Published : 22 Jun 2026, 08:13 AM
গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক তার জগৎবিখ্যাত প্রবন্ধ ‘ক্যান দ্য সাবঅল্টার্ন স্পিক?’ প্রবন্ধটিতে শতাব্দীর অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত প্রশ্ন তুলেছিলেন। সাবঅল্টার্নরা কথা বলতে পারেন কি না, সেটি অনুসন্ধান করতে গিয়ে তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, সমাজে যারা প্রান্তিক ও ক্ষমতাহীন মানুষ—যাদের তিনি সাবঅল্টার্ন বলে অভিহিত করেছেন—তারা প্রকৃত অর্থে কথা বলতে পারেন না। কারণ, তাদের কণ্ঠস্বর সব সময় ক্ষমতাবান ও সমাজের ক্ষমতাসীন কাঠামোর মাধ্যমে অনূদিত, নিয়ন্ত্রিত বা বিকৃত হয়ে উপস্থাপিত হয়। ফলে সাবঅল্টার্নরা কখনোই পুরোপুরি তাদের নিজেদের ভাষায় কথা বলতে পারে না। তিনি উপনিবেশবাদ তত্ত্বের আলোকে এই সাবঅল্টার্ন তত্ত্বের ব্যাখ্যা করেন। ওই প্রবন্ধে উদাহরণস্বরূপ তিনি তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক ভারতীয় সমাজে ‘সতীদাহ প্রথা’ রোধ করে সাবঅল্টার্ন নারীদের বাঁচানোর প্রচেষ্টাকে উল্লেখ করেন। কীভাবে ব্রিটিশ রাজ ‘ত্রাতা’ হয়ে ভারতের অসহায় নারীদের রক্ষা করে তাদের ভাষাকে তাদের মতো করে উপস্থাপন করেছিল, সেটিই তিনি উদাহরণ হিসেবে দেখান।
স্পিভাক ‘সতীদাহ প্রথা’ রহিতকরণের প্রচেষ্টাকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে উল্লেখ করেন যে, একপক্ষ একে ‘শ্বেতাঙ্গ পুরুষ কর্তৃক বাদামি পুরুষের হাত থেকে বাদামি নারীদের রক্ষা’ হিসেবেই দেখিয়েছে। অন্যদিকে, যাদের কাছ থেকে এই ‘সতী’ নারীদের উদ্ধার করা হয়েছে, তারা প্রচার করে যে, ‘নারীরা নিজেরাই আত্মাহুতি দিতে চেয়েছিল’। কিন্তু কোনো পর্যায়েই ভুক্তভোগীর কোনো মতামত পাওয়া যায় না। স্পিভাক নিজেই বলেছেন, উভয় দলের বয়ানে নারীর নিজস্ব মতামত উপেক্ষিত ছিল। অর্থাৎ, সরল ভাষায় সাবঅল্টার্ন হলো তারা, যাদের কথা অন্যরা বলে থাকে এবং সেখানে তাদের সরাসরি কোনো মতামত থাকে না। এই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশে বর্তমানে চলমান সাবঅল্টার্ন বিতর্ককে ব্যাখ্যা করা যাক।
সম্প্রতি বাংলাদেশে শহরকেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবীদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হলো স্পিভাকের এই ঔপনিবেশিক তত্ত্ব। এই তত্ত্ব পুনঃপাঠের প্রেক্ষাপট হলো, ২০২৪ সালের ৫ অগাস্টের পর ছাত্ররাজনীতির মাধ্যমে হঠাৎ করে প্রান্তিক কিছু সাধারণ ছাত্রের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং দেশ-বিদেশে তাদের ‘কথা বলার অধিকার’ প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে। এই সাবঅল্টার্নদের ক্ষমতায়নের প্রেক্ষাপটে স্পিভাককে একটি নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে ভাবার চেষ্টায় এই লেখা। অর্থাৎ, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সময়ে এই ‘সাবঅল্টার্ন’ বা ‘প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর’ রাজনৈতিক বাস্তবতা স্পিভাকের তত্ত্বের আলোকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য বোধ করছি। তাই, ‘সাবঅল্টার্ন কথা বলতে পারেন কি না?’—শুধুমাত্র এই প্রশ্ন নয়, বরং লেখাটি আরও দুটি প্রশ্নকে ঘিরে আবর্তিত। এক. এই কথিত সাবঅল্টার্ন আদৌ কি সাবঅল্টার্ন? দুই. এই সাবঅল্টার্নদের ক্ষমতায়নের পর তারা মবের রাজনীতি চর্চা করতে পারে কি না? অর্থাৎ, পোস্ট-সাবঅল্টার্ন অবস্থাকে ব্যাখ্যা করা।
