Published : 14 Jun 2026, 09:58 AM
বিশ্বকাপের মূল পর্বে রেফারি হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী প্রথম সোমালি হওয়ার কথা ছিল ওমর আরতানের। ২০১৮ সাল থেকে তিনি ফিফা স্বীকৃত রেফারি হিসেবে ম্যাচ পরিচালনা করছেন। ২০২৩ সালে 'আফ্রিকা কাপ অব নেশনস' পরিচালনা করেন এবং ২০২৫ সালে তিনি আফ্রিকান ফুটবল কনফেডারেশনের বর্ষসেরা পুরুষ রেফারির সম্মান লাভ করেন। অথচ গত সপ্তাহে, মিয়ামি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আরতানকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতেই দেওয়া হয়নি।
এ ঘটনার কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা যুক্তরাষ্ট্র দেয়নি। তবে সোমালিয়া ডনাল্ড ট্রাম্পের ভ্রমণ-নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত দেশগুলোর একটি। ঘটনাটি বিশ্বজুড়ে বিতর্কের জন্ম দিলে একটি অজ্ঞাত সূত্র প্রকাশ করে, আরতানের সঙ্গে সোমালিয়ার সশস্ত্র কোনো গোষ্ঠীর সম্ভাব্য যোগাযোগ থাকতে পারে। কিন্তু কোনো প্রমাণ ছাড়া আনা এমন অভিযোগ তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি করে। একইসঙ্গে বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। আমেরিকার নীতি সবার কাছে পরিষ্কার হয়। তাই আরতানের ভিসা জটিলতা শুধু নিরাপত্তা-সংক্রান্ত কোনো কারণ নয়, বর্ণবৈষম্যের চরম প্রকাশও।
এই অসম্মানজনক নীতিটাই ডনাল্ড ট্রাম্পের শাসনের ভিত্তি। বর্তমানে সোমালিয়াসহ ৩৯টি দেশ বিভিন্ন ধরনের মার্কিন ভ্রমণ-নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে। নাইজার, বুরকিনা ফাসো, দক্ষিণ সুদান, সিয়েরা লিওন, লাওস ইত্যাদি। এর ফলে বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর একটি বড় অংশের সমর্থকদের ভিসা পাওয়া অনিশ্চিত, তারা সরাসরি নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ছে। এমন বাস্তবতায় ‘ফুটবল বিশ্বকে একত্র করে’—ফিফার এ স্লোগানের আর কীইবা মূল্য থাকে!

বিশ্বকাপের মূল চেতনা হলো জাতি, বর্ণ, ধর্ম ও সীমান্তের ঊর্ধ্বে ওঠে মানুষের মিলন। কিন্তু এই আয়োজন মানুষে মানুষে বিভাজনে সৃষ্টি করছে। যখন সহ-আয়োজক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ভিসা, অভিবাসন ও প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রে কঠোর ও বৈষম্যমূলক নীতি অনুসরণ করে, তখন বিশ্বকাপের সর্বজনীনতার ধারণা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর প্রভাব শুধু সমর্থকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; খেলোয়াড়, ম্যাচ কর্মকর্তা এবং সাধারণ নাগরিকের ওপরও পড়ে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো কয়েক মাস ধরেই এ বিষয়ে সতর্ক করছে। বিষয়টি শুধু একটি ক্রীড়া আয়োজনের সমস্যা নয়, এক বিস্তৃত মানবাধিকার ইস্যু। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সতর্ক করেছে যে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অভিবাসন নীতি, বৈষম্যমূলক আইন প্রয়োগ এবং ব্যাপক গ্রেপ্তারের প্রভাব। এসব কারণে বিশ্বকাপের অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবিক চেতনা গুরুতর সংকটের মুখে।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন সংস্থার (আইসিই) অভিযানে রেনি নিকোল গুড নিহত হওয়ার ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। এর মাত্র দুই সপ্তাহ পর একই সংস্থার অভিযানে অ্যালেক্স প্রেটি নামে আরেকজনের মৃত্যুর খবরও প্রকাশ্যে আসে। তবে আলোচিত এসব ঘটনা বৃহত্তর এক বাস্তবতার অংশ মাত্র; আরও অনেক অভিযোগ ও মৃত্যুর ঘটনা জনসমক্ষে আসেনি। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ বছর সংস্থাটির হেফাজতে অন্তত ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে।
গত বছর জুনে যুক্তরাষ্ট্র পাঁচ লাখেরও বেশি বৈধ অভিবাসীকে দেশত্যাগে বাধ্য করার উদ্যোগ নেয়। এ সংখ্যা বিশ্বকাপ ফাইনাল ম্যাচ উপভোগকারী সম্ভাব্য দর্শকসংখ্যার চেয়েও বেশি। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন সংস্থার ভারপ্রাপ্ত পরিচালক বলেন, “বিশ্বকাপের সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তাদের সংস্থা দায়িত্ব পালন করবে।”
তবে এখন পর্যন্ত ফিফা বা যুক্তরাষ্ট্র—কেউই সমর্থক ও দর্শকদের সম্ভাব্য বেআইনি আটক, অভিযান বা নির্বাসনের ঝুঁকি থেকে সুরক্ষার বিষয়ে স্পষ্ট কোনো নিশ্চয়তা দেয়নি। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ বিভিন্ন সংস্থা যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, তারও সন্তোষজনক জবাব মেলেনি।
কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের ওপর বিধিনিষেধ, গৃহহীনদের নিপীড়নমূলক কাঠামোতে রাখা, ব্যাপক নজরদারি এবং অভিবাসন-সংক্রান্ত কঠোর নীতির কারণে বিশ্বকাপের অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আর এর সবচেয়ে ভয়াল শিকার হওয়ার শঙ্কা রয়েছে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর। ফলে, সবার জন্য একটি নিরাপদ, বৈষম্যহীন ও উন্মুক্ত টুর্নামেন্ট আয়োজনের যে প্রতিশ্রুতি ফিফা দিয়েছিল, তা কতটা পূরণ হবে—সেই প্রশ্ন এখন আরও জোরালো হয়ে উঠেছে।
চার বছর আগে কাতার বিশ্বকাপ আয়োজনের সময় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও অভিবাসী শ্রমিকদের শোষণ নিয়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলো জোরালো উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। স্টেডিয়াম নির্মাণে বহু শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনাও আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক সমালোচিত হয়। তখন বিশ্বের অনেক রাজনৈতিক নেতা, সংবাদমাধ্যম ও মানবাধিকারকর্মী সরব ছিলেন। কিন্তু বর্তমান বিশ্বকাপের মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে সেই চেনা মহলের মুখে এখন পিনপতন নীরবতা।
এই নীরবতা কেবল কাকতালীয় নয়, মানবাধিকার ইস্যুতে তাদের দ্বিচারিতার ইঙ্গিত বহন করে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীসহ ক্ষমতাশালীদের মুখে লাগাম টানা বা চোখে কালো চশমা পড়ে থাকার ঘটনা, মানবাধিকারপন্থী ও গণতন্ত্রকামীদের চোখ ফাঁকি দিতে পারে না। এই দ্বৈত নীতি বড়ই অদ্ভুত ও বিস্ময়কর, যা আসলে চরম কাপুরুষতাকেই উন্মোচন করে। যারা কেবল নিজেদের সুবিধামতো মানবাধিকারের পক্ষে কথা বলে, স্বার্থের প্রয়োজনে আদর্শের বুলি আওড়ায়, অন্য সময়ে তাদের এমন মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকাটাই স্বাভাবিক।
এটি এমন এক ভণ্ডামি, যা গুরুতর অন্যায় ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডকে নীরবে বৈধতা দেওয়ার পথ তৈরি করে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ডনাল্ড ট্রাম্পকে প্রথমবারের মতো ফিফা শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়। অথচ এরপরই তার প্রশাসনকে ঘিরে একাধিক আন্তর্জাতিক বিতর্ক সামনে আসে। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে গ্রেপ্তার অভিযান, ইরানে অবৈধ আক্রমণ ও কিউবা–সংক্রান্ত নীতিতে আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনৈতিক রীতিনীতিকে উপেক্ষা করেছে।

এসব ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের পাশে নীরব অবস্থানে ছিল যুক্তরাজ্যও। ভেনেজুয়েলা প্রশ্নে স্পষ্ট অবস্থান না নেওয়া, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে সহযোগিতার অভিযোগ এবং কিউবার ওপর তেল অবরোধ নীতির বিরোধিতা না করা কাপুরুষতার সাক্ষ্য বহন করে। তাই একের পর এক বিতর্কিত ঘটনায় এমন অবস্থান যুক্তরাজ্যের জন্য এক ধরনের হ্যাটট্রিকে পরিণত হয়েছে।
এর সঙ্গে গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যায় আমেরিকার পাশাপাশি যুক্তরাজ্যের অংশগ্রহণের কথা তো উল্লেখই করা হলো না। আসলে মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইন নিয়ে উচ্চকণ্ঠ হলেও বাস্তবে পশ্চিমা সরকারগুলো দ্বিচারি নীতি অনুসরণ করে।
এই সপ্তাহে ওমর আরতানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে ব্রিটিশ মন্ত্রী লিজ কেন্ডাল বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতির জন্য আমি দায়ী নই।”কেন্ডালের কথা সর্বৈব সত্য। তবে এটাও সত্যের অপর পিঠ যে, আমেরিকা মানবাধিকার নিয়ে বিতর্কিত পদক্ষেপ নেওয়ার সাহস পায় মিত্র দেশগুলোর নীরবতার কারণেই। ব্রিটিশ সরকারের মতো ঘনিষ্ঠ মিত্ররা যখন এসব বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান নেয় না, তখন আমেরিকার ওপর জবাবদিহির চাপও কমে যায়। ফলে দেশটির বিভিন্ন সংস্থার বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ একের পর এক বাড়তেই থাকে।
আমরা ফুটবল ভালোবাসি। এই খেলা কোটি মানুষের আনন্দ, আবেগ ও বিনোদনের উৎস। কিন্তু মানুষের জীবন কোনো খেলা নয়, খেলার মাঠও নয়। নয় নাটকের মঞ্চ। এখন সময় এসেছে ব্রিটিশ সরকারের তোষণ, কাপুরুষতা এবং ভণ্ডামিপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির মুখোশ উন্মোচন করার সাহস দেখানো এবং আমেরিকাসহ সর্বত্র সবার মানবাধিকার রক্ষায় লড়াই করা।
লেখাটি ‘দ্য গার্ডিয়ান’ থেকে অনূদিত; এর লেখক জেরেমি করবিন একজন ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ এবং যুক্তরাজ্যের নর্থ ইসলিংটন এলাকার সংসদ সদস্য। তিনি ২০১৫ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টির প্রধান ও বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী অবস্থান, জনকল্যাণমুখী নীতি, রেল জাতীয়করণ এবং ফিলিস্তিনের পক্ষে আন্দোলনের জন্য তিনি বিশ্বব্যাপী পরিচিত।