Published : 04 Jun 2026, 03:21 PM
প্রবীণ জনগোষ্ঠীর দেখাশোনার দায়িত্ব যতটুকু সন্তানদের, ঠিক ততটুকু রাষ্ট্রেরও। আমরা শুধু সন্তানদের দিকটা নিয়ে কথা বলি, রাষ্ট্রের বিষয়ে আলাপ-আলোচনা নেই বললেই চলে। কর্মক্ষম ব্যক্তির পরিশ্রমের সুফল রাষ্ট্র ভোগ করে। অর্থনীতির চাবি থাকে তাদেরই হাতে। একজন গৃহিণী মা-ও দেশকে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী উপহার দেন। এর পেছনে তার রয়েছে অক্লান্ত পরিশ্রম। তাহলে বার্ধক্যে তাদের চিকিৎসা, নিরাপত্তা, বিনোদন ইত্যাদির দায়িত্ব সরকার কেন নেবে না? রাষ্ট্র নাগরিকদের শ্রম, কর ও অবদানের মাধ্যমে উন্নয়নের সুফল ভোগ করে; তাই বার্ধক্যেও নাগরিকদের প্রতি তার দায়বদ্ধতা থাকা স্বাভাবিক।
সাম্প্রতিক সময়ে এক মায়ের মৃত্যুতে সন্তানদের অবহেলা নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে। আমি সেই সন্তানদের পক্ষে কথা বলছি না। ওই মা যদি সিজোফ্রেনিয়া রোগী হয়েও থাকেন, তারপরও সন্তানদের তার প্রতি অবহেলা ও গাফিলতি ছিল। কিন্তু কত শত সন্তান আছেন, যারা মন ভরা ভালোবাসা নিয়েও অর্থের অভাবে মা-বাবার যথাযথ যত্ন নিতে পারেন না, চিকিৎসা করাতে পারেন না, তাদের কথাও ভাবতে হবে। অনেক বিদেশে থাকা সন্তান টাকা থাকার পরও দেশে থাকা মা-বাবার জন্য প্রয়োজনীয় সেবা কিনতে পারেন না, কারণ প্রবীণদের জন্য শক্তিশালী ‘কেয়ার গিভিং সিস্টেম’-ই গড়ে ওঠেনি দেশে। এই মা-বাবারা যে কোনোমতে দিন পার করছেন, তাদের জন্য সমাধান কি এটাই যে সন্তানকে দেশে ফিরে এসে মা-বাবার সেবার দায়িত্ব নিতে হবে? ওই ছেলে বা মেয়েটি যে রেমিট্যান্স পাঠায়, তার সুবিধা তো রাষ্ট্র ভোগ করছে। তাই প্রবাসীদের মা-বাবার বিষয়ে সরকার তার দায়িত্ব এড়াতে পারে না। বরং সরকারের উচিত, প্রবাসীরা যেন তাদের দেশে থাকা মা-বাবাকে নিয়ে চিন্তিত না হয়ে নিশ্চিন্তে উপার্জন করতে পারেন এবং দেশে রেমিট্যান্স পাঠাতে পারেন, তা নিশ্চিত করা।
প্রবীণ জনগোষ্ঠীর বেঁচে থাকার জন্য যেন সন্তানদের অর্থের ওপর নির্ভর করতে না হয়, তার জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিকে শক্তিশালী করতে হবে। ৭০০ টাকা করে বয়স্ক ভাতা প্রদান করার মধ্যে আবদ্ধ থাকলে চলবে না। এমন কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে, যেগুলো প্রবীণ ব্যক্তির স্বাস্থ্যসেবা, কেয়ার হোম, বিনোদনের সুযোগসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে তাদের জন্য সম্মানজনক জীবন নিশ্চিত করতে পারে। এই দেশের অস্বাভাবিক দামি চিকিৎসা ব্যবস্থায় চিকিৎসা করানোর দায়িত্ব সরকারকেও শেয়ার করতে হবে। তাদের নিঃসঙ্গ জীবনকে আনন্দময় করতে কমিউনিটিভিত্তিক মিটআপ করার ব্যবস্থা রাখতে হবে।
প্রবীণরা বোঝা নন, তারা দেশের সম্পদ। কর্মজীবনে তাদের যে অভিজ্ঞতা, সেগুলোকে ব্যবহার করার অনেক সুযোগ রয়েছে। শুধু শিক্ষিত মানুষ নয়, গ্রামের একজন প্রবীণ কৃষকের অভিজ্ঞতাও অনেক মূল্যবান। একজন গৃহবধূ মা অনেক ঘরোয়া চিকিৎসার খবর রাখেন, যা আমাদের অজানা। আমাদের শিশুদের একটি সুন্দর শৈশব দিতে নানা-নানি, দাদা-দাদির ভূমিকা অপরিসীম। প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞাকে কীভাবে কাজে লাগানো যায়—যা রাষ্ট্র এবং প্রবীণ ব্যক্তি উভয় পক্ষের জন্যই লাভজনক হবে, তা খুঁজে বের করতে হবে। অনেকেই বয়স, অভিজ্ঞতা এবং সক্ষমতা অনুযায়ী কাজের সুযোগ পেলে নিজেরাই নিজেদের জীবনের দায়িত্ব নিতে আগ্রহী হবেন। কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা গেলে বয়স্ক ভাতার ওপর তাদের যে নির্ভরশীলতা, তাও অনেক কমে আসবে। অল্প বিনিয়োগেই তাদের এই চাহিদা পূরণ সম্ভব।
