Published : 14 Jun 2026, 08:23 AM
কয়েক বছর আগের কথা মনে পড়ে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক আদিবাসী শিক্ষার্থী, হ্লাথোয়াইছা চাক, গ্রাফিক ডিজাইন শিখে ফ্রিল্যান্সিং শুরু করেছিলেন। বাড়িতে খুব একটা সায় ছিল না। বাবা বলতেন, এই কাজে সংসার চলবে না। কিন্তু বছর দুয়েকের মাথায় তিনি মাসে লক্ষাধিক টাকা আয় করছেন—ডলারে। পাশের বাড়ির ছেলে সরকারি চাকরির পরীক্ষা দিতে দিতে ক্লান্ত, আর এই তরুণ তার ল্যাপটপ থেকে ইউরোপের ক্লায়েন্টের কাজ করছেন। ব্যাংকার হিসেবে আমি যখন এই ধরনের অ্যাকাউন্ট দেখি, তখন একটাই কথা মনে হয়—সম্পদ শুধু মাটির নিচে নয়, মাথার ভেতরেও থাকে।
সৃজনশীল অর্থনীতি বলতে আসলে এটাই বোঝায়—মানুষের চিন্তা, দক্ষতা, সংস্কৃতি আর উদ্ভাবনকে পণ্যে পরিণত করার প্রক্রিয়া। চলচ্চিত্র, গান, সফটওয়্যার, ডিজিটাল কনটেন্ট, নকশিকাঁথা থেকে শুরু করে মোবাইল গেইম পর্যন্ত সবই এর আওতায় পড়ে। এখানে কারখানা লাগে না, বিশাল জমি লাগে না; একটা ভালো আইডিয়া আর সেটাকে বাজারযোগ্য করার দক্ষতাই যথেষ্ট। জাতিসংঘের হিসাবে, এই খাত থেকে বিশ্বে প্রতি বছর আয় হয় দুই ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি, কর্মসংস্থান হয় পাঁচ কোটি মানুষের। আর এই পাঁচ কোটির প্রায় অর্ধেকই নারী।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে এই খাতের জন্য প্রথমবারের মতো স্বতন্ত্র পরিচয় ও বরাদ্দ এসেছে—সরাসরি তিনশো কোটি টাকা সরকারি অর্থায়ন এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিল থেকে আরও পাঁচশো কোটি, সব মিলিয়ে আটশো কোটি টাকার একটি প্যাকেজ। পূর্বাচলে একশো ষাট একর জমিতে আন্তর্জাতিক মানের একটি কেন্দ্রীয় ক্রিয়েটিভ হাব, বিভাগ-জেলা-উপজেলা পর্যায়ে ছোট হাব, ‘ক্রিয়েটেড ইন বাংলাদেশ’ নামে একটি জাতীয় ব্র্যান্ড এবং এই খাত দেখার জন্য একটি বিশেষ কর্তৃপক্ষ গঠনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
কাগজে পড়লে বেশ উচ্চাভিলাষী মনে হয়। সরকারের লক্ষ্য, এই খাতের জিডিপিতে অবদান দেড় শতাংশে নিয়ে যাওয়া এবং পাঁচ লাখ নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করা।
বাংলাদেশ এই বিশাল বৈশ্বিক বাজারে এখন কোথায় দাঁড়িয়ে? পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে, চলতি অর্থবছরে এই খাত জিডিপিতে যোগ করেছে নয় হাজার একশো তিরানব্বই কোটি টাকা, প্রবৃদ্ধির হার পনেরো দশমিক চার শতাংশ—সংখ্যাটা শুনতে ভালো লাগে। কিন্তু এটি মোট জিডিপির মাত্র শূন্য দশমিক সতেরো শতাংশ। সেখান থেকে দেড় শতাংশে পৌঁছানো মানে প্রায় নয় গুণ বিস্তার। তুলনায় ফিলিপাইনে এই হার সাত দশমিক তিন শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ায় সাত দশমিক আট শতাংশ, যুক্তরাষ্ট্রে চার দশমিক দুই শতাংশ, ভারতে আড়াই শতাংশ। ফারাকটা যত ছোট মনে হোক, আসলে বিশাল।
