Published : 22 Jun 2026, 02:18 PM
গত সপ্তাহে মার্কিন-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধের যে প্রাথমিক চুক্তি হয়েছে, তাতে সবচেয়ে বড় ধরা খেয়েছেন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ, দখলদারিত্ব ও গাজায় গণহত্যার সঙ্গে যুক্ততার কারণে ইতিহাসে তিনি ঘৃণিত থাকবেন। গাজা, পশ্চিম তীর, লেবানন, সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেন কিংবা ইরান—প্রায় সব সংকটেই নেতানিয়াহুর প্রধান অস্ত্র ছিল সামরিক শক্তি ও সহিংসতা। কিন্তু এই নীতি সমস্যা সমাধান করেনি, অনেক ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে।
ইরানের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক যুদ্ধ ছিল নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক দর্শনের সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ। তিনি বিশ্বাস করেছিলেন যে সামরিক শক্তির মাধ্যমে ইরানকে পরাজিত করা সম্ভব। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই উদ্যোগ প্রত্যাশিত ফল দেয়নি। ডনাল্ড ট্রাম্প জোর দাবি করছেন, তার মধ্যস্থতায় হওয়া সমঝোতা বাইরে থেকে যতটা দুর্বল মনে হচ্ছে, বাস্তবে ততটা নয়। বিশ্বজুড়ে এ দাবি নিয়ে মানুষ সন্দেহ ও উপহাস করলেও ট্রাম্প রাজনৈতিকভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে সক্ষম হবেন। কিন্তু নেতানিয়াহুর জন্য এর পরিণতি অনেক গুরুতর। তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন প্রশ্নের মুখে।
নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক পতনের গল্প যেন এক দীর্ঘ অভিযোগনামা। কয়েক দশক ধরে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে দ্বি-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের বিরোধিতা করছেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা ঠেকাতে ব্যর্থ হন। এরপর গাজায় গণহত্যা সংঘটিত করে সেটির প্রতিশোধ নেন। ক্ষমতা ধরে রাখতে কট্টর ডানপন্থী রাজনীতিবিদদের সরকারে পদ দেন, আর তা দেশে-বিদেশে হতাশা ও বিতর্কের জন্ম দেয়। ২০১৫ সালের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইরান পারমাণবিক চুক্তিকেও তিনি অবজ্ঞা করেন। এরই ধারাবাহিকতায় ট্রাম্পের চুক্তি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ এ বছরের সবচেয়ে বিপর্যয়কর সংঘাতের পথ তৈরি করে।
তবে এগুলোর কোনোটিই শরতের আসন্ন নির্বাচনে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে ছিটকে পড়ার মূল কারণ নয়। আসল সমস্যা হলো তিনি মার্কিন ও ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের ‘বিশেষ সম্পর্ক‘কে ভঙ্গুর করেছেন। বর্তমানে তার সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্ক এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে তাদের মধ্যে কার্যত যোগাযোগই প্রায় বন্ধ।
হোয়াইট হাউসের অনেক কর্মকর্তা এবং যুক্তরাষ্ট্রের একটি বড় অংশের মানুষ মনে করেন, গাজায় ইসরায়েলের অভিযান এবং ইরানে দ্রুত বিজয় ও শাসন পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দেখিয়ে নেতানিয়াহুই যুক্তরাষ্ট্রকে এক জটিল জালে জড়িয়ে ফেলেছেন। আর এখন যখন শান্তির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, অনেক আমেরিকানই আশঙ্কা করছেন, লেবাননে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে নেতানিয়াহু সেই শান্তি ভণ্ডুল করে দেবেন।
১৯৪৮ সালে ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্পর্ক সবসময় একরকম ছিল না। সুয়েজ সংকট, আরব ইসরায়েল যুদ্ধ, শান্তি উদ্যোগ, সীমান্ত বিরোধ ও বসতি স্থাপন নিয়ে দুই দেশের মধ্যে মতবিরোধ হয়েছে। কিন্তু স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়। নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্বার্থের ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের প্রধান মিত্রে পরিণত হয়। মার্কিন সামরিক সহায়তা বাড়ে এবং ওয়াশিংটনে ইসরায়েলপন্থী লবির প্রভাবও শক্তিশালী হয়।
কিন্তু ২০১৫ সালে সেই ঐকমত্যে ফাটল দেখা দেয়। নেতানিয়াহু ও তার সমর্থক সংগঠনগুলো তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ইরান পারমাণবিক চুক্তি ব্যর্থ করার চেষ্টা চালায়। এতে চুক্তি বাতিল না হলেও যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের মধ্যে ইসরায়েল প্রশ্নে বিভক্তি স্পষ্ট হয়।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে সেই বিভাজন আরও গভীর হয়। তিনি ফিলিস্তিনি নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ কমিয়ে দেন, মার্কিন দূতাবাস জেরুজালেমে সরিয়ে নেন এবং গোলান মালভূমির ওপর ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণকে স্বীকৃতি দেন। এর ফলে বহু ডেমোক্র্যাট ভোটার ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন তুলে নেয়।
