Published : 27 Jul 2026, 12:05 PM
উত্তাল মেঘনা নদীর ঝুঁকিপূর্ণ নৌপথ পেরিয়ে ভোলা মূল ভূখণ্ড থেকে মনপুরা উপজেলায় যাতায়াতের একমাত্র নিরাপদ নৌযান ‘এসটি ইলিশা’ নামের সি-ট্রাকটি গত চার মাস ধরে বন্ধ রয়েছে। এতে মনপুরার প্রায় দেড় লাখ মানুষ সমস্যায় পড়েছেন।
সি-ট্রাক না চলায় ফিটনেসবিহীন অন্তত সাতটি অবৈধ ট্রলারে গাদাগাদি করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করছেন যাত্রীরা। কিন্তু ভোলা-মনপুরা নৌপথে উত্তাল মেঘনা নদীর একটি ঝুঁকিপূর্ণ অংশ (ডেঞ্জার জোন) রয়েছে। ছোট ট্রলারে ওই অংশ পার হওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে প্রতিদিনই যাত্রীদের নদী পার হতে হচ্ছে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে।
বিআইডব্লিউটিসি ইজারা জটিলতা কাটিয়ে দ্রুত নৌযানটি চালুর কথা জানালেও কর্তৃপক্ষের তদারকির অভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসানও দ্রুত ‘এসটি ইলিশা’ সি-ট্রাকটি চালুর আশ্বাস দিয়েছেন।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তজুমদ্দিন থেকে মনপুরা নৌরুটে যাত্রীদের নিরাপদে মেঘনা পারাপারের জন্য বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন করপোরেশন-বিআইডব্লিউটিসি এসটি ইলিশা নামের একটি সি-ট্রাক বরাদ্দ দেয়। এতে প্রতিদিন নিরাপদে এবং স্বস্তিতে মনপুরার বাসিন্দারা মেঘনা নদী পার হতেন। কিন্তু চলতি বছরের মার্চের মাঝামাঝি সময় থেকে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে সি-ট্রাকটি বিকল হয়ে চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এরইমধ্যে ট্রাকটির ইজারার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় এটি আবার চালু করতে বিলম্ব হয়।
বিআইডব্লিউটিসির ভোলা (ইলিশা) কার্যালয়ের ব্যবস্থাপক কাওসার আহমেদ খান জানিয়েছেন, প্রথমে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে সি-ট্রাকটি বন্ধ হয়। পরে সেটি মেরামত হলেও ইজারা সংক্রান্ত জটিলতা তৈরি হওয়ায় আবার চালু করা যায়নি। সম্প্রতি সেই ইজারা প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে এবং নতুন ইজারাদার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
দ্রুতই তজুমদ্দিন-মনপুরা রুটে ‘এসটি ইলিশা’ সি-ট্রাকটি আবার চলাচল শুরু করবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মেঘনা নদীর ডেঞ্জার জোনে ‘সি-সার্ভে’ সনদ ছাড়া যাত্রীবাহী নৌযান চলাচল সরকারিভাবে নিষিদ্ধ। তবে মাসের পর মাস অবৈধ ট্রলারে যাত্রী পারাপার হলেও সেগুলোর বিরুদ্ধে কোনো আইনানুগ ব্যবস্থা নিচ্ছে না ভোলা বিআইডব্লিউটিএ।
সরেজমিনে তজুমদ্দিন সি-ট্রাক ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, মনপুরা থেকে ত্রিপল দিয়ে ঢেকে রাখা একটি পণ্যবাহী ট্রলারের ভেতরে গাদাগাদি করে প্রায় শতাধিক যাত্রী উত্তাল মেঘনার বড় বড় ঢেউ পেরিয়ে ঝুঁকি নিয়ে কোনোমতে তজুমদ্দিন ঘাটে পৌঁছান। কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর আরেকটি ট্রলার ঘাটে ভিড়তে দেখা যায়।
তবে এসব ট্রলারের কোনো ফিটনেস সনদ বা যাত্রী পরিবহনের অনুমতি নেই। এরপরও গত তিন মাস ধরে অন্তত সাতটি অবৈধ ট্রলারে এভাবেই যাত্রীরা যাতায়াত করছেন। যাত্রীদের জীবনরক্ষাকারী প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জামও ট্রলারগুলোতে নেই।

