Published : 05 Jun 2026, 05:48 AM
বাংলাদেশের মোট আয়তনের এক-দশমাংশের মতো এলাকা নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম। খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান–পাহাড়ি তিনটি জেলা নিয়ে গঠিত এই অঞ্চল জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার। বাংলাদেশের পাহাড়ি বনের ৯০ শতাংশই পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় অবস্থিত এবং দেশের মোট জীববৈচিত্র্যের ৮০ শতাংশের মতো এই সব পাহাড়ে বিদ্যমান। এই অঞ্চল শুধু ভৌগোলিকভাবে নয়, পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু গত কয়েক দশকে স্থানীয় জীববৈচিত্র্য চরম সংকটময় পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। প্রকৃতির ওপর বারবার আঘাতে পার্বত্য চট্টগ্রামের চিরসবুজ বনের আয়তন ক্রমশ কমছে। এমন এক উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে আজ ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালিত হচ্ছে। প্রকৃতি ও বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধারের বৈশ্বিক অঙ্গীকারের এই দিনে পার্বত্য অঞ্চলের বিপন্ন পাহাড়, বন ও বন্যপ্রাণী সুরক্ষায় আমাদের নীতি ও কার্যক্রম পুনর্মূল্যায়ন করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।

বিপন্ন বন ও বন্যপ্রাণী
পরিবেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি উপাদান হলো বন ও বন্যপ্রাণী। খাগড়াছড়ি বন বিভাগের আওতাধীন সংরক্ষিত বনাঞ্চল রয়েছে ৬,২০০ একর। ভৌগোলিক গঠনের দিক থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। পাহাড়, উপত্যকা, চিরসবুজ ও মিশ্র চিরসবুজ বন, সংরক্ষিত বনাঞ্চল, ঝিরি ও ঝরনা এবং অজস্র খাল-নদী নিয়ে এটি এক জীববৈচিত্র্য-সমৃদ্ধ জনপদ।
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত 'পার্বত্য চট্টগ্রামের বিপন্ন প্রজাতির বৃক্ষ পরিচিতি' গ্রন্থে বলা হয়—দেশের মোট জীববৈচিত্র্যের ৮০ শতাংশই পার্বত্য চট্টগ্রামে বিদ্যমান। দেশের সরকার-পরিচালিত ১৫ লাখ ৪০ হাজার হেক্টর বনভূমির মধ্যে ৩ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর সংরক্ষিত বন রয়েছে এই পার্বত্য অঞ্চলে। পার্বত্য চট্টগ্রামে বাংলাদেশের পাহাড়ি বনের প্রায় ৯০ শতাংশ বিদ্যমান। এখানে পাহাড়ি বনের পরিমাণ প্রায় ১৩ লক্ষ ৭৭ হাজার হেক্টর, যা দেশের মোট আয়তনের ৯.৩৩ শতাংশ। এর মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকায় বনের পরিমাণ প্রায় ৪০ ভাগ। বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের চিরসবুজ ও মিশ্র চিরসবুজ বনের বিপরীতে বাণিজ্যিক বনের আধিক্য বেড়েছে।

কিন্তু অনিয়ন্ত্রিতভাবে বন উজাড়, পাহাড় ন্যাড়া করে চাষাবাদ, বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বনায়নে বিদেশি বৃক্ষের প্রভাব ও মনোকালচারের (একক প্রজাতির চাষ) কারণে প্রাকৃতিক বন সংকটাপন্ন সময় পার করছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে কয়েকটি ক্যাটাগরিতে বনাঞ্চল রয়েছে—অশ্রেণিভুক্ত বনাঞ্চল (মৌজার ভূমিকে বন বিভাগের ভাষায় অশ্রেণিভুক্ত বনাঞ্চল বলা হয়), রক্ষিত বনাঞ্চল (সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মতোই