০৬ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩

মিয়ানমারে ভোট ঘিরে ছয় মাসে সেনাবাহিনীর হাতে ৭০০ নাগরিক হত্যা: জাতিসংঘ

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ধ্বংসযজ্ঞ ও দুর্ভোগের একক বৃহত্তম কারণ বিমান হামলা।

মিয়ানমারে ভোট ঘিরে ছয় মাসে সেনাবাহিনীর হাতে ৭০০ নাগরিক হত্যা: জাতিসংঘ
সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতা দখল করা জেনারেল মিন অং হ্লাইং এখন মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট। ছবি: রয়টার্স

নিউজ ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 23 Jun 2026, 11:14 AM

Updated : 11 Sep 2026, 03:28 PM

মিয়ানমারে নির্বাচন ঘিরে ছয় মাসে সাত শতাধিক বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যুর জন্য সামরিক বাহিনীর দায় পেয়েছে জাতিসংঘ।

গত অগাস্ট থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ের তথ্য নিয়ে জাতিসংঘের একটি নতুন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই সময়ে অন্তত ৭০২ জনের নিহত হওয়ার নিশ্চিত খবর পাওয়া গেছে, যাদের মধ্যে ২২৪ জন নারী এবং ১৫৩ জন শিশু।

বিবিসি লিখেছে, পাঁচ বছর আগে অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা নেওয়া সামরিক বাহিনী নির্বাচনের ঘোষণা দেওয়ার পরের ছয় মাসের চিত্র এই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। 

প্রধান বিরোধী দলগুলোকে বাদ রেখে অনুষ্ঠিত ওই ‘প্রহসনের’ নির্বাচন ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছে।

জাতিসংঘের প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক সহায়তা কমায় লাখ লাখ মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। 

বিবিসি লিখেছে, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ২০২১ সালে অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা দখল করলে গৃহযুদ্ধের সূচনা হয়। এ যুদ্ধে হাজার হাজার মানুষ নিহত এবং লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। দেশটির একটি বড় অংশ এখনও সশস্ত্র বিরোধী দলগুলোর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক কার্যালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিয়ানমারে ধ্বংসযজ্ঞ ও দুর্ভোগের একক বৃহত্তম কারণ হল সরকারি বাহিনীর বিমান হামলা।

সামরিক বাহিনী নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য চাপ সৃষ্টি করায় সাগাইং অঞ্চল ‘বেসামরিক নাগরিকদের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক এলাকা’ হয়ে উঠেছে। সেখানে ৬০ জন নারী, ৩০ জন শিশুসহ ১৯১ জনের প্রাণ গেছে।

সাগাইংয়ের চাউং-ইউ-তে গত অক্টোবরে একটি স্কুলের সামনে জড়ো হওয়া বেসামরিক নাগরিকদের ওপর বিমান হামলায় চার শিশুসহ ২৩ জন নিহত হন এবং ৬০ জনের বেশি মানুষ আহত হন।

হামলার সময় উপস্থিত ব্যক্তিরা মোমবাতি প্রজ্বালন করে বৌদ্ধ উপবাসের ইতি উদযাপন করছিলেন। পাশাপাশি তারা রাজবন্দিদের মুক্তি, সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক নিয়োগের বিরোধিতা এবং সামরিক নির্বাচন প্রত্যাখ্যানের আহ্বান জানাচ্ছিলেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ডিসেম্বরে সাগাইং-এর তাবায়িন অঞ্চলে ফুটবল ম্যাচ দেখার জন্য মানুষ যখন একটি চায়ের দোকানে জড়ো হয়েছিল, তখন একটি সামরিক বিমান সেখানে বোমা হামলা চালায়। তাতে অন্তত ১৯ জন নিহত এবং ২০ জন আহত হন।

প্রতিবেদনে রোহিঙ্গা জনগণের ওপর নির্যাতনের কথাও তুলে ধরা হয়েছে, যারা একদিকে হত্যাকাণ্ড, নির্বিচারে গ্রেপ্তার ও যৌন সহিংসতার মুখোমুখি হয়েছে, অন্যদিকে আরাকান আর্মিতে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়েছে।

জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান ভলকার তুর্ক বলেন, “মিয়ানমারের মানুষ সামরিক বাহিনীর হাতে ইতোমধ্যে যথেষ্ট কষ্ট পেয়েছে, আর এখন মনে হচ্ছে দেশের বাইরের মানুষ তাদের কথা ভুলে গেছে।”

তিনি বলেন, “স্থানীয়ভাবে সুরক্ষার চেষ্টায় যে অর্থায়ন আসছিল, তাই ছিল সামরিক বাহিনীর অবিরাম লক্ষ্যবস্তু ও নির্বিচার হামলায় সৃষ্ট দুর্ভোগ থেকে বাঁচার একমাত্র সান্ত্বনা। এই অর্থায়ন তুলে নেওয়ায় সেই ক্ষতকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।”

বিবিসি লিখেছে, সামরিক বাহিনী গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের কাছ থেকে পাঁচ বছর আগে ক্ষমতা ছিনিয়ে নেয় এবং সেই সরকারের নেত্রী অং সান সু চিকে কারাবন্দি করে।

দুই বছরেরও বেশি আগে বিদ্রোহীরা বেশ কিছু এলাকায় জয় পেয়েছিল, কিন্তু এরপর থেকে তারা পিছু হটতে বাধ্য হয়। জোরপূর্বক সামরিক বাহিনীতে নিয়োগ এবং ড্রোনের শক্তি বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের বেশিরভাগ এলাকায় সামরিক বাহিনী এখন আক্রমণাত্মক অবস্থানে রয়েছে।

অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করা জেনারেল মিন অং হ্লাইং গত এপ্রিলে প্রেসিডেন্ট হন।

এ নির্বাচনের ফল আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল দাবি করে বিবিসি লিখেছে, অনেক জনপ্রিয় দলকে নির্বাচনে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল এবং গৃহযুদ্ধের কারণে দেশের একটি বড় অংশে ভোট দেওয়ার সুযোগ ছিল না।

পার্লামেন্ট এখন জেনারেলে অনুগতদের দিয়ে পূর্ণ; সশস্ত্র বাহিনীর জন্য সেখানে এক-চতুর্থাংশ আসন সংরক্ষিত। সামরিক বাহিনীর নিজস্ব দল ইউএসডিপি বাকি আসনগুলোর প্রায় ৮০ শতাংশ জিতেছে— এমন একটি নির্বাচন তাদের পক্ষেই সাজানো ছিল।