—নৈতিকতা অর্জন, মনের দিগন্ত তথা বোধের প্রসারণ ও তথ্য জোগাড়। গুরুত্বের বিবেচনায়ও এই উপকরণ তিনটিকে এই ক্রমে বিন্যস্ত করা যায়। আমাদের দেশের স্কুল-কলেজে এই তিনটি উপরেণের মধ্যে সবচেয়ে ও একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হচ্ছে এই তথ্য জানা ও তা প্রকাশ করতে পারা। পরীক্ষার খাতা দেখার ক্ষেত্রে আবার প্রকাশ করতে পারাটাই মুখ্য। মানে তিনটির মধ্যে একটির অর্ধেক অর্থাৎ ছয় ভাগের এক ভাগ হলেই আমাদের শিক্ষা পূর্ণ হয়ে গেল! আমাদের শিক্ষকরাও এই ছয় ভাগের এক ভাগের জন্য উঠেপড়ে লাগেন। এজন্যই আমাদের দেশের শিক্ষায় যতরকম আয়োজন—প্রাইভেট, কোচিং, পরীক্ষা, নোটগাইড বই, শ্রেণিকক্ষে শাস্তি ইত্যাদি।
আজকের আলোচনা এই শাস্তি নিয়েই। নকল ও শাস্তির উদ্ভব একই শিকড় থেকে—মানহীন শিক্ষা। গত কয়েক বছরে স্কুলে শাস্তি তুলনামূলকভাবে হ্রাস পেয়েছে, তবে এখনও এর চর্চা আছে। আর আশঙ্কার বিষয় হলো সম্প্রতি এটি বেড়ে চলেছে, একদিকে সমাজের সর্বস্তরে সহমর্মিতা কমে হিংস্রতা বেড়ে যাওয়ায়, অন্যদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এ বিষয়ে ঔদাসীন্যের কারণে। খোদ ঢাকা শহরেই এমন অনেক সরকারি-বেসরকারি স্কুল আছে যেখানে শিশুদেরকে পান থেকে চুন খসার অপরাধে পেটানো ও মানসিকভাবে অপদস্থ করা হয়। আর ওইসব শিক্ষকেরাই পিটিয়ে শ্রেণিকক্ষে নিজেদের যোগ্যতার বেশি বেশি প্রমাণ দেন যাদের পড়ানোর যোগ্যতা সবচেয়ে কম। নিজেদের অযোগ্যতা ও বুঝিয়ে পড়ানোর অক্ষমতাকে ঢেকে রাখতে তারা শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের পুরো সময়টা পার করেন বিভিন্ন শিক্ষার্থীর ওপর হম্বিতম্বি করে। নিয়মিত তাদের এরূপ হেনস্তার শিকার হয় যেসব শিশু তারা হলো: যারা গরিব পরিবারের, যারা শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট পড়ার সামর্থ্য রাখে না বা কোচিং করতে পারে না, যারা শিক্ষকের শিখিয়ে দেয়া ফরম্যাটের বাইরে উত্তর দেয় বা লেখে ইত্যাদি। এমন উদাহরণ অনেক যে, শিক্ষক বলেন অমুক গাইড বই ক্লাসে নিয়ে আসতে, না আনলে শিক্ষার্থীকে কৈফিয়ত দিতে হয়। কারণ শিক্ষক নিজে এত অল্প জানেন যে গাইড বইয়ের ওপর নির্ভর করা ছাড়া তার উপায় নেই।
এছাড়াও শিশুদের হেনস্তা করার নানা কৌশল শিক্ষকের হাতে থাকে। শিশুদের অভিভাবকরাও অনেক সময় হেনস্তা হন। এসব কখনো কখনো মর্মান্তিক ঘটনারও জন্ম দেয়। কিছুদিন সামাজিক মাধ্যমে হৈ-চৈয়ের পর তা স্তিমিত হয়ে পড়ে। অথচ এটি নিরসনের কোনো উদ্যোগ নেই। যদিও শারীরিক শাস্তি প্রদান আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ, তা বহাল তবিয়তে চলে। ওইসব স্কুলে বেশি চলে যেখানে শিক্ষকের মান কম। অর্থাৎ শিক্ষকের অযোগ্যতার দায়ভার নিতে হয় শিক্ষার্থীকে। এমন শিক্ষকগণ ক্লাসে এসে পড়ানোর পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের নানা অপরাধের ফিরিস্তি দিয়ে থাকেন। যেন শিক্ষার্থীরা এত খারাপ যে তিনি তার যোগ্যতা প্রকাশ করতে ব্যর্থ হচ্ছেন। আসল কারণ কি এই নয় যে, শিক্ষক মানহীন বলে ও পড়াতে পারেন না বলেই ছাত্রছাত্রীরা শিখতে পারছে না?