রক্ষিত বনাঞ্চল; তবে এই বনে প্রবেশে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মতো কড়াকড়ি আরোপ করা হয় না) ও সংরক্ষিত বনাঞ্চল (বন বিভাগ কর্তৃক কঠোরভাবে সংরক্ষিত এবং বন বিভাগের অনুমতি ছাড়া প্রবেশ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ)। নির্বিচারে পাহাড়ি প্রাকৃতিক বন থেকে গাছ কাটার ফলে দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতির বৃক্ষ চরম হুমকির মধ্যে রয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন্যপ্রাণীর বর্তমান করুণ পরিণতি মূলত শতাব্দীজুড়ে চলা শোষণ, সংঘাত ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার অনিবার্য ফল। যদিও বৃহৎ প্রাণীদের যে ক্ষতি হয়ে গেছে তা অপূরণীয়, তবুও অবশিষ্ট জীববৈচিত্র্য এখনও রক্ষা করা সম্ভব। একসময় যে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে কেবল বনসম্পদের ব্যবহারকারী হিসেবে দেখা হতো, তারাই এখন এই অঞ্চলের বন্যপ্রাণীর শেষ রক্ষাকবচ হতে পারে; তবে তা তখনই সম্ভব, যখন সংরক্ষণ কার্যক্রম আস্থা, ন্যায়বিচার ও যৌথ দায়িত্ববোধের ওপর ভিত্তি করে গড়ে তোলা হবে।
বাংলাদেশের প্রখ্যাত বন্যপ্রাণী গবেষক রেজা খান বলছিলেন, “যেসব প্রজাতি অপরিবর্তনীয়ভাবে হারিয়ে গেছে, তার মধ্যে রয়েছে—দুই প্রজাতির গন্ডার, বারোশিঙা (Swamp Deer), গৌর বা বন গরু, বাঘ বা বেঙ্গল টাইগার, সবুজ (জাভা) ময়ূর, বাদি হাঁস বা সাদা-পাখা হাঁস এবং অসংখ্য কম পরিচিত মেরুদণ্ডী ও অমেরুদণ্ডী প্রাণী। এই বিলুপ্তিগুলো চূড়ান্ত, কারণ যেসব আবাসস্থলের ওপর তারা নির্ভর করত, সেগুলোর আর অস্তিত্বই নেই।”
তার মতে, পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের লক্ষ্য অতীতকে হুবহু ফিরিয়ে আনা নয়, বরং আরও ক্ষয় রোধ করা। চরম বৈরিতার মধ্যে যে প্রজাতিগুলো টিকে আছে, সেগুলো যদি পরিপক্ক হওয়ার ও বংশবিস্তার করার সুযোগ পায়, তবে ধীরে ধীরে একটি নতুন ‘মানুষ-সহনশীল-বাস্তুতন্ত্র’ গড়ে উঠতে পারে, যেখানে বন্যপ্রাণী মানুষের পাশে প্রতিবেশী হিসেবে টিকে থাকবে, শিকার হিসেবে নয়।
জীববৈচিত্র্যের দিক থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের একটি অদ্বিতীয় এলাকা। বাংলাদেশের অন্যান্য বনাঞ্চলের তুলনায় পাহাড়ি বনাঞ্চলে গাছপালার ঘনত্ব এবং বনজ প্রজাতির সংখ্যা অনেক বেশি। ২০০১ সালে বাংলাদেশ ফরেস্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট (BFRI) কর্তৃক প্রকাশিত 'ট্রিস অব বাংলাদেশ' বইয়ের তথ্য অনুসারে, পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের ঘন প্রকৃতির পাহাড়ি বনে রয়েছে প্রায় ২০৪ প্রজাতির দেশীয় বৃক্ষ, ৭ প্রজাতির বাঁশ, ৫ প্রজাতির বেত এবং নানা জাতের গুল্ম, লতা, পরাশ্রয়ী ও পরগাছাসহ অর্কিড, ফার্ন এবং পাম জাতীয় উদ্ভিদ।

