Published : 30 Jan 2026, 10:36 AM
মহাকাশ ও মানুষের মনের সম্পর্ক নিয়ে কৌতূহলের শেষ নেই। মানুষ কি স্রেফ পৃথিবীর বাসিন্দা না কি অজান্তেই মহাজাগতিক কোনো শক্তি তাদের নিয়ন্ত্রণ করছে? এমন প্রশ্ন অনেকের মনেই আসে। সৌরজগতের বিভিন্ন স্পন্দন বা কসমিক ফোর্সের সঙ্গে মানুষের অবচেতন মনের গভীর যোগসূত্র থাকতে পারে বলে উঠে এসেছে নানা গবেষণায়।
আমেরিকান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ম্যাগাজিন পপুলার মেকানিক্স প্রতিবেদনে লিখেছে, পূর্ণিমার চাঁদ থেকে শুরু করে মহাকাশের বড় বড় শক্তি মানুষের প্রাত্যহিক আচরণ ও শরীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়াকে কীভাবে প্রভাবিত করে তা নিয়ে শত বছর ধরে চলা গবেষণায় অনেক কাল্পনিক গল্পই মিথ্যে প্রমাণিত হয়েছে। তবে কিছু প্রচলিত ধারণা আজও বৈজ্ঞানিকভাবে সত্যি।
জেনে নেওয়া যাক মহাকাশের এই ছন্দ কীভাবে মানুষের জীবনের সঙ্গে মিশে আছে–
প্রচলিত এক ধারণা অনুসারে অনেকেই হয়ত শুনে থাকবেন, চন্দ্রচক্র বা পৃথিবীর কাছে চাঁদের আসা-যাওয়া মানুষের আচরণের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। পূর্ণিমার সময় দুর্ঘটনা বা মানুষের মেজাজের উগ্রতা বেড়ে যায়। ফলে হাসপাতালে জরুরি বিভাগে রোগীর সংখ্যা বাড়ে। হাসপাতালের কর্মীদের প্রায় ৪০ শতাংশের বেশি মানুষ বিশ্বাস করেন, মানুষের আচরণকে প্রভাবিত করে চন্দ্রচক্র।
তবে গবেষণা অন্য কথা বলছে। প্রায় ৩০ বছর ধরে এ বিষয়টি নিয়ে গভীর গবেষণা চলেছে, সেখানে দেখা গেছে, এ ধারণার আসলে কোনো জোরালো ভিত্তি নেই এবং এমনটি ভুল প্রমাণিত হয়েছে।
১৯৮০-এর দশকে ‘অ্যানালস অফ ইমার্জেন্সি মেডিসিন’-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় উঠে এসেছে, চন্দ্রচক্রের অন্যান্য দিনের তুলনায় পূর্ণিমার দিনে গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সংখ্যায় তেমন পার্থক্য নেই।
২০১৪ সালে ‘ইনজুরি’ জার্নালে প্রকাশিত আরও এক গবেষণায় উঠে এসেছে, মোট দুর্ঘটনার প্রায় ১০ দশমিক ১ শতাংশ ঘটে পূর্ণিমার সময়, যেখানে অমাবস্যার সময় ঘটে ১০ দশমিক ২ শতাংশ। তথ্যটি ওই প্রচলিত ভুল ধারণাকে আবারও মিথ্যা প্রমাণ করেছে।
১৯৮০-এর দশকের শুরুর দিকে করা এক গবেষণায় ভুলবশত পূর্ণিমার সঙ্গে সড়ক দুর্ঘটনা ও আহতের সংখ্যার সম্পর্ক দেখানো হয়েছিল, যা সম্ভবত এই গুজবটি ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করেছে।
‘নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি আবুধাবির সেন্টার ফর স্পেস সায়েন্স’-এর গবেষণা সহযোগী ক্রিস এস. হ্যানসন বলেছেন, সেই নির্দিষ্ট বছরের বিভিন্ন পূর্ণিমা কাকতালীয়ভাবে সপ্তাহের ছুটির দিনগুলোতে পড়েছিল। বিষয়টি স্বাভাবিক, সপ্তাহের অন্যান্য দিনের তুলনায় ছুটির দিনগুলোর রাতেই দুর্ঘটনা ঘটার ঝুঁকি বেশি থাকে।
সড়ক দুর্ঘটনা ও পূর্ণিমার মধ্যে এ সম্পর্কের পেছনে কিছুটা সত্যতা থাকলেও থাকতে পারে। তবে এর সঙ্গে কেবল মানুষই জড়িত নয়। ‘ট্রান্সপোর্টেশন রিসার্চ পার্ট ডি’ জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, পূর্ণিমার সময় গাড়ি ও বন্যপ্রাণীর মধ্যে সংঘর্ষ প্রায় ৪৬ শতাংশ বেড়ে যায়, বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকাগুলোতে।
