Published : 23 Jun 2026, 09:22 PM
চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতনের পরে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত শব্দগুলোর একটি ‘নতুন বাংলাদেশ’। কেউ কেউ চব্বিশের অভ্যুত্থানকে ‘বিপ্লব’ এবং এই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে অর্জিত সাফল্যকে বাংলাদেশের ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’ বলেও অভিহিত করেছেন। এমনকি অনেকে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গেও এই আন্দোলনের তুলনা করেছেন। এসব নিয়ে অনেক তর্ক হয়েছে বা একাডেমিক পরিসরে এসব নিয়ে এখনও আলোচনার অবকাশ রয়েছে। সেটি অন্য প্রসঙ্গ।
তবে এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরে রাষ্ট্রের যেসব জায়গায় পরিবর্তনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল; যেসব জায়গায় সত্যিকারের ‘সংস্কার’ হবে বলে জনমনে প্রতীতি জন্মেছিল; যেসব পুরোনো বন্দোবস্তের অবসান হবে বলে দলনিরপেক্ষ নাগরিকরা আশায় বুক বেঁধেছিলেন—সেখানে এখন পর্যন্ত সন্তোষজনক কোনো সাফল্য নেই।
সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল, চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অন্তত জনবান্ধব হবে। তারা আর শাসকদলের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার হাতিয়ার কিংবা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনের যন্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হবে না। পুলিশ বা ডিবির কাছে গিয়ে মানুষ ভরসা পাবে। দলীয় বা সামাজিক পরিচয় ছাড়াই একজন অতি সাধারণ নাগরিক বিনা ঘুষ, তদবির ও হয়রানি ছাড়া সেবা এবং ন্যায়বিচার পাবেন। কিন্তু ওই প্রত্যাশা কতটুকু পূরণ হয়েছে বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে আদৌ কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে কি না; তাদেরকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা বন্ধ হয়েছে কি না—ওই প্রশ্নটি যেমন সহজ, উত্তরও সবার জানা।
একটি বিরাট অভ্যুত্থানও যে রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলোতে সংস্কারের কোনো সম্ভাবনা তৈরি করতে পারেনি, তার সবশেষ উদাহরণ ফরিদপুরে গোয়েন্দা পুলিশের হেফাজতে ছাত্রলীগ কর্মী মির্জা ইশতিয়াক আহমেদ প্রান্তর মৃত্যু। পরিবার বলছে, প্রান্ত মধুখালী চিনিকলে চাকরি করতেন। ফরিদপুরে পড়াশোনার সময় ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও বর্তমানে তিনি সংগঠনটির কোনো পদে ছিলেন না।
গত ২২ জুন বাদ জোহর মধুখালী উপজেলার কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠে তার জানাজায় স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, আত্মীয়-স্বজন ও শত শত লোক অংশ নেন। জানাজার আগে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন মধুখালী উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. শাহাবুদ্দিন আহমেদ সতেজ, সাধারণ সম্পাদক মো. আব্দুল আলিম মানিক এবং মধুখালী পৌর বিএনপির সভাপতি মো. হায়দার আলী মোল্লা। (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, ২২ জুন ২০২৬)।
সংবাদমাধ্যমের খবর বলছে, ফরিদপুর জেলা গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল মধুখালীর গোন্দারদিয়া গ্রাম থেকে ১০০ গ্রাম গাঁজাসহ প্রান্তকে আটক করে মধুখালী থানায় নিয়ে যায়। পরবর্তীতে মাদক সংক্রান্ত আরও কয়েকটি অভিযানের পর ভোরে তাকে ফরিদপুরে নিয়ে যাওয়া হয় এবং ডিবি হেফাজতে রাখা হয়। রোববার সকালে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে তার মৃত্যুর খবর পান স্বজনরা।