'পার্বত্য চট্টগ্রামের বিপন্ন প্রজাতির বৃক্ষ পরিচিতি' গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে যে, পাহাড় থেকে অন্তত ১৮৫ প্রজাতির বৃক্ষ বিপন্ন ও বিলুপ্ত হওয়ার হুমকিতে রয়েছে। এর মধ্যে বৈলাম, চন্দুল, চালমুগরা, তালিপাম, উদাল, সিভিট, তমাল, বুদ্ধ নারকেল, কামদেব, তেলিয়া গর্জন ও লাম্বু অন্যতম। এ ছাড়া ওষুধি ও অন্যান্য গাছের মধ্যে অশোক, মান্দার, উলটকম্বল, শ্বেত কাঞ্চন, কুর্চি, চন্দন, বান্দরহোলা, নাইচিচা উদাল, বন চালতা, গোদা ও চাপালিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ বিলুপ্তির শঙ্কায় রয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের বন ও উদ্ভিদ বিপন্ন হওয়ায় এর সামগ্রিক প্রভাব পড়েছে স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের ওপর। বন উজাড়ের কারণে প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পাখি ও বন্যপ্রাণী। আবাসস্থল ধ্বংস হওয়ায় তারা চরম বিপন্নতার মুখোমুখি।
পাশাপাশি ঝুঁকিতে রয়েছে এশিয়ান বন্য হাতি। পার্বত্য চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের আওতাধীন রাঙামাটির বরকল ও লংগদুতে ১২টি বন্য হাতি রয়েছে। গত ২৬ এপ্রিল একটি এশিয়ান বন্য হাতির মৃত্যু হয়েছে। হাতিটির মৃত্যুর পর পায়ের মাংস ও শুঁড় কেটে নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা। এর আগে ২০২৫ সালের ২৫ অক্টোবর রাঙামাটিতে পানিতে পড়ে বিরল প্রজাতির একটি গোলাপি হাতির মৃত্যু হয়।
২০১৬ সালে খাগড়াছড়ির মাটিরাঙায় 'পিটাছড়া বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ' উদ্যোগ নিয়ে কাজ শুরু করেন মাহফুজ রাসেল। সম্প্রতি তিনি বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় কর্তৃক ঘোষিত বৃক্ষ সম্পর্কিত ক্যাটাগরিতে প্রথম স্থান অধিকার করেছেন। তিনি বলেন, "একসময় এই বনভূমি প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো চিরসবুজ বৃক্ষে আচ্ছাদিত থাকলেও এখন সে অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। আমরা দেখছি খাগড়াছড়ির বিভিন্ন উপজেলায় প্রকাশ্যে পাহাড় কর্তন করা হচ্ছে। মানিকছড়িতে এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। দিনের পর দিন পাহাড় কাটা চলছে। এ ছাড়া যেভাবে পাহাড় ন্যাড়া করে জঙ্গল কেটে কাসাভা, কচুসহ কন্দজাতীয় ফসলের আবাদ করা হচ্ছে, তাতে বর্ষায় মাটির ক্ষয় বাড়বে। পাহাড়ের অস্তিত্ব বিলীন হলে পরিবেশের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।"
'ফরেস্ট ট্রানজিট রুলস ১৯৭৩' (Forest Transit Rules 1973) অনুযায়ী স্থানীয় পাহাড়ি জনগোষ্ঠী শুধুমাত্র নিজেদের গৃহস্থালির প্রয়োজনে ইউএসএফ (USF) বা অশ্রেণিভুক্ত বন থেকে গাছ কাটতে এবং জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করতে পারে। কিন্তু বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে কাঠ চুরি এখনও স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বন্যপ্রাণী গবেষক মনিরুল এইচ খানের দেওয়া তথ্যানুসারে, পার্বত্য চট্টগ্রামে ৫৯৭ প্রজাতির পাখি, ৮৭ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ১০৪ প্রজাতির সরীসৃপ, ৪৫ প্রজাতির উভচর এবং প্রায় ৩ হাজার প্রজাতির উদ্ভিদ দেখা যায়। তিনি বলেন, "ইতিমধ্যে গত এক শতকে গন্ডার ও সবুজ ময়ূর বিলুপ্ত হয়ে গেছে। ১৯৭৫ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাবলাখালী বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে পাখি জরিপ হয়। সে সময় ১৮৩ প্রজাতির পাখি শনাক্ত করা হয়েছিল। এর বাইরে আমরাও কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানে একবার পাখি জরিপ করেছি, তাতে দুই শতাধিক পাখির তথ্য পাওয়া যায়। এ ছাড়া পাহাড়ি বনের কিছু অংশে—যেমন রাঙামাটির কাচালং সংরক্ষিত বন এবং বান্দরবান ও সাঙ্গু-মাতামুহুরী বনে উল্লুক থাকলেও তারা খুবই বিপন্ন অবস্থায় রয়েছে। হাতিসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণীর জন্য করিডোর স্থাপন করা গেলে হয়তো তারা কিছুটা সুরক্ষা পেতে পারে।"
খাগড়াছড়িসহ তিন পার্বত্য জেলার জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় কাজ করছে 'বায়োডাইভারসিটি কনজারভেশন সোসাইটি অব সিএইচটি'। সংগঠনটির আহ্বায়ক প্রকৌশলী সবুজ চাকমা বলেন, "পাহাড়, বনভূমি, নদী ও জীববৈচিত্র্য শুধু আমাদের পরিবেশের সৌন্দর্যই বাড়ায় না, বরং এই অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা ও সংস্কৃতির সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। বন উজাড়, জলবায়ু পরিবর্তন, আবাসস্থল ধ্বংস এবং অসচেতনতার কারণে জীববৈচিত্র্য ক্রমেই সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া ঝুঁকির মুখে রয়েছে রাজ ধনেশ, সাম্বার হরিণ, এশিয়ান বন্য হাতি, ভালুক, বনরুই ও মেঘচিতার মতো বন্যপ্রাণী। এর ফলে বহু উদ্ভিদ ও প্রাণীর অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ছে এবং প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে যেটুকু জীববৈচিত্র্য বিদ্যমান রয়েছে, তা সংরক্ষণ করা জরুরি। বন উজাড় বন্ধের পাশাপাশি বন্যপ্রাণী শিকার ও পাচার বন্ধ করতে হবে। প্রাকৃতিক বন পুনরুজ্জীবিত করতে পারলে পার্বত্য অঞ্চল আবারও জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে।"

খাগড়াছড়ির বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. ফরিদ মিঞা বন উজাড় বন্ধে তাদের তৎপরতার কথা বলছিলেন। তিনি বলেন, “আমাদের যে ছয় হাজার দুইশত একরের সংরক্ষিত বনভূমি রয়েছে, সেগুলো রক্ষায় নিয়মিত টহল থাকে। এ ছাড়া খাগড়াছড়ি যেহেতু বন্যপ্রাণী সুরক্ষার অন্যতম স্পট, সে ক্ষেত্রে বন্যপ্রাণী শিকার ও পাচার বন্ধে আমরা বিভিন্ন সময় অভিযান পরিচালনা করি। চলতি অর্থবছরে আমরা মোট ১৭টি বন্যপ্রাণী উদ্ধার করেছি। এর মধ্যে এশিয়ান কালো ভাল্লুক ১টি, মায়া হরিণ ৬টি, মেছো বিড়াল ১টি, বানর ৪টি, তক্ষক ৩টি এবং ৪টি সাপ রয়েছে। এই ঘটনায় মোট ৩টি মামলা হয়েছে।”
মাটিখেকোদের দৌরাত্ম্যে সাবাড় হচ্ছে পাহাড়
খাগড়াছড়ির মানিকছড়ি, দীঘিনালা, মহালছড়ি ও সদর উপজেলায় একের পর এক সবুজ পাহাড় কেটে সাবাড় করে দিচ্ছে মাটিখেকো চক্র। প্রশাসনের অভিযান, মামলা ও জরিমানার পরও থামছে না পাহাড় ধ্বংসের এই মহোৎসব।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত মাত্র চার মাসেই অন্তত আটটি পাহাড় কাটা হয়েছে। মূলত মাটি বিক্রি এবং পাহাড় কেটে ঢালু অংশ সমান করার জন্য এই পাহাড়গুলো কাটা হয়। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে একশ্রেণির অসাধু ব্যক্তি সরকারি খাসজমি ও বন্দোবস্তপ্রাপ্ত পাহাড়-টিলা কেটে মাটি বিক্রির ব্যবসা করে আসছে। এসব মাটি নতুন বসতবাড়ি নির্মাণ, নিচু জমি ভরাট ও বিভিন্ন স্থাপনায় ব্যবহার করা হচ্ছে। পাহাড় কাটার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে এক্সকাভেটর (স্কেভেটর) ও পে-লোডার। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই বড় বড় পাহাড় বিলীন হয়ে যাচ্ছে।

