Published : 21 Jul 2026, 03:32 PM
আধুনিক যুগে ব্লুটুথ প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসার ঘটলেও প্রাথমিক সংযোগ স্থাপন ও নির্ভরযোগ্য বিকল্প হিসেবে চার দশকের পুরানো ইনফ্রারেড প্রযুক্তি এখনও প্রায় প্রতিটি টেলিভিশন রিমোটে গুরুত্বপূর্ণ হয়েই রয়েছে।
টেলিভিশন রিমোট কন্ট্রোলের ইতিহাস বেশ চমকপ্রদ। ১৯৫০ সালে ‘জেনিথ রেডিও কর্পোরেশন’ বিশ্বের প্রথম রিমোট কন্ট্রোল ‘লেজি বোনস’ বাজারে আনে, যা ওই সময় তারহীন ছিল না; বরং লম্বা এক তারের সাহায্যে টেলিভিশনের সঙ্গে যোগ থাকত বলে প্রতিবেদনে লিখেছে প্রযুক্তি সংবাদের সাইট এনগ্যাজেট।
এরপর ১৯৫৫ সালে আসে প্রথম সম্পূর্ণ তারহীন রিমোট ‘ফ্ল্যাশ-ম্যাটিক’, যা টিভির সামনের প্যানেলে থাকা চারটি ফটো সেলে দৃশ্যমান আলোকরশ্মি ফেলে কমান্ড পাঠাত। তবে ১৯৮০-এর দশকের মধ্যে ইনফ্রারেড রিমোট বিশ্বজুড়ে মূল প্রযুক্তি হিসেবে জায়গা করে নিয়ে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে নিজের আধিপত্য ধরে রেখেছে।
ইনফ্রারেড রিমোট এলইডি লাইটের মাধ্যমে অদৃশ্য আলোর দ্রুত পালস বা তরঙ্গ পাঠিয়ে কাজ করে। টেলিভিশনে থাকা ইনফ্রারেড রিসিভার এ সংকেতটি ডিকোড করে বোতামের নির্দেশ টিভির সার্কিটে পাঠিয়ে দেয়।
যে কোনো সাধারণ স্মার্টফোনের ক্যামেরা টিভির রিমোটের সামনে ধরে বোতাম চাপলে খালি চোখে অদৃশ্য এ ইনফ্রারেড এলইডির আলো জ্বলতে-নিভতে দেখা যায়। বর্তমানে অনেক আধুনিক টেলিভিশনের সঙ্গে ব্লুটুথ প্রযুক্তিওয়ালা রিমোট দেওয়া হয়, যা ভয়েস কন্ট্রোলের মতো আধুনিক সুবিধা দেয়। তবে এসব আধুনিক রিমোটতেও একটি করে আইআর ট্রান্সমিটার বা ইনফ্রারেড প্রেরক যন্ত্র সংযোগ থাকে।
দীর্ঘ বছর ধরে ব্যাপক উৎপাদনের কারণে ইনফ্রারেড প্রযুক্তি তৈরিতে এখন নামমাত্র খরচ হয়, যা রিমোটের উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে থাকার অন্যতম প্রধান কারণ।
এ ছাড়া বছরের পর বছর ধরে বাজারে আসা টেলিভিশন, সাউন্ডবার ও অন্যান্য বিনোদনমূলক ডিভাইস এ প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করেই তৈরি হয়েছে। ফলে ইনফ্রারেড প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় শক্তি এর সার্বজনীন সামঞ্জস্যতা বা কম্প্যাটিবিলিটি।
টেলিভিশন প্রযুক্তির সমার্থক হয়ে ওঠা এই ইনফ্রারেডকে পুরোপুরি বাদ দেওয়া যৌক্তিক হবে না, বিশেষ করে আধুনিক রিমোটে ব্লুটুথ ও ইনফ্রারেড দুটি প্রযুক্তিই যখন খুব সহজে সহাবস্থান করছে।
টেলিভিশন রিমোটে ইনফ্রারেডের আসল উপযোগিতা
রিমোটে ব্লুটুথ প্রযুক্তি থাকলেও ইনফ্রারেডের ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ। একটি ব্লুটুথ রিমোট কেবল টেলিভিশনের সঙ্গে ‘পেয়ার্ড’ বা সংযোগ থাকা অবস্থাতেই কাজ করে।
স্মার্ট টিভি প্রথমবার চালুর সময় রিমোটটি পেয়ার করার সেই প্রক্রিয়ার কথা হয়ত অনেকেরই মনে আছে। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, রিমোটটি ব্লুটুথে সংযোগ হওয়ার আগে কীভাবে টেলিভিশনটিকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছিল?
এর উত্তর হচ্ছে, ইনফ্রারেড প্রযুক্তির মাধ্যমে। টেলিভিশন যখন ‘স্ট্যান্ডবাই’ মোডে থাকে তখন ব্লুটুথ সংযোগ সবসময় সচল নাও থাকতে পারে। ফলে টেলিভিশনটি চালুর প্রাথমিক কাজটি রিমোট ইনফ্রারেড সংকেতের সাহায্যেই করতে হয়।
বাস্তব ক্ষেত্রে একটি স্মার্ট টিভির ওপর পরীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে, ব্লুটুথ প্রযুক্তিওয়ালা রিমোট হওয়ার পরও কেবল দুটি কাজের জন্য ইনফ্রারেড সংকেত ব্যবহার করতেই হয়, টেলিভিশন অন ও অফ করা।
ইন্টারফেইসে স্ক্রল করা বা ভলিউম পরিবর্তনের মতো বাকি সব নির্দেশ ব্লুটুথের মাধ্যমেই পাঠানো হচ্ছিল। টিভির সেটিংস থেকে রিমোটটির ব্লুটুথ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার পর দেখা যায়, রিমোটটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিজের ব্যাকআপ মোড হিসেবে ইনফ্রারেড সংকেত ব্যবহার করে টেলিভিশন নিয়ন্ত্রণ করছে।
ব্লুটুথ প্রযুক্তির একটি বড় সুবিধা হচ্ছে, এর জন্য রিমোট ও টেলিভিশনের মধ্যে সরাসরি কোনো দৃশ্যমান সংযোগ বা ‘লাইন অফ সাইট’ থাকার প্রয়োজন হয় না। ফলে শীতের রাতে কম্বলের নিচে আরামে শুয়ে থেকেও হাত বাইরে না এনেই ভলিউম পরিবর্তন করা সম্ভব।
অন্যদিকে, ইনফ্রারেড প্রযুক্তি বেশ ব্যাটারি সাশ্রয়ী হলেও বর্তমান সময়ে এ সুবিধার গুরুত্ব কিছুটা কমেছে। কারণ আধুনিক রিমোটগুলো বেশিরভাগ সময়ই ব্লুটুথ মোডে কাজ করে।
প্রাথমিক সংযোগ স্থাপন ও নির্ভরযোগ্য বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবেই ইনফ্রারেড এখনও টিকে রয়েছে। তবে দৈনন্দিন ব্যবহারে ব্লুটুথই মূল ভূমিকা রাখছে। ব্লুটুথ প্রযুক্তির কল্যাণেই এখন যে কোনো অ্যান্ড্রয়েড ফোনকেও রিমোট কন্ট্রোল হিসেবে ব্যবহার করা যাচ্ছে।