মনপুরাগামী নাছির উদ্দিন বলছিলেন, “প্রয়োজনর তাগিদে ট্রলারে উঠলে মনে হয় আজই জীবনের শেষ দিন। তজুমদ্দিন-মনপুরা রুটে টানা তিন-চার মাস ধরে সি-ট্রাক চলাচল বন্ধ রয়েছে। এতে আমরা সীমাহীন দুর্ভোগে রয়েছি৷”
সফিউল্লাহ ও মাকসুদ বেপারী বলছিলেন, উত্তাল মেঘনা নদী পারাপারে সি-ট্রাকই সবচেয়ে নিরাপদ বাহন। কিন্তু এটি বন্ধ থাকায় বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে মালবাহী ট্রলারে করে মনপুরায় যাতায়াত করতে হচ্ছে। এতে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে রয়েছেন অসুস্থ রোগী, বৃদ্ধ ও শিশুরা।
মহিউদ্দিন নামের আরেক যাত্রী বলেন, “কখনো কখনো মাঝ নদীতে ট্রলারের ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়। তখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা নদীতে ভেসে থাকতে হয়।”
তজুমদ্দিন-মনপুরা রুটে সরকারি সি-ট্রাক চলাচল বন্ধ থাকার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে সম্প্রতি ভোলা সফরকালে নৌ-পরিবহন প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসান বলেন, “নৌ-পথে নাগরিকদের ভোগান্তি কমাতে সরকারি বা বেসরকারি-যেখান থেকেই সম্ভব, জাহাজের ব্যবস্থা করা হবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে। নৌ-পথে নাগরিকদের ভোগান্তির শিকার হতে দেব না।”
ভোলায় বিআইডব্লিউটিসির পাঁচটি সি-ট্রাক রয়েছে। এর মধ্যে চারটি ইলিশা-লক্ষ্মীপুরের মজুচৌধুরী ঘাট নৌরুটে চলাচল করে। বাকি একটি তজুমদ্দিন-মনপুরা নৌরুটে চলাচল করলেও চার মাস ধরে সেটি বন্ধ রয়েছে। তাই দ্রুত সি-ট্রাকটি পুনরায় চালুর দাবি জানিয়েছেন মনপুরাবাসী।
মো. জসিম ও ইয়াছিন বলেন, নদীতে বড় বড় ঢেউ আর ট্রলারের দুরাবস্থা দেখে ট্রলারে উঠতে সাহস হয় না। তারপরও মনপুরার প্রতিটি মানুষ জীবনের ঝঁকি নিয়ে প্রতিদিন এভাবেই যাতায়াত করছেন।
কামাল নামের এক যাত্রী বলেন, “বাধ্য হয়েই ট্রলারে চড়ে মনপুরা যাচ্ছি। প্রায়ই দেখি মাঝ মেঘনা নদীতে ঝড় শুরু হলে নারী-শিশুসহ যাত্রীদের কান্নার রোল পড়ে যায়। ট্রলার প্রচণ্ড এপাশ-ওপাশ করে দোলে। কিন্তু কিছু করার নাই, গন্তব্যে পৌঁছাতে হবে।”
ভোলা সরকারি কলেজের অনার্স পড়ুয়া শিক্ষার্থী মো. বাবুল বলেন, “ভোলা সদর থেকে জরুরি পারিবারিক কাজে মনপুরায় বাড়িতে যাওয়ার জন্য তজুমদ্দিন সি-ট্রাক ঘাটে এসে দেখি সি-ট্রাক নেই। পরে জানলাম সেটি এখন আর চলে না। তাই ট্রলারে চড়ে মনপুরার উদ্দেশ্যে রওনা দেই।
“কিন্তু মাঝপথে প্রচণ্ড ঝড়ের কবলে পড়তে হয়েছে। ট্রলারে যাত্রীদের নিরাপত্তায় কোনো বয়া বা সরঞ্জাম ছিল না। দুর্ঘটনায় প্রাণহানি হলে দায়ভার কে নেবে?”
পরিবার নিয়ে মনপুরার রামনেওয়াজ ঘাট থেকে ট্রলারে করে তজুমদ্দিন সি-ট্রাক ঘাটে আসা দীপা রানী ও সুমন বলেন, ট্রলারে যাতায়াতে অত্যন্ত ভোগান্তি পোহাতে হয়। তারপরও গত কয়েক মাস ধরে বাধ্য হয়েই যাতায়াত করছেন তারা। ট্রলার যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের দুর্ঘটনার কবলে পড়তে পারে। জীবন হাতের মুঠোয় নিয়েই যাতায়াত করতে হচ্ছে।
এদিকে তজুমদ্দিন-মনপুরা রুটে মেঘনা নদীর ডেঞ্জার জোনে অবৈধভাবে যাত্রীবাহী ট্রলার চলাচলের বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে দাবি করেছেন বিআইডব্লিউটিএর ভোলা নদী বন্দরের সহকারী বন্দর ও পরিবহন কর্মকর্তা নির্মল কুমার রায়।
তিনি বলেন, “বিষয়টি খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”