চলতি বছরের ৫ এপ্রিল মানিকছড়ির কালাপানি মৌজার যোগ্যছোলা ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের খাড়িছড়া মাস্টারপাড়া এলাকায় মোবাইল কোর্ট (ভ্রাম্যমাণ আদালত) অভিযান চালিয়ে পাহাড় কাটায় ব্যবহৃত দুটি শক্তিশালী এক্সকাভেটর জব্দ করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, প্রায় ১৫ একর সরকারি খাসভূমির চারটি পাহাড় কেটে সেখানে লেক ও রাস্তা নির্মাণের কাজ চলছিল। এই ঘটনায় তোলপাড় সৃষ্টি হলে পরিবেশ অধিদপ্তর নিয়মিত মামলা রুজু করে। এর মধ্যে উপজেলা সদরের লেমুয়ায় একটি, বড়ডলুতে একটি এবং এয়াতলংপাড়ায় দুটি পাহাড় কাটা হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন দুর্গম এলাকায় রাতের আঁধারে পাহাড় কাটার অভিযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি (২৩ এপ্রিল) খাগড়াছড়ির মহালছড়িতে অনুমতি ছাড়া পাহাড় কাটার ঘটনা ঘটেছে। উপজেলার ৪ নম্বর মাইসছড়ি ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাটিংটিলা এলাকায় অনুমতি ছাড়া পাহাড় কাটার সময় গত ২৩ এপ্রিল সেনাবাহিনীর একটি টহল দল অভিযুক্তদের একটি পে-লোডারসহ হাতেনাতে আটক করে। পরে তাদের মহালছড়ি থানায় সোপর্দ করা হয়।
এ ছাড়া ২১ এপ্রিল খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার কমলছড়ি ইউনিয়নের রোয়াসাইপাড়া এলাকায় পাহাড় কাটার ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে সেখানে যৌথ অভিযান চালায় উপজেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তর।
খাগড়াছড়ি পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. হাসান আহম্মদ বলেন, "গত তিন মাসে পাহাড় কাটার ঘটনায় ৩টি নিয়মিত মামলা এবং ১টি এনফোর্সমেন্ট মামলা দায়ের করা হয়েছে। এনফোর্সমেন্ট মামলার শুনানির মাধ্যমে ১ লক্ষ ৫৭ হাজার টাকা পরিবেশগত ক্ষতিপূরণ আরোপ ও আদায় করা হয়েছে। এ ছাড়া জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের যৌথ উদ্যোগে ৩টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে। এসব মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ১ লক্ষ ৫ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে এবং ৩ জন ব্যক্তিকে ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে।" তিনি আরও বলেন, "জনবল সংকটের কারণে আমরা সবসময় সময়মতো অভিযান পরিচালনা করতে পারছি না।"
খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত বলেন, "আমরা বিভিন্ন সময় পাহাড় কর্তনের খবর পাই এবং এরই ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করি। আমাদের স্পষ্ট নির্দেশনা আছে—কোথাও পাহাড় কাটার ঘটনা ঘটলে যাতে তাৎক্ষণিকভাবে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়। বিভিন্ন সময় পাহাড় কাটার ঘটনায় আমরা যন্ত্রপাতি জব্দ করেছি এবং আইনি প্রক্রিয়া অব্যাহত আছে। পাহাড় কর্তনের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তি যতই প্রভাবশালী হোক না কেন, আমরা জিরো টলারেন্স নীতি দেখাব।"