শিক্ষকের মান কতটা কম তা সহজেই বোঝা যায়, যখন জানার চেষ্টা করবেন, কতজন শিক্ষক বইপুস্তক পড়েন ওই সংখ্যা। আশ্চর্য! তারা কেন বই পড়বেন? তারা কি পরীক্ষা দেবেন? তাই তো! অনেক স্কুলে কোনো পাঠাগার নেই, যেখানে আছে সেখানেও ছাত্রছাত্রীকে লাইব্রেরি থেকে বই নিতে উৎসাহিত করা হয় না। করলেই বা ছাত্রছাত্রী কেন লাইব্রেরি থেকে পাঠ্যবইয়ের বাইরের বই নেবে? চোখের সামনে জলজ্যান্ত যে শিক্ষককে সে দেখে তিনি যদি জীবনে লাইব্রেরি থেকে একটি বইও না নেন, তাহলে শিক্ষার্থী কেন নেবে? সে কি এতই গর্দভ! আর যে শিক্ষক কখনো বই পড়েন না তিনি কীভাবে পড়াবেন, কী পড়াবেন। শিক্ষকতার মানে তার কাছে ছাত্র পেটানো ছাড়া আর কিছুই না।
স্কুলে শিশুকে পেটানো বন্ধ করতে হলে শিক্ষকদের বইপুস্তক পড়তে হবে ও নিজেদের মান উন্নত করতে হবে। এছাড়াও তাদের প্রাইভেট পড়ানো ও কোচিং বন্ধেরও বিকল্প নেই। শিক্ষার মান বাড়ানো ও পরীক্ষায় ভালো ফল করানোর জন্য কোচিংয়ের অজুহাতটি ডাহা মিথ্যা। ক্লাসে না পড়ালে তো কোচিং করাতেই হবে। যারা বেকার বা অভাবী শিক্ষার্থী তারা নিজেদের পড়ালেখা চালিয়ে নেয়ার জন্য প্রাইভেট পড়ালে হয়তো কিছু লাভ হয়। কিন্তু স্কুলের শিক্ষক যখনই প্রাইভেটে বা কোচিংয়ে পড়ান তখন তো তিনি শিক্ষার্থীদের নিয়ে বৈষম্যমূলক আচরণের সুযোগ পেয়ে যান। কেননা যেসব শিক্ষার্থী দারিদ্র্যের কারণে বা বড় ভাই-বোনের সহযোগিতা পায় বলে প্রাইভেট পড়ে না বা স্কুলে কোচিং করে না, তারা হয়ে পড়ে শিক্ষকের চক্ষুশূল। আর যে বা যারা প্রাইভেট পড়ে বা কোচিং করে শিক্ষক তাদেরকে পরীক্ষার প্রশ্ন অগ্রিম বলে দেন যাতে তারা স্কুলের পরীক্ষায় ভালো ফল করে। এভাবে তারা অভিভাবকদের কাছে প্রমাণ করতে পারেন যে, প্রাইভেট পড়া বা কোচিং করার জন্যই ছেলে বা মেয়েটি ভালো ফল করেছে। আর যে বা যারা ভালো করেনি তাদের অভিভাবকরা অসচেতন, তাই সন্তানকে কোচিংয়ে দেয়নি, তার ফলে নাকি সন্তানের পরীক্ষায় খারাপ ফল!
এভাবে শিক্ষকরা শিশুদের দুই দিক থেকে সর্বনাশ করেন। একদিকে কিছু ছেলেমেয়ে সত্যিকারভাবে ভালোমতো কিছু না শিখেই ভালো রেজাল্ট করে যা আখেরে ভালো ফল দেবে না, অন্যদিকে যারা সত্যিকারভাবে শিখল বা জানার চেষ্টা করল তারা অবমূল্যায়িত হলো এবং একসময় হীনমন্যতার শিকার হবে। আমি ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষককে এই সমস্যা জিজ্ঞেস করায় তিনি শিক্ষকদের এই অনৈতিক আচরণের কথা পুরোপুরি অস্বীকার করলেন। প্রধান শিক্ষক সাহেব আমার পরিচিত হওয়ায় সৌভাগ্যক্রমে খারাপ আচরণের শিকার হইনি। তার স্কুলে শিক্ষার্থীদের পেটানোর ঘটনাও তিনি অস্বীকার করলেন, কিন্তু তা সত্য নয় আমি জানি। স্কুলের এক শিক্ষার্থীর কাছ থেকেই জানি, সে কোচিং করে না, কিন্তু তার যে ক্লাসমেট কোচিং করে তার বইটা একদিন কিছুক্ষণের জন্য ধার নিয়ে দেখে বইয়ের মাঝে ভাঁজ করে রাখা আগামী ক্লাস পরীক্ষার প্রশ্নসমূহ। এই শিক্ষার্থী কি কোনোদিন তার শিক্ষককে বিশ্বাস ও সম্মান করতে পারবে?
শিক্ষকদের প্রতি শিক্ষার্থীদের শ্রদ্ধা কোন তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে তার দৃষ্টান্ত দুই বছরে দেশবাসী দেখেছে। কিন্তু এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির পেছনে শিক্ষকদের নিজেদের দায়ও খুঁজে বের করতে হবে। সমাধান খুবই জরুরি। কেননা শিক্ষক পেটানো কোনোভাবেই কাম্য নয়, তবে শিক্ষকদের শিক্ষার্থী পেটানোর অভ্যাসও অবিলম্বে বদলানো উচিত। প্রথমটা বেদনাদায়ক, দ্বিতীয়টাও অসমর্থনযোগ্য।
আলমগীর খান কবি ও সমাজকর্মী। ই-মেইল: [email protected]