লক্ষ্যের পথে আরেকটা বাস্তবতা মাথায় রাখা জরুরি। আগের অর্থবছরে সংস্কৃতি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো উন্নয়ন বাজেটের মাত্র শূন্য দশমিক একাশি শতাংশ পেয়েছিল। এই দীর্ঘদিনের অবহেলার পটভূমিতে তিনশো কোটি টাকার সরাসরি সরকারি বরাদ্দ একটা স্পষ্ট মানসিকতা পরিবর্তনের সংকেত, কিন্তু একটি বহুমাত্রিক খাতের জন্য এই অঙ্ক বিশাল লক্ষ্যের তুলনায় সামান্যই থাকে।
তাহলে কেন আমরা পিছিয়ে? শুধু নীতির অভাব নয়, সমস্যাটা আরও গভীরে। আমাদের সমাজে সৃজনশীল কাজকে এখনো পেশা হিসেবে মানা হয় না। ছেলে বলবে গান করতে চায়—বাবা বলবেন, আগে কিছু একটা পড়; মেয়ে বলবে অ্যানিমেশন শিখতে চায়—মা বলবেন, এতে কী হবে? একটু ভিন্ন পথে হাঁটতে চাইলেই পরিবার ও সমাজ টেনে ধরে। এই মানসিকতা রাতারাতি বদলানো যায় না, কিন্তু রাষ্ট্র যদি সৃজনশীল কাজকে সম্মান ও অর্থনৈতিক স্বীকৃতি দেয়, তাহলে সমাজও ধীরে ধীরে বদলায়। ইতিহাস বলে, অস্ট্রেলিয়া যখন ১৯৯৪ সালে ‘ক্রিয়েটিভ নেশন’ নামের পলিসি নিল, তার পরের দশকে দেশটির সাংস্কৃতিক শিল্পের আকার কয়েকগুণ বেড়ে গেল।
কিন্তু এই পরিকল্পনা কাজে আসবে কি? আমার মতে, অবকাঠামো বানালেই সৃজনশীল অর্থনীতি হয় না। একটা বিল্ডিং তৈরি হলেই সেখানে শিল্পী আসবে না, যদি মেধাস্বত্বের সুরক্ষা না থাকে। একজন নির্মাতা সিনেমা বানাবেন না, যদি পাইরেসির বিরুদ্ধে আইন শক্ত না হয়; একজন তরুণ উদ্যোক্তা কনটেন্ট তৈরি করবেন না, যদি তার আইডিয়া চুরি হওয়ার ভয় থাকে। কপিরাইট সুরক্ষা এবং মেধাস্বত্বের কার্যকর প্রয়োগ না বাড়লে বাকি সব উদ্যোগ বালির ভিতে পরিণত হবে।
অর্থায়নের প্রশ্নটাও সহজ নয়। একজন ব্যাংকার হিসেবে বলছি, ব্যাংক সাধারণত জমি বা স্থাবর সম্পত্তি দেখে ঋণ দেয়। কিন্তু একজন সফটওয়্যার ডেভেলপারের সম্পদ তার কোড, একজন চলচ্চিত্রকারের সম্পদ তার স্ক্রিপ্ট—এগুলো জামানত হিসেবে গণ্য হয় না। প্রচলিত ব্যাংক ঋণের কাঠামো এই খাতের জন্য আদৌ উপযুক্ত নয়। ভেঞ্চার ক্যাপিটালের সংস্কৃতি গড়ে না উঠলে, বিশেষ স্টার্টআপ তহবিল তৈরি না হলে, এই খাতে বিনিয়োগ আসবে না। সরকারি বরাদ্দ শুরুর জন্য ভালো, কিন্তু এটাই শেষ কথা নয়।
আরেকটি বড় সমস্যা দক্ষতার ঘাটতি। আন্তর্জাতিক মানের স্টুডিও নেই, অ্যানিমেশন ল্যাব নেই, ডিজিটাল মনিটাইজেশনের কাঠামো দুর্বল। যে তরুণ অ্যানিমেশন বানাতে চায়, সে পেশাদার প্রশিক্ষণ কোথায় পাবে? যে মেয়েটি ফ্যাশন ডিজাইনার হতে চায়, তার পোর্টফোলিও আন্তর্জাতিক ক্রেতার কাছে পৌঁছাবে কীভাবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না মিললে ভালো বাজেট বরাদ্দও কাজে লাগবে না। দশ বছরের বিনিয়োগ ও কর্মপরিকল্পনা এবং আন্তর্জাতিক মানের চলচ্চিত্র স্টুডিও নির্মাণের যে ঘোষণা এসেছে, সেটি এই ঘাটতি মেটানোর একটা শুরু হতে পারে, যদি বাস্তবায়ন হয়।