পরিবারের অভিযোগ, পুলিশি নির্যাতনে তার মৃত্যু হয়েছে। তার মা মির্জা খাদিজা আক্তার নিপা বলেন, “প্রান্তকে আমার সামনে থেকেই বেধড়ক মারপিট করতে করতে নিয়ে যায়। আমার ছেলেকে নির্যাতন করেই হত্যা করা হয়েছে।” যদিও পুলিশের দাবি, তাকে কোনো নির্যাতন করা হয়নি। বরং শ্বাসকষ্টজনিত কারণে এবং ব্রেইন স্ট্রোক করে অসুস্থ হয়ে তার মৃত্যু হয়েছে।
হেফাজতে মৃত্যুর পরে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তরফে সেগুলোকে ‘হার্ট অ্যাটাক’ বা ‘কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট’ বলে দাবি করা হয়? আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়ার পরেই তারা হার্ট অ্যাটাক করেন নাকি তাদের হার্টে অসুখ তৈরি হয়? নাকি পুলিশ বেছে বেছে এমন লোকদেরই ধরে যাদের হার্টের অসুখ আছে? নাকি হেফাজতে মৃত্যুবরণকারী অধিকাংশই যে হার্টের রোগী—সেটি কাকতালীয়? ফরিদপুরের ঘটনায় অবশ্য হার্ট অ্যাটাক না বলে ‘ব্রেইন স্ট্রোক’ বলা হচ্ছে।
ঘটনা তদন্তে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) ফাতেমা ইসলামকে প্রধান করে তিন সদস্যের কমিটি করা হয়েছে। কমিটির অন্য দুই সদস্য হলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) শামসুল আজম এবং ডিএসবির ওসি মোশাররফ হোসেন। তাদেরকে সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। যদিও পুলিশের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগে তদন্ত পুলিশ কতটা নির্মোহ ও নিরপেক্ষভাবে করতে পারবে—সেটি বেশ পুরোনো তর্ক।
পুলিশ বা গোয়েন্দা বাহিনী কিংবা রাষ্ট্রের অন্য যে কোনো বাহিনীর হেফাজতে, এমনকি কারাগারে নির্যাতনেও কারও মৃত্যু হলে সাথে সাথে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে জানানো হয়, ভুক্তভোগী অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। হাসপাতালে নেয়ার পরে অথবা সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব মৃত্যুকে ‘হার্ট অ্যাটাক’ বলে চালিয়ে দেয়া হয়। অর্থাৎ গল্পগুলো ক্রসফায়ার বা কথিত বন্দুকযুদ্ধে কারও মৃত্যুর পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গৎবাঁধা বিবৃতির মতো।
সম্প্রতি অবশ্য ক্রসফায়ার বা কথিত বন্দুকযুদ্ধে বিচারবহির্ভুত হত্যা শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে—যা প্রশংসনীয়। এর পেছনে র্যাবের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞাসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর চাপ এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন বন্ধের হুমকির ভূমিকা আছে বলে মনে করা হয়। তবে কারণ যাই হোক না কেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ক্রসফায়ারের নামে যে বিনাবিচারে হত্যার ঘটনা বন্ধ হয়েছে, সেটি কম কথা নয়। কেননা, একজন লোক যত বড় অপরাধই হোক না কেন, প্রচলিত আইনেই তার বিচার হতে হয়। আদালত বা বিচারব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে কাউকে ধরে এনে হাত পা চোখ বেঁধে গুলি করে জঙ্গলে ফেলে রাখার পরে ক্রসফায়ারের গল্প সাজানো কোনো সভ্য রাষ্ট্রের লক্ষণ নয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ক্রসফায়ার কমলেও বা শূন্যে নেমে এলেও হেফাজতে মৃত্যু থামছে না। এমনকি ‘নতুন বাংলাদেশ’ ও ‘সংস্কারের’ গল্প বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলা বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সময়ে বিএনপি-জামায়াত তথা তৎকালীন বিরোধী দলগুলোর নেতাকর্মীদের ধরে নিয়ে হেফাজতে নির্যাতনে মৃত্যুকে যেমন নানা যুক্তি দিয়ে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করা হতো, অন্তর্বর্তী সরকার এবং তাদের ধারাবাহিকতায় বর্তমান নির্বাচিত সরকারের আমলেও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এবং তার অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের ধরে নির্যাতন, এমনকি নির্যাতনে মেরে ফেলারও বৈধতা দেয়া হচ্ছে। এইসব হত্যার পক্ষে সম্মতি উৎপাদনের চেষ্টাও দেখতে পাচ্ছি আমরা। এই চেষ্টা সবচেয়ে বেশি চলে সোশ্যাল মিডিয়ায়। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সোশ্যাল মিডিয়া, বিশেষ করে ফেইসবুক সবচেয়ে বড় আদালতে পরিণত হয়েছে। এখানে নেটিজেনরাই অপরাধের সংজ্ঞা ঠিক করে দিচ্ছে। বিচারও করে দিচ্ছে। অর্থাৎ প্রচলিত আদালতে বিচারের আগেই তার সামাজিকভাবে বিচার হয়ে যাচ্ছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় হেফাজতে মৃত্যুর অন্যতম বড় ঘটনা কারাগারে লেখক মুশতাক আহমেদের মৃত্যু। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যান লেখক মুশতাক আহমেদ—যিনি প্রথম আলোচনায় আসেন ময়নসিংহের ভালুকায় কুমিরের খামার তৈরির মধ্য দিয়ে। গাজীপুরের কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগারে মৃত্যু হয় মুশতাকের—যেটিকে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় হেফাজতে নির্যাতনে মৃত্যুর একটি বড় কেস স্টাডি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের পরে অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকার এবং তারপরে নির্বাচিত বিএনপি সরকারের আমলেও কেন হেফাজতে মৃত্যুর অভিযোগ উঠবে এবং সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলো কেন একইরকম গল্প বলবে?
অন্যান্য আইনে যেমন ভুক্তভোগী নিজে অথবা তার পরিবারকে মামলা করতে হয়, এই আইনে ওই বিধানও শিথিল। অর্থাৎ রাষ্ট্রের যে কোনো নাগরিক আদালতে এই অভিযোগ দায়ের করতে পারবেন যে অমুককে হেফাজতে নির্যাতন করা হয়েছে। এই আইনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, অভিযুক্ত ব্যক্তিকেই প্রমাণ করতে হবে যে তিনি অপরাধ করেননি। ১৯ ধারায় বলা হয়েছে, “কোনো সরকারি কর্মকর্তা অথবা তাহার পক্ষে কর্তব্যরত কোনো ব্যক্তির গাফিলতি বা অসতর্কতার কারণে অভিযোগকারী ক্ষতিগ্রস্ত হইলে অভিযুক্ত ব্যক্তিকেই প্রমাণ করিতে হইবে যে, তাহার বা তাহার পক্ষে কর্তব্যরত ব্যক্তির গাফিলতি বা অসতর্কতার কারণে ওই ক্ষতি হয় নাই।”
কিন্তু এরকম একটি জনবান্ধব আইন থাকার পরও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন। কারণ, একবার কেউ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্যাতনের শিকার হলে, পরবর্তী হয়রানির ভয়ে ভুক্তভোগী ব্যক্তি বা পরিবার আইনের আশ্রয় নিতে চায় না। রাষ্ট্র তাকে ওই সুরক্ষাও দিতে পারে না। উপরন্তু সরকারি কর্মচারীদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের তদন্ত এবং বিচারিক প্রক্রিয়াটি যেরকম পক্ষপাতদুষ্ট, তাতে কতটি অপরাধ প্রমাণ করা যায়—তা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন আছে।
মোদ্দা কথা, একটি ভালো আইন থাকা মানেই যে তার দ্বারা দেশের সাধারণ মানুষ খুব সুরক্ষিত থাকবে এবং অপরাধী যেই হোক তার বিচার হবে—বিষয়টা এত সহজ নয়। কেননা নাগরিকের সুরক্ষা এবং অপরাধীর শাস্তি তথা অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে ওই আইনটি কতটুকু সহায়ক হবে, সেটি পুরোপুরি নির্ভর করে আইনের প্রয়োগকারীদের উদ্দেশ্য এবং ওই আইনটি বাস্তবায়নে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সিদ্ধান্তের ওপর।
আমীন আল রশীদ সাংবাদিক ও লেখক। ই-মেইল [email protected]