Published : 23 Jun 2026, 11:09 AM
বিশ্বসাহিত্যের চিরায়ত গ্রন্থমালার প্রতি আমার ঝোঁকটা একটু বেশিই। আর সেজন্য আমি বারবার চিরায়ত এসব গ্রন্থমালার কাছেই যেন ফিরে আসি। চিরায়ত এই বইগুলো আমাকে তীব্রভাবে বইমুখী করে তোলে, পৃথিবীকে ভিন্ন ভাবে দেখতে শেখায় এবং আমাকে বারবার মনে করিয়ে দেয় যে বই এক অসাধারণ বন্ধু।
সম্প্রতি আমি নিকোলাই গোগলের ‘দ্য ওভারকোট’ গল্পটি পড়েছি। এটি বিশ্বসাহিত্যের সেই চিরায়ত ও অমলিন রচনাগুলোর একটি, যা পাঠককে একইসাথে মানব অস্তিত্বের বহুমাত্রিক জগতে প্রবেশ করায়। সমাজ, শ্রেণিবিন্যাস, আমলাতন্ত্র, নিঃসঙ্গতা, মর্যাদাবোধ, সাধারণ মানুষের অদৃশ্যতা এবং দৈনন্দিন জীবনের ভেতরে লুকিয়ে থাকা নীরব নিষ্ঠুরতা— এ সবকিছু নিয়েই হল নিকোলাই গোগলের গল্প ‘দ্য ওভারকোট’। এ গল্পটি পড়ার আগে আমি কল্পনাও করতে পারিনি যে একটি সাধারণ ওভারকোটকে কেন্দ্র করে রচিত একটি আখ্যান এত গভীর অর্থ বহন করতে পারে, কিংবা একজন পাঠক হিসেবে আমার মনে এত দীর্ঘস্থায়ী ও গভীর ছাপ রেখে যেতে পারে।
গোগল এখানে ওভারকোটের মত একটি সাধারণ বস্তুকে মানবজীবনের সামাজিক মর্যাদা, স্বীকৃতি ও অস্তিত্বের মূল্য নির্ধারণের মাপকাঠি হিসেবে খুব শক্তিশালী এক প্রতীকি রূপে পাঠকের সামনে উপস্থাপন করেছেন। নিঃসন্দেহে ‘দ্য ওভারকোট’ আমার পাঠ-অভিজ্ঞতায় এ বছরে পড়া এখন পর্যন্ত অন্যতম একটি সেরা সাহিত্যকর্ম হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। এখানে, বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, গল্পটি উনিশ শতকের রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গকে কেন্দ্র করে রচিত হলেও, এই গল্প আজও সমকালীন বিশ্বের বাস্তবতার সঙ্গে আশ্চর্যরকমভাবে প্রাসঙ্গিক—পড়তে পড়তে মনে হয়, এ যেন উনিশ শতকের সেন্ট পিটার্সবার্গ নয়; বরং আজকের দিনের ঢাকা, কলকাতা, লন্ডন, কিংবা নিউইয়র্ক।
আমাদের এই গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে আকাকি আকাকিয়েভিচ, একজন সাধারণ কপিস্ট (Copyist), যিনি সরকারি দপ্তরে কাজ করেন। যদিও তিনিই এ গল্পের মূল চরিত্র, তবুও অনেক সময় মনে হয় তার ওভারকোটই যেন হয়ে উঠেছে এই আখ্যানের প্রকৃত কেন্দ্রীয় উপস্থিতি।
আকাকি আকাকিয়েভিচ একেবারেই নীরব, বিনয়ী এবং প্রায় অদৃশ্য এক জীবনযাপন করেন, যার পরিণতি এক ট্র্যাজেডিতে গিয়ে শেষ হয়। তাঁর মাধ্যমে গোগল দেখান কীভাবে আমলাতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা সাধারণ মানুষকে একদম অদৃশ্য মনে করে এবং আমাদের এ সমাজ মানুষকে তার অবস্থান, ও বস্তুগত সামর্থ্যের ভিত্তিতে বিচার করে— যা ব্যক্তির মানবিক অস্তিত্বকে প্রায় অস্বীকার করে।
আমার কাছে মহান সাহিত্যের শক্তি এখানেই নিহিত— এটি বাস্তবতাকে শুধু বর্ণনা করে না, বরং বাস্তবতার চেয়েও তীক্ষ্ণভাবে সত্যকে প্রকাশ করে। ‘দ্য ওভারকোট’ তাই কেবল একটি গল্প নয়, বরং মানবতার সামনে তুলে ধরা এক নির্মম আয়না, যেখানে আমরা নিজেদেরই প্রতিফলন দেখতে পাই—আমাদের উদাসীনতা, আমাদের শ্রেণিচেতনা, এবং আমাদের ইচ্ছায়-অনিচ্ছায়-অপারগতায় গড়ে ওঠা নিষ্ঠুরতা।
মানবজীবন চিরকালই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গঠিত হয়েছে, কিন্তু গোগল সেই সংগ্রামকে উপস্থাপন করেছেন ওভারকোটের মত একটি আপাত সাধারণ বস্তুর মাধ্যমে। এই সরল প্রতীকের মধ্য দিয়ে তিনি মানবসভ্যতার গভীরে প্রোথিত এক কঠিন সত্য উন্মোচন করেছেন: সমাজ প্রায়শই মানুষের মূল্য নির্ধারণ করে বাহ্যিক অবস্থান ও সম্পদের ভিত্তিতে যা আমাদেরকে ভাবতে বাধ্য করে— সমাজ আসলে কী? সমাজ আসলে কে বা কারা? এটি কোনো আলাদা অস্তিত্ব নয়; বরং এটি আমাদেরই সমষ্টিগত প্রতিচ্ছবি— আমাদের বিচার, আমাদের চিন্তা, আমাদের উদাসীনতা এবং আমাদের অহংকারের এক জটিল সমাহার যা একসময় আমাদের জন্যই হয়ে ওঠে বিধ্বংসী। কারণ আমরাই সমাজ।