ইসরায়েলের উগ্র জাতীয়তাবাদ, ভূখণ্ড সম্প্রসারণ, সেটেলারদের ভূমি দখল সমর্থন এবং গাজা, লেবানন ও ইরানে যুদ্ধের কারণে পুরোনো মার্কিন ইসরায়েল ঐকমত্য আরও দুর্বল হয়েছে। সাম্প্রতিক জরিপে দেখা যাচ্ছে, প্রথমবারের মতো অনেক আমেরিকান ইসরায়েলিদের তুলনায় ফিলিস্তিনিদের প্রতি বেশি সহানুভূতি দেখাচ্ছেন। কেউ কেউ ইসরায়েলের প্রতি সামরিক সহায়তা কমানো বা বন্ধ করার পক্ষেও মত দিচ্ছেন। একসময় যে সমর্থন মার্কিন সমাজে বাম ও ডান দুই পক্ষের মধ্যে ছিল, এখন দুই বলয় থেকেই সমালোচনা হচ্ছে। বার্তা পরিষ্কার, ইসরায়েলকে নিরঙ্কুশ সমর্থন দেওয়া বন্ধ করতে হবে।
ট্রাম্প যদি সত্যিই নেতানিয়াহুকে নিয়ে কঠোর ভাষায় মন্তব্য করে থাকেন, তবে তা দুই পক্ষের গভীর অবিশ্বাসের আভাস। এর দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক প্রভাব পড়তে পারে। অনেকের মতে, নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রকে এক বড় আঞ্চলিক সংঘাতের দিকে ঠেলে দিয়েছেন। একই সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত দূরত্বও তৈরি করেছেন।
ট্রাম্পের ইরান বিষয়ক সমঝোতা অনেক ইসরায়েলিকেই বিস্মিত করেছে। নেতানিয়াহু প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তিনি ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস করবেন, তেহরানের আঞ্চলিক প্রক্সিদের দুর্বল করবেন এবং শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটাবেন। কিন্তু এসব লক্ষ্য পূরণ হয়নি। বরং অনেকের মতে, ইরানের শাসনব্যবস্থা এখন আগের চেয়ে আরও সুদৃঢ়। হরমুজ প্রণালিতে ট্রানজিট ফি আরোপের উদ্যোগ তারই এক উদাহরণ।
জি-৭ সম্মেলনের পর ট্রাম্প প্রকাশ্যে নেতানিয়াহুর দাবিকৃত কঠোর শর্তগুলোর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ইরানকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার সুযোগ দিতে হবে, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির অধিকার থাকবে এবং জব্দ করা সম্পদ ফেরত দেওয়া হবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র লেবাননে দ্রুত স্থায়ী যুদ্ধবিরতির দাবিকেও সমর্থন জানায়। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও নেতানিয়াহুকে যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানান এবং স্মরণ করিয়ে দেন যে যুক্তরাষ্ট্রই ইসরায়েলের সবচেয়ে শক্তিশালী মিত্র।
এখন নেতানিয়াহু কঠিন দ্বিধার মধ্যে আছেন। তিনি যদি ট্রাম্পের অবস্থান অগ্রাহ্য করেন, তাহলে ইরানের সঙ্গে নতুন সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হবে। আবার যদি ট্রাম্পের চাপে লেবানন থেকে সেনা সরিয়ে নেন, তাহলে নিজ দেশের ভোটার এবং কট্টর ডানপন্থী মিত্রদের সমর্থন হারাতে পারেন। যে পথই তিনি বেছে নেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্পর্ক দ্রুত আগের অবস্থায় ফিরবে বলে মনে হয় না।
তাই এ দূরত্বের সম্ভাব্য ফলাফল অনেক গভীর। এটি হয়তো বৃহত্তর ইসরায়েল গড়ার নেতানিয়াহুর স্বপ্নের পতন, প্রশ্নাতীত মার্কিন সমর্থনের অবসান এবং নিঃশর্ত সামরিক সহায়তার যুগ শেষ হওয়ার পূর্বাভাস। পাশাপাশি সৌদি আরব ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বিস্তারের প্রচেষ্টাও দুর্বল হবে। ট্রাম্পের গাজা-সংক্রান্ত ‘শান্তি পরিকল্পনা’ও মুখ ধুবড়ে পড়তে পারে। অন্যদিকে, ইরানের দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতা কমবে, দেশটি দীর্ঘদিন পর মূলধারায় ফিরবে। সবচেয়ে তাৎপর্যবাহী বিষয় হলো, ইসরায়েল বেশি নয়, আগের চেয়ে আরও কম সুরক্ষিত হয়ে পড়বে।
নেতানিয়াহু দীর্ঘদিনের প্রতিপক্ষ ইরানের বিরুদ্ধে একটি বড় ও গৌরবময় বিজয়ের বাজি ধরেছিলেন। আর সেই লক্ষ্য অর্জনে তিনি ব্যর্থ। এখন তাকে সেই ব্যর্থতার রাজনৈতিক মূল্য চুকাতে হবে। তার পতন আসন্ন, রাতারাতি তিনি নিঃস্ব হবেন। সবকিছুই তার কেড়ে নেওয়া হবে।
তাই আর কোনো ঝামেলা বা অজুহাত তৈরি করবেন না, বিবি (নেতানিয়াহুর ডাক নাম)! আপনাকে চাপ দেওয়া বা বরখাস্ত করার অপেক্ষায় থাকবেন না। পদত্যাগ করুন।
লেখাটি ‘দ্য গার্ডিয়ান’ থেকে অনূদিত; এর লেখক ব্রিটিশ সাংবাদিক সাইমন টিসডাল ওই পত্রিকাটির সহযোগী সম্পাদক ও প্রধান ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমেন্টেটর। কর্মজীবনের বিভিন্ন সময়ে তিনি গার্ডিয়ানের ফরেন এডিটর ও ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক ইউএস এডিটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি মূলত ভূ-রাজনীতি, বিশ্ব নিরাপত্তা, মধ্যপ্রাচ্য সংকট এবং মানবাধিকার বিষয়ে তার ধারালো ও আপসহীন কলামের জন্য বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।