প্রথমত, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনীতিতে প্রান্তিক অঞ্চল থেকে উঠে আসা কিছু শিক্ষার্থী নিজেদেরকে বিগত ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তির কাছে নিপীড়িত, বঞ্চিত বা প্রান্তিক মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থাপন করেছে। ২০২৪ সালে জাতীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন হওয়ার পর, সেই প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের মধ্যে কিছু ছাত্র-ছাত্রী জাতীয় পর্যায়ে রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হন। এই প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষকরা তাদেরকে সাবঅল্টার্ন বলে কল্পনা করছেন। কিন্তু দেখা যায়, এই প্রতিনিধিরা রাজনৈতিক আনুকূল্য পাওয়ার ফলে তাদের মধ্যে একধরনের মৌলিক পরিবর্তন ঘটে। কখনো তাদের নিজেদের দ্বারা, আবার কখনোবা তাদের নেতৃত্বে সারা দেশে ভয়ঙ্কর এক ‘মব রাজ্যের’ প্রতিষ্ঠা পায়। ফলে, সাবঅল্টার্নদের এই পরিচয় শুধুমাত্র নিপীড়কের অভিজ্ঞতার ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকেনি; তারা নিজেরাই নতুন ক্ষমতা-কাঠামোর মধ্যে প্রবেশ করে সেটির মৌলিক পরিবর্তন ঘটায়। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে নতুন ‘গণতান্ত্রিক’ সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তিত হলে তারা কাগজে-কলমে সেই ক্ষমতার রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় প্রবেশ করে।
স্পিভাকের তত্ত্বের আলোকে এই পরিস্থিতির পুনঃপাঠ করলে তাদের এই ক্ষমতায়ন নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয়। তা হলো, সাবঅল্টার্নদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন হলে তারা কি আদৌ সাবঅল্টার্ন হিসেবে বৈধতা পায়? কারণ স্পিভাক নিজেও স্পষ্ট করে বলেছেন, সাবঅল্টার্ন কোনো নির্দিষ্ট অবস্থান নয়; এটি একটি পরিবর্তনশীল ধারণা। এই প্রেক্ষাপটে স্পিভাক তার ওই প্রবন্ধে বিস্তারিত ব্যাখ্যা না দেওয়াতে এই পরিবর্তিত অবস্থাকে স্পিভাকের তত্ত্বের একধরনের সীমাবদ্ধতা হিসেবে ধরা যেতে পারে। কারণ, তার তত্ত্ব মূলত সাবঅল্টার্নদের নীরবতাকে বিশ্লেষণ করে। সাবঅল্টার্নরা যখন কথা বলে বা সাবঅল্টার্নরা যখন প্রকৃত অর্থে ক্ষমতায়িত হয়, তখন তারা কী আচরণ করে এবং কেন করে, সেই ব্যাখ্যা সেখানে অনুপস্থিত।
বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় এই অসমাপ্ত প্রশ্নের ব্যবহারিক উত্তর আছে। বাংলাদেশে দেখা যাচ্ছে, এই সাবঅল্টার্নদের ক্ষমতায়নের পর তারাই আবার অত্যুৎসাহী প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মাধ্যমে এবং তাদের ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে ভিন্নমত দমন, সামাজিকভাবে বিভিন্ন দলের ওপর চাপ সৃষ্টি, কিংবা প্রতীকী ও শারীরিক শাস্তি প্রদান করে চলেছেন। তাই স্বভাবতই প্রশ্ন উঠেছে, ‘সাবঅল্টার্নদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন কি স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাদের সেই নৈতিক অবস্থান থেকে বিচ্যুত করে?’ নাকি এটি সেই একই দুষ্টচক্রে আবর্তিত হয়। অর্থাৎ, সাবঅল্টার্নরা ক্ষমতায়িত হলে তারা আবার সেই ঔপনিবেশিক শক্তির মতো প্রভুর আচরণ করতে শুরু করে কি না?
