Published : 04 Jun 2026, 10:26 AM
২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের ঘোষণা দিয়েছে ফিফা। যার মাধ্যমে অফসাইডের জন্য সহকারী রেফারিদের দেরিতে পতাকা তোলার চেনা দৃশ্যটি হয়ত চিরতরে অতীত হতে চলেছে।
‘ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি’ বা ভিএআর-এর কার্যকারিতা বাড়াতে উন্নতমানের ‘সেমি-অটোমেটেড অফসাইড’ প্রযুক্তি এনেছে ‘ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অফ অ্যাসোসিয়েশন ফুটবল’ বা ফিফা।
বিবিসি লিখেছে, এ আধুনিক ব্যবস্থার ফলে অফসাইডের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত চোখের পলকে নেওয়া সম্ভব হবে এবং রেফারিদের খেলা শেষ হওয়া পর্যন্ত অনর্থক অপেক্ষা না করে তখনই পতাকা তোলার সুযোগ করে দেবে।
নতুন এ নিয়মে কোনো খেলোয়াড় যদি ‘১০ সেন্টিমিটারের’ বেশি অফসাইডে থাকেন তবে সহকারী রেফারির কানে সরাসরি একটি রিয়েল-টাইম অডিও সংকেত যাবে।
এর আগে ক্লাব ওয়ার্ল্ড কাপ ও ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপে এ প্রযুক্তির যে প্রাথমিক সংস্করণগুলো পরীক্ষা হয়েছিল, সেগুলো কেবল খেলোয়াড় ‘৫০ সেন্টিমিটারের’ বেশি অফসাইডে থাকলেই রেফারিদের সংকেত পাঠাত।
প্রযুক্তির ছোঁয়া লাগলেও কখন পতাকা তুলতে হবে ও খেলা থামাতে হবে সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার মূল ক্ষমতা এখনও মাঠের অফিশিয়াল বা রেফারির হাতেই থাকবে।
প্রযুক্তিগত কোনো ত্রুটি হয়েছে বলে সন্দেহ হলে তারা চাইলে পতাকা নিচু করেও রাখতে পারেন। তবে ফিফা আশ্বস্ত করে বলেছে, যে কোনো ভুল এড়াতে এ প্রযুক্তিতে পর্যাপ্ত সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা তারা রেখেছে।
তবে এ ব্যবস্থার কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। যেমন, একদম কাছাকাছি থাকা অতি সূক্ষ্ম বিভিন্ন অফসাইড নিখুঁতভাবে ধরতে পারবে না এ প্রযুক্তি।
এ ছাড়াও এ প্রযুক্তির মাধ্যমে খেলোয়াড়রা মাটিতে পড়ে থাকলে বা কয়েকজন খেলোয়াড় খুব কাছাকাছি গাদাগাদি করে থাকলে সঠিকভাবে সিদ্ধান্ত নিতে সমস্যা হতে পারে।
নতুন প্রযুক্তিটি কেবল খেলোয়াড়ের অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে হওয়া ‘পজিশনাল অফসাইডের’ ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যাবে, কোনো সাবজেক্টিভ বা ব্যক্তিগত ব্যাখ্যার সিদ্ধান্তের জন্য নয়।
যেমন, বল স্পর্শ না করেও কোনো খেলোয়াড় প্রতিপক্ষকে বাধা দিচ্ছেন কি না, এমন পরিস্থিতিতে রেফারিকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
ফিফা বলেছে, এ ব্যবস্থা সমর্থক ও খেলোয়াড়দের মনের হতাশা অনেকটাই দূর করবে। একইসঙ্গে অফসাইড হওয়ার পরও খেলা চালিয়ে যাওয়ার কারণে যে অনর্থক ইনজুরি বা আঘাত পাওয়ার ঝুঁকি থাকে তা-ও কমে আসবে।