তবে সম্ভাবনা যে আছে, সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই। বাংলাদেশের তরুণরা ফ্রিল্যান্সিং বাজারে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় অবস্থানে আছে। গত এক দশকে এই খাতে কর্মসংস্থান বেড়েছে দুইশো সাঁইত্রিশ শতাংশ—কৃষি বা শিল্পের চেয়ে অনেক দ্রুত। ইউটিউবে বাংলা কনটেন্টের দর্শকসংখ্যা প্রতি বছর বাড়ছে। টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি, রাজশাহীর সিল্ক, কুমিল্লার খাদি, মানিকগঞ্জের শীতলপাটি—এগুলো নতুন প্যাকেজিং আর ডিজিটাল বিপণনে আন্তর্জাতিক বাজারে জায়গা করে নিতে পারে। ‘ওয়ান ভিলেজ, ওয়ান প্রোডাক্ট’ মডেল সঠিকভাবে কাজ করলে গ্রামীণ শিল্পীদের জীবন বদলে যেতে পারে। কেবল দরকার সঠিক ডিজাইনার, সঠিক বাজার সংযোগ আর সরকারের ধারাবাহিক মনোযোগ।
অন্য দেশের অভিজ্ঞতা থেকেও শেখার আছে। যুক্তরাজ্য নব্বইয়ের দশকে সৃজনশীল শিল্পকে আলাদা খাত হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল, কর ছাড় আর কপিরাইট সুরক্ষা দিয়েছিল। আজ সেই খাত লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান দিচ্ছে। জাপান তার মাঙ্গা আর অ্যানিমেকে শুধু বিনোদন হিসেবে না দেখে রাষ্ট্রীয় ব্র্যান্ড বানিয়েছে। বাংলাদেশের বাউলের দর্শন, মসলিনের ইতিহাস, লোকসংগীতের বৈচিত্র্য—এগুলো নিয়েও এমন কিছু করা সম্ভব। কিন্তু সেটার জন্য দরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, শুধু একটা বাজেট বরাদ্দ নয়।
নারীর অংশগ্রহণের বিষয়টাও আলাদা করে ভাবা দরকার। সৃজনশীল খাতের অনেক কাজ ঘরে বসে করা যায়। একজন নারী উদ্যোক্তা নকশিকাঁথা তৈরি করছেন, অনলাইনে বিক্রি করছেন, বিদেশে পাঠাচ্ছেন—এই মডেল ইতোমধ্যে কাজ করছে ছোট আকারে। জাতিসংঘের হিসাবেই বিশ্বের সৃজনশীল কর্মীর প্রায় অর্ধেক নারী। সরকার যদি এই নারীদের সহজ শর্তে ঋণ, ডিজিটাল প্রশিক্ষণ আর আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের পথ দেয়, তাহলে এই খাত অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তির একটা বড় হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।
সব মিলিয়ে এই বাজেটের উদ্যোগ একটা ভালো শুরু এবং সংখ্যাগুলো তা স্পষ্ট করে; কিন্তু শুধু টাকা বরাদ্দেই কাজ শেষ হয় না। মেধাস্বত্বের সুরক্ষা, ভেঞ্চার বিনিয়োগের পরিবেশ, দক্ষতা তৈরির কার্যকর কর্মসূচি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি সৃজনশীল পণ্যের পরিচিতি তৈরি না হলে এই উদ্যোগ হয়তো আরেকটি ঘোষণায় পরিণত হবে।
শোয়েব সাম্য সিদ্দিক ব্যাংকার ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক। ইমেইল: [email protected]