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ‘সাবঅল্টার্ন’ ও ‘মব’—দুটি ধারণাকে আলাদাভাবে পাঠ করা বাঞ্ছনীয়। সাবঅল্টার্ন যেহেতু একটি কাঠামোগত ধারণা, তাই এই কাঠামোতে যাদের অবস্থান, তারা মূলত ক্ষমতার কেন্দ্রের বাইরে থাকা মানুষ। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথন ধার করে বললে বলতে হয়, ক্ষমতার ঈশ্বরের অধিষ্ঠান মূলত ভদ্রপল্লিতে, সাবঅল্টার্নদের পল্লিতে তাদের খুঁজে পাওয়া যায় না। আবার অন্যদিকে ‘মব’ হলো রাজনৈতিক অপশাসনের ফলাফল বা হাতিয়ার, যা রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তি বা ক্ষমতার নেতিবাচক বহিঃপ্রকাশ। ফলে, এই ‘মব’ ক্ষমতাহীনদের প্রতিনিধিত্ব করে না; তাই মব সাবঅল্টার্নদের স্বাভাবিক প্রকাশও নয়। একইভাবে যারা এই মবের পরিচালক, তারাও সাবঅল্টার্ন নয়। তারা মূলত ব্রিটিশ রাজের সেই ক্ষমতাধর পুলিশ অফিসারের মতো, যারা সাবঅল্টার্নদের কথা বলতে গিয়ে তাদের নিজেদের মতামতকে রোধ করে দেয় এবং তাদের নিজেদের ভাষাকে প্রান্তিক মানুষের বক্তব্য হিসেবে প্রচার করে।
বাংলাদেশে মবের অন্যরকম একটি যুক্তিও আছে। অনেকে মবকে প্রান্তিক মানুষের পক্ষ থেকে ক্ষমতাশালীদের প্রতি একটি প্রতিবাদের ভাষা বলে অভিহিত করেছেন। এই যুক্তিও নৈতিকভাবে টেকে না; কারণ মবের ঘটনাগুলো দেখলে দেখা যায়, মবের অন্যতম শিকার সেই প্রান্তিক মানুষই। এই পরিস্থিতি আমাদেরকে সাবঅল্টার্ন তত্ত্বকে ভিন্নভাবে পুনর্বিবেচনা করার সুযোগ করে দেয়। তা হলো, সাবঅল্টার্ন সব সময় নৈতিকভাবে সর্বোত্তম কাঠামো নয়। কারণ, ক্ষমতায়নের ফলে তারাও অন্যদের নীরব করে দিতে পারে এবং তারাও অন্য একটি প্রান্তিক গোষ্ঠীর মুখের ভাষা কেড়ে নিতে পারে। এই মবের অন্যতম শিকার বাংলাদেশের প্রান্তিক সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। এই উদাহরণ থেকে বলা যায়, ‘একবার যে সাবঅল্টার্ন, সে সব সময় সাবঅল্টার্ন নয়’। ফলে, একদা যে জনগোষ্ঠীকে সাবঅল্টার্ন হিসেবে বিবেচনা করা হতো, রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের ফলে তাদের সেই নৈতিক বৈধতা আর থাকে না।
বাংলাদেশের এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় ‘সাবঅল্টার্ন কি কথা বলতে পারে?’—প্রশ্নের সঙ্গে এই প্রশ্নও করা প্রাসঙ্গিক যে, ‘রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের ফলে সাবঅল্টার্ন কি মব হয়ে ওঠে?’ তাই বলা যায়, বাংলাদেশের উদাহরণ আমাদের শেখায় যে, ‘সাবঅল্টার্ন’ কোনো স্থায়ী ধারণা নয়। এটি ক্ষমতার সম্পর্কের একটি তুলনামূলক অবস্থান মাত্র। অর্থাৎ, আজকে যারা ‘সাবঅল্টার্ন’, রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের মাধ্যমে আগামীতে তারা আধিপত্যশালী শক্তি হয়ে অন্য ‘সাবঅল্টার্নদের’ কথা রোধ করতে পারে। তাই সর্বোপরি বলা যায়, বাংলাদেশে ‘সাবঅল্টার্নদের’ এই নতুন বাস্তবতা স্পিভাককে সরাসরি বাতিল করে না দিলেও, এই পরিস্থিতি তার তত্ত্বকে আরও বিস্তৃত করে এবং আমাদের সামনে নতুন বাস্তবতা তুলে ধরে। সেই বাস্তবতা হলো, কে সাবঅল্টার্ন আর কে সাবঅল্টার্ন নয়, তার মৌলিক মানদণ্ড হলো ক্ষমতা। একবার সাবঅল্টার্ন ক্ষমতায়িত হলে তারা ‘নিপীড়ক’; তখন তারা আর ‘সাবঅল্টার্ন’ নয়।
এম. টি. ইসলাম জার্মানির একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। ই-মেইল: [email protected]