গল্পের শুরুতে আকাকির জীবন আমার কাছে কিছুটা অদ্ভুত ও অবাস্তব মনে হয়েছিল। কিন্তু মানবজীবন তো প্রায়শই কিছুটা অযৌক্তিক। কিন্তু যত আমি গল্পটির গভীরে প্রবেশ করেছি, ততই এটি আরও করুণ হয়ে উঠেছে। একটি চুরি হয়ে যাওয়া ওভারকোট, তারপর অসুস্থতা, এবং শেষ পর্যন্ত মৃত্যু—এই সরল ঘটনাক্রম বাইরে থেকে দেখলে প্রায় হাস্যকর বা তুচ্ছ মনে হতে পারে, কিন্তু গোগল সেই তুচ্ছতাকেই পরিণত করেছেন গভীর এক মানবিক শোকগাথায়।
যে বিষয়টি আমাকে সবচেয়ে বেশি স্পর্শ করেছে, তা হলো আকাকির নিঃসঙ্গতা। গল্পের শুরু থেকেই তাঁর অস্তিত্ব যেন সমাজের ভিড়ে হারিয়ে যায়—সে যেন থেকেও নেই। সহকর্মীরা তাঁকে উপহাস করে, সমাজ তাঁকে উপেক্ষা করে, এমনকি তাঁর নিজের উপস্থিতিও যেন অপ্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। তাঁর কোনো সামাজিক মর্যাদা নেই, কোনো প্রভাব নেই, নেই কোনো স্বীকৃতি। একটি সাধারণ মানসম্পন্ন ওভারকোট পর্যন্ত তাঁর নেই—এটা তাকে প্রতিনিয়তই মনে করিয়ে দেওয়া হয়। আর এ বিষয়টিই আমাকে ভীষণ অস্থির করে তোলে। সমাজ যেন প্রতিনিয়ত মানুষকে তার অবস্থানের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, এবং যখন কেউ সেই সমাজের ঠিক করে দেওয়া অবস্থানের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে ব্যর্থ হয় কিংবা খাপ খাওয়াতে চায় না, তখন বিচার হয়ে ওঠে নির্মম ও নিষ্ঠুর—সবাই যেন কাঠঠোকরার মতো অবিরামভাবে সেই মানুষটির অস্তিত্বকে আঘাত করতে থাকে।
এছাড়া, গল্পে আমলাতন্ত্রের এক ভয়াবহ রূপ ফুটে ওঠে। গোগল অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে দেখান, কীভাবে একটি ব্যবস্থা ন্যায়বিচারের চেয়ে শ্রেণিবিন্যাসকে বেশি গুরুত্ব দেয়। এমনকি সেই ব্যবস্থার ভেতরে থাকা ব্যক্তিরাও— যেমন আকাকি— প্রকৃত অর্থে ক্ষমতাহীন হয়ে পড়ে। আকাকি একজন সরকারি কর্মচারী হলেও, তাঁর জীবন কেবল কাগজ অনুলিপি করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তাঁর কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেই। এমনকি, নিজের জীবনে এই কাজটি ছাড়া সেরকম আর কিছুই তার ছিল না। তবুও তিনি সেই ব্যবস্থার কাছেই সবচেয়ে অপ্রয়োজনীয় ও অদৃশ্য ব্যক্তি হয়ে থাকেন, যার তিনি নিজেই একটি অংশ। তিনি ন্যায়ের খোঁজে এক দপ্তর থেকে আরেক দপ্তরে ঘুরে বেড়ান, কিন্তু কোথাও কোনো সহানুভূতি বা সমাধান পান না। এই ব্যর্থতা শুধু ব্যক্তিগত নয়, বরং পুরো ব্যবস্থার অন্তর্নিহিত নিষ্ঠুরতার প্রতিফলন। এখানে গোগল অত্যন্ত তীক্ষ্ণভাবে দেখিয়েছেন কীভাবে মর্যাদার শ্রেণিবিন্যাস মানুষকে তারই তৈরি ব্যবস্থার ভেতরে অদৃশ্য করে তোলে।
এ গল্পে ওভারকোট কেবল একটি পোশাক নয়; এটি একটি প্রতীক। এটি আকাকির জীবনে প্রথমবারের মতো কিছুটা দৃশ্যমানতা, মর্যাদা ও স্বীকৃতি নিয়ে আসে। কিন্তু যখন ওভারকোটটি হারিয়ে যায়, তিনি আবার সমাজের চোখে অদৃশ্য হয়ে পড়েন। এই ওঠানামার মধ্য দিয়ে গোগল অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে দেখিয়েছেন কীভাবে মানুষের মর্যাদা তার ব্যক্তিত্বের ওপর নয়, বরং একটি বাহ্যিক প্রতীকের ওপর নির্ভর করে।
এই সরল অথচ গভীরভাবে বেদনাদায়ক আখ্যানের মাধ্যমে গোগল সাধারণ মানুষের নীরব কষ্ট, সমাজের নির্মমতা এবং মানবমর্যাদার ভঙ্গুরতাকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন, যা পাঠকের মনে দীর্ঘস্থায়ী প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। ‘দ্য ওভারকোট’ তাই শুধু একটি গল্প নয়; এটি সাহিত্যের একটি গভীর পাঠ, একটি নীরব আর্তনাদ, এবং একইসাথে এক সাহিত্যিক সত্যের প্রতিফলন— যা সহজ, অথচ গভীর; তুচ্ছ অথচ ভীষণভাবে মানবিক।