২০২৫ সালের মে মাসে নটিংহ্যাম ফরেস্টের স্ট্রাইকার তাইও আয়োনিই এমন এক দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিলেন, যেখানে সহকারী রেফারি অফসাইডের পতাকা তুলতে দেরি করায় তিনি গোলপোস্টের সঙ্গে মারাত্মকভাবে ধাক্কা খান। পরবর্তীতে তাকে ‘ইনডিউসড কোমায়’ বা কৃত্রিমভাবে অচেতন অবস্থায় রাখতে হয়েছিল।
ফিফা আরও বলেছে, আরও নির্ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য প্রত্যেক খেলোয়াড়ের হুবহু বাস্তবসম্মত ‘এআইচালিত থ্রিডি অবতার’ তৈরি করা হবে। যার মানে, বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া ৪৮টি দলের ২৬ জন করে মোট ১ হাজার ২৪৮ জন খেলোয়াড়েরই ডিজিটাল স্ক্যান করা হবে।
প্রত্যেক খেলোয়াড়কে স্ক্যান করার জন্য বিশেষ এক চেম্বারে প্রবেশ করতে হবে, যা সম্পন্ন হতে সময় লাগবে কেবল এক সেকেন্ড।
পুরো টুর্নামেন্টের আগে তাদের ফটোশুটের সময় কেবল একবারই এ স্ক্যানটি করা হবে। ফলে, এবারের বিশ্বকাপে আরও উন্নত ও স্পষ্ট ‘অফসাইড অ্যানিমেশন’ দর্শকদের দেখানো সম্ভব হবে।
নতুন ‘আউট অফ বাউন্ডস’ ও ‘লাইন অফ সাইট’ প্রযুক্তি
ফিফা এখন এমন এক প্রযুক্তি ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে, যা গোল হওয়ার ঠিক আগে বলটি মাঠের বাইরে চলে গিয়েছিল কি না তা নিখুঁতভাবে নির্ধারণ করতে পারবে।
গেল ফেব্রুয়ারিতে ব্রেন্টফোর্ডের বিপক্ষে অ্যাস্টন ভিলার এক গোল বাতিল হওয়া নিয়ে বেশ বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, কারণ বলটি আসলেই দাগের বাইরে গিয়েছিল কি না তা স্পষ্ট ছিল না।
এখন থেকে গোললাইন প্রযুক্তির মতোই ‘থ্রিডি অ্যানিমেশন’ তৈরি করা হবে, যা বলের একেবারে সঠিক অবস্থানটি দেখাবে।
বলের ভেতরে থাকা বিশেষ চিপটি জানিয়ে দেবে কোন খেলোয়াড় বলটি শেষ স্পর্শ করেছিলেন। ফলে রেফারিদের নতুন সক্ষমতার অংশ হিসেবে ভিএআর খুব সহজেই যাচাই করতে পারবে যে, কর্নারের সিদ্ধান্তটি সঠিক ছিল কি না।
অফসাইডের ক্ষেত্রে গোলরক্ষকের দৃষ্টিসীমা বা ‘লাইন অফ সাইট’ সংক্রান্ত বিভিন্ন সিদ্ধান্ত আরও দ্রুত ও স্পষ্ট করতে ফিফা ‘রিয়েল-টাইম থ্রিডি রিক্রিয়েশন’ প্রযুক্তির পরিধি আরও বাড়িয়েছে।
এর আওতায় ভিএআর ও টেলিভিশন দর্শকদের জন্য দুটি ভার্চুয়াল ফিড বা দৃশ্যপট থাকবে, যা মাঠের দুই গোলরক্ষকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি হুবহু ফুটিয়ে তুলবে।
এ মৌসুমে এমন বেশ কিছু ‘লাইন অফ সাইট’ অফসাইডের ঘটনা ঘটেছে, যেখানে গোলরক্ষকের দেখার ক্ষমতা বাধার মুখে পড়েছিল কি না তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল।
এ নতুন ব্যবস্থাটি ভিএআর’কে সেসব জটিল সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য কার্যকর বাড়তি সুবিধা দেবে।