হ্যানসন বলেছেন, এর কারণ মানুষের আচরণ নয়, বরং পূর্ণিমার রাতে বন্য প্রাণীরা বেশি সক্রিয় থাকে।
‘ইউনিভার্সিটি অফ ভিয়েনা’র ক্রোনোবায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক ক্রিস্টিন টেসমার-রাইবল বলেছেন, “আমরা কেবল যদি মানুষের দিকে তাকাই তবে চাঁদের এসব প্রভাব খুব অদ্ভুত মনে হতে পারে। তবে আসলে কী ঘটছে তা বোঝার জন্য আমাদের অন্যান্য প্রাণীদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকেও বিষয়টি বোঝা দরকার। দিনশেষে, আমরাও তো এক ধরনের প্রাণীই।”
চাঁদের চক্র বা লুনার সাইকেল হচ্ছে ২৯ দশমিক ৫ দিনের, যা নারীদের মাসিক চক্রের দৈর্ঘ্যের খুব কাছাকাছি। এ মিল থাকার কারণেই অনেকে বিশ্বাস করেন, নারীদের মাসিক চক্র চাঁদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলে।
তবে অধ্যাপক টেসমার-রাইবল বলেছেন, আসলে কী ঘটছে তা বুঝতে হলে আমাদের এমন সব প্রাণীদের দিকে তাকাতে হবে যারা এখনও কৃত্রিম আলোয় ঘেরা শহরের বাইরে একদম প্রাকৃতিক পরিবেশে বাস করে। যেমন গরিলাদের ডিম্বাশয় চক্রের দৈর্ঘ্য প্রায় ২৮ থেকে ৩০ দিন। কিছু প্রমাণ বলছে, এদের প্রজনন চক্র চাঁদের চক্রের সঙ্গে মেলে। অন্যদিকে, শিম্পাঞ্জিদের এই চক্র ৩৫ থেকে ৩৭ দিনের, যা চাঁদের সঙ্গে একেবারেই মেলে না।
হ্যানসন বলেছেন, বর্তমানে কোটি কোটি মানুষ ‘পিরিয়ড ট্র্যাকিং’ অ্যাপ ব্যবহার করায় বড় সংখ্যাক তথ্য বিশ্লেষণের সুযোগ পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। তারা বলছেন, চাঁদের দশা বা পর্যায়গুলোর সঙ্গে মাসিক চক্রের তেমন কোনো সম্পর্ক নেই বললেই চলে। মানুষের মাসিক চক্রের সময় একেকবার একেক রকম হতে পারে, তবে চাঁদের চক্র সবসময় নির্দিষ্ট সময়েই ঘটে।
“মাসিক চক্র নির্ধারিত হয় হরমোন ও আরও অনেক বিষয়ের মাধ্যমে, যার সঙ্গে মহাকাশে ঘুরে বেড়ানো বিশাল এক পাথরের (চাঁদ) কোনো বাস্তবসম্মত সম্পর্ক থাকার কথা নয়।”
অন্যদিকে, টেসমার-রাইবল বলেছেন, কিছু কিছু ক্ষেত্রে অনেক বিষয় এমনভাবে মিলে যায় যে, সেগুলোকে স্রেফ ‘কাকতালীয়’ বলে উড়িয়ে দেওয়া কঠিন।
“আমার মতে, মানুষের ক্ষেত্রে বিষয়টি এমন যে, বিভিন্ন বিজ্ঞানী চন্দ্রচক্রের সঙ্গে পরিসংখ্যানগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কিছু সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছেন, বিশেষ করে ঘুম ও মাসিক চক্রের সময়ের ক্ষেত্রে এমন কিছু মিল পাওয়া গেছে, যা কেবল ‘ভুল তথ্য’ হিসেবে বলা কঠিন।”
ঘুমের মতো বিভিন্ন প্রক্রিয়া আমাদের দেহের ‘সার্কাডিয়ান ক্লক’ বা দেহের অভ্যন্তরীণ ঘড়ির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। এ ঘড়িটিই ঠিক করে দেয়, মানুষ কখন ঘুমাবে ও কখন জাগবে।
‘ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক’-এর মতে, এ ঘড়িটি যেমন আলো ও অন্ধকারের মাধ্যমে প্রভাবিত হয় তেমনই মানুষের শারীরিক পরিশ্রম, খাবার-দাবার, ক্যাফেইন বা কফি খাওয়ার সময়, মানসিক চাপ ও দৈনন্দিন রুটিনের ওপরও নির্ভর করে।
এখানে একটি বিষয় জানা জরুরি যে, মানুষের ঘুমের চক্র রাতের বেলা তারা কতটা ও কী ধরনের আলোর সংস্পর্শে আসে তার ওপর সংবেদনশীল ও নির্ভরশীল। