Published : 13 Jun 2026, 09:59 PM
গেল সপ্তাহে বর্ষার গভীর রাতে সুনামগঞ্জের হাওরপাড়ের জয়পুর গ্রামের কৃষক রমিজ আলী দিনের পরিশ্রম শেষে গভীর ঘুমে মগ্ন ছিলেন। পুরনো টিনের কাঁচা ঘরের এক কোণে লুকিয়ে থাকা একটি বিষধর সাপ তাকে দংশন করল। আতঙ্কে পরিবারের সদস্যরা চিৎকার ও ছোটাছুটি শুরু করলেন। একে একে গ্রামের অনেকেই জড়ো হলো। সবাই বলল দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যেতে। কিন্তু সবচেয়ে কাছের হাসপাতালে পৌঁছাতে নৌকায় যেতে হবে পাশের নেত্রকোনা জেলার কলমাকান্দা উপজেলা শহরে—প্রায় তিন ঘণ্টার হাওরের জলপথ। হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন রমিজ আলী। বিষাক্ত সাপের দংশনে নিভে গেল তরতাজা একটি জীবন। অবশ্য হাসপাতালে পৌঁছাতে পারলেও অ্যান্টিভেনমের অভাবে তিনি মারা যেতেন।
রমিজ আলীদের এমন মৃত্যু শুধু সাপের বিষে নয়; চিকিৎসা না পাওয়ার, রাষ্ট্রীয় অবহেলা এবং স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে বৈষম্যেরও।
বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে, বিশেষ করে দুর্গম হাওরাঞ্চলে এমন ঘটনা বিচ্ছিন্ন কিছু নয়, নিত্যদিনের বাস্তবতা। বর্ষা এলেই এখানে সাপের উপদ্রব বাড়ে, বাড়ে দংশনের ঘটনাও। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, যে জনপদে সাপের কামড়ের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি, সেখানে জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা নেই। সাপের দংশন আজ শুধু একটি দৈব-দুর্বিপাক নয়; গ্রাম-শহর বৈষম্য, স্বাস্থ্যসেবার অপ্রতুলতা এবং নীতিগত অগ্রাধিকারহীনতার নির্মম প্রতিচ্ছবি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ৫৪ লাখ মানুষ সাপের কামড়ে আহত হয়। এর মধ্যে ১৮ থেকে ২৭ লাখ মানুষ বিষধর সাপের আক্রমণের শিকার হয়ে থাকে। প্রতি বছর ৪১ হাজার থেকে প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটে সাপের দংশনে। এই বৈশ্বিক সংকটের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্ধৃত স্থানীয় গবেষণা অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর প্রায় ৬ হাজারের বেশি মানুষ সাপের কামড়ে মারা যায়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালিত ‘ন্যাশনাল সার্ভে অন অ্যানুয়াল ইনসিডেন্স অ্যান্ড এপিডেমিওলজি অব স্নেকবাইট ইন বাংলাদেশ’ গবেষণা আরও উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে। গবেষণাটি বলছে, দেশে প্রতিবছর প্রায় সাড়ে সাত হাজার মানুষ সাপের কামড়ে প্রাণ হারায় এবং প্রায় ৮ লাখ ৯০ হাজার মানুষ সাপের দংশনের শিকার হয়।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সাপের দংশনের প্রায় ৯৫ শতাংশ ঘটনাই ঘটে গ্রামাঞ্চলে। অর্থাৎ সমস্যার কেন্দ্রবিন্দু গ্রামে, কিন্তু চিকিৎসা অবকাঠামো ও প্রতিষেধকের অবস্থান জেলা সদর কিংবা বড় শহরকেন্দ্রিক হাসপাতালে।
রমিজ আলীর মৃত্যুর পর এই লেখাটি লিখতে বসে কৌতূহলবশত কলমাকান্দা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরত একজন মেডিকেল অফিসারকে ফোন করে জানতে চেয়েছিলাম, তাদের কাছে অ্যান্টিভেনম কী পরিমাণ আছে? দুঃখজনক হলেও সত্য, শুনতে হলো—এখন স্টকে নেই, তবে আগামী সপ্তাহ থেকে অ্যাভেইলেবল থাকবে।
সেই থেকে ভাবছি, যেখানে রোগ, সেখানে চিকিৎসা আছে কি? উত্তরটি দুর্ভাগ্যজনকভাবে ‘না’। সাপের দংশনের সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা হলো অ্যান্টিভেনম। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে আজ অধিকাংশ বিষধর সাপের দংশনের চিকিৎসা সম্ভব। দ্রুত অ্যান্টিভেনম প্রয়োগ করা গেলে অসংখ্য রোগীর জীবন বাঁচানো যায়। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় দেখা যায়, বহু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অ্যান্টিভেনমের পর্যাপ্ত মজুত নেই। ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র কিংবা কমিউনিটি ক্লিনিক পর্যায়ে তো এ ওষুধ কখনোই সরবরাহ করা হয় না।
এ জন্যই সাপের কামড়ে আক্রান্ত রোগীকে চিকিৎসার জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। হাওরাঞ্চলে নৌকা, চরাঞ্চলে কাঁচা রাস্তা, পাহাড়ি অঞ্চলে দুর্গম পথ—সবকিছু অতিক্রম করে হাসপাতালে পৌঁছাতে পৌঁছাতে অনেক সময় মূল্যবান কয়েকটি ঘণ্টা হারিয়ে যায়। অথচ বিষধর সাপের ক্ষেত্রে এই কয়েকটি ঘণ্টাই জীবন ও মৃত্যুর মধ্যে পার্থক্য গড়ে দেয়।
বাংলাদেশে সাপের দংশনে মৃত্যুর বড় কারণ বিষের তীব্রতা নয়, চিকিৎসা পাওয়ার বিলম্ব। অনেক ক্ষেত্রে রোগীকে সময়মতো অ্যান্টিভেনম দেওয়া গেলে সে বেঁচে যেতে পারত; কিন্তু স্বাস্থ্যব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা তাকে সেই সুযোগ দেয় না। এর সঙ্গে যুক্ত হয় কুসংস্কার ও অপচিকিৎসা। এখনও দেশের বহু এলাকায় সাপের কামড়ের পর মানুষ প্রথমে ওঝা, কবিরাজ কিংবা ঝাড়ফুঁকের শরণাপন্ন হয়। কেউ ক্ষতস্থান কেটে রক্ত বের করে, কেউ বিষ চুষে বের করার চেষ্টা করে, কেউ আবার বিভিন্ন ধরনের তাবিজ-কবচের ওপর নির্ভর করে। এগুলো রোগীর অবস্থা আরও খারাপ করে এবং সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ সময় নষ্ট করে।
অনেক ক্ষেত্রে আধুনিক চিকিৎসা নাগালের মধ্যে থাকে না বলেই মানুষ এই সব অপচিকিৎসা বেছে নেয়। ফলে কুসংস্কারকে দায়ী করার পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবার অপ্রতুলতাকেও দায়ী করতে হবে।
সাপের দংশনে আক্রান্তদের বড় অংশ কৃষক, জেলে, দিনমজুর, পশুপালক এবং গ্রামীণ শ্রমজীবী মানুষ। এরা দেশের খাদ্য উৎপাদন ও গ্রামীণ অর্থনীতির মূল ভিত্তি। একজন উপার্জনক্ষম ব্যক্তি মারা গেলে শুধু একটি প্রাণ হারায় না, একটি পরিবার অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যায়। অনেক শিশু বিদ্যালয় ছাড়তে বাধ্য হয়, অনেক পরিবার ঋণের বোঝা বহন করে। ফলে সাপের দংশন জনস্বাস্থ্যের পাশাপাশি দারিদ্র্য ও উন্নয়ন-প্রশ্নের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০১৭ সালে সাপের দংশনকে ‘নেগলেক্টেড ট্রপিক্যাল ডিজিজ’ বা অবহেলিত গ্রীষ্মমণ্ডলীয় রোগ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এই স্বীকৃতির অর্থ হলো, সমস্যাটি বড় হলেও দীর্ঘদিন ধরে তা প্রয়োজনীয় গুরুত্ব পায়নি। বাংলাদেশেও একই চিত্র দেখা যায়। প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ মারা গেলেও সাপের দংশন এখনও জাতীয় স্বাস্থ্য আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসতে পারেনি।
অথচ এই সংকট মোকাবিলার পথ খুব জটিল নয়। সর্পদংশনের চিকিৎসাকে অবশ্যই বিকেন্দ্রেীকরণ করতে হবে। যে রোগ গ্রামে হয়, তার প্রতিষেধকও গ্রামে থাকতে হবে। প্রতিটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র, কমিউনিটি ক্লিনিক এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনম মজুত নিশ্চিত করতে হবে।
চিকিৎসক, নার্স এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দিতে হবে। শুধু ওষুধ মজুত করলেই হবে না; এর সঠিক ব্যবহার, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া মোকাবিলা এবং জরুরি রোগী ব্যবস্থাপনার দক্ষতাও নিশ্চিত করতে হবে।
হাওর, চর, পাহাড়ি ও সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। এসব অঞ্চলে জরুরি পরিবহন ব্যবস্থা, দ্রুত রেফারেল নেটওয়ার্ক এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।
জাতীয় পর্যায়ে একটি সমন্বিত ‘সাপের দংশনে মৃত্যু প্রতিরোধ ও ব্যবস্থাপনা কর্মপরিকল্পনা’ গ্রহণ করতে হবে। কোথায় কত মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে, কোন অঞ্চলে কোন প্রজাতির সাপ বেশি, কোথায় কত অ্যান্টিভেনম প্রয়োজন—এসব তথ্যের ভিত্তিতে পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে।
তিস্তা ব্যারেজ নির্মাণ কিংবা ডজনখানেক উড়োজাহাজ ক্রয় রাষ্ট্রের সক্ষমতার প্রতীক হতে পারে; কিন্তু একজন কৃষক, জেলে কিংবা শ্রমিক সাপের কামড়ে আক্রান্ত হওয়ার পর নিকটতম স্বাস্থ্যকেন্দ্রে জীবনরক্ষাকারী অ্যান্টিভেনম পাবে কি না—সেটিই আসলে জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রের প্রকৃত পরীক্ষার জায়গা। উন্নয়নের প্রকৃত অর্থ কেবল অবকাঠামো নির্মাণ নয়, মানুষের জীবন রক্ষা করাও উন্নয়নের অন্যতম মৌলিক শর্ত।
আজ যখন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও বিদ্যুৎ, মোবাইল নেটওয়ার্ক এবং ডিজিটাল সেবা পৌঁছে গেছে, তখন সাপের দংশনের মতো চিকিৎসাযোগ্য কারণে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। একটি জীবনরক্ষাকারী ওষুধের অপ্রাপ্যতার কারণে একজন মানুষ মারা যাবে—এটি আধুনিক রাষ্ট্রের জন্য লজ্জাজনক বাস্তবতা। সবচেয়ে বড় কথা হলো, সাপে কামড়াবে গ্রামে, আর প্রতিষেধক থাকবে শহরে—এই বৈপরীত্য যতদিন দূর না হবে, ততদিন অকালমৃত্যুর এই মিছিলও থামবে না।
রাসেল আহমদ সাংবাদিক ও সমাজকর্মী। ই-মেইল: [email protected]