অধিকাংশ সন্তানই তাদের মা-বাবার জন্য সর্বোত্তমটুকু করতে চায়। কিন্তু ভালোবাসা থাকলেই সবসময় প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না; এর জন্য প্রয়োজন একটি সহায়ক সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো। কিন্তু আমরা আমাদের সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাটাই এমন করে রেখেছি, যেন একটা বয়সে গিয়ে বাবা-মা সন্তানের ঘাড়ে বোঝা হিসেবে চেপে বসতে বাধ্য হন। সব সন্তানের সামর্থ্য, মন-মানসিকতা এবং বাস্তবতা একরকম থাকে না। তাই মা-বাবার দায়িত্বের ক্ষেত্রে একেকজন একেক রকম আচরণ করেন। কিন্তু সমাজ সেসব বোঝে না, বোঝার চেষ্টাও করে না। মা-বাবার প্রতি যেকোনো অবহেলার ক্ষেত্রে ঢালাওভাবে সন্তানদের দোষারোপ করে আমরা দারুণ বিনোদন পাই। এই ব্যবস্থা এবং মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন।
‘মা-বাবার ভরণপোষণ আইন’ অবশ্যই বাস্তবায়ন করতে হবে। কিন্তু এই ভরণপোষণের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র কীভাবে সহযোগিতা করবে, তা সুস্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। আমি আমার সর্বোচ্চ দিয়ে, নিজের সুখ ত্যাগ করে ভবিষ্যৎ নাগরিক তৈরি করব, আমার উপার্জনের টাকায় দেশের অর্থনীতির চাকা ঘুরবে, অথচ যখন আমি আর কর্মক্ষম থাকব না, তখন আমার সব দায়িত্ব নেবে আমার সন্তান এবং আমাকে সবসময় তাদের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হবে, রাষ্ট্রের এক্ষেত্রে কোনো দায়দায়িত্ব থাকবে না—এই মর্যাদাহীন বার্ধক্য কোনো নাগরিকের প্রাপ্য হতে পারে না। আমি চাই না আমার বৃদ্ধ বয়সে আমার ভরণপোষণ করতে করতে আমার সন্তান ক্লান্ত হয়ে যাক। চাই না আমার জন্য তার নিজের সুখ-আনন্দ কিংবা তার সন্তানদের দেওয়ার মতো সময়টুকুতে টান পড়ুক। সবচেয়ে বেশি যা চাই না, তা হলো—আমার সন্তান আমার সেবা ও সুস্থতা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকুক। সন্তান অবশ্যই দায়িত্ব পালন করবে। কিন্তু তার পাশে সহায়ক শক্তি হিসেবে থেকে প্রবীণ ব্যক্তির জন্য একটি আরামদায়ক এবং সম্মানজনক জীবন নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকেও প্রয়োজনীয় ভূমিকা রাখতে হবে।
প্রবীণদের সমাজের বোঝা মনে করার মানসিকতা থেকে তাই আমাদের বের হয়ে আসতে হবে। প্রবীণদের কল্যাণকে সন্তান ও রাষ্ট্রের মধ্যে দায় ঠেলে দেওয়ার বিষয় হিসেবে নয়, বরং একটি যৌথ সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে দেখতে হবে। আজকের তরুণরাই আগামী দিনের প্রবীণ। তাই প্রবীণদের জন্য শক্তিশালী সামাজিক সুরক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও পরিচর্যা ব্যবস্থা গড়ে তোলা কোনো দয়া নয়; এটি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের প্রতি একটি বিনিয়োগ। আমরা যেন এমন একটি রাষ্ট্র গড়ে তুলতে পারি, যেখানে বার্ধক্য মানে অনিশ্চয়তা নয়, বরং মর্যাদা, নিরাপত্তা ও সম্মানের সঙ্গে জীবনযাপন—এটাই হোক আমাদের প্রত্যাশা।
উপমা মাহবুব উন্নয়ন পেশাজীবী ও কলাম লেখক। ই-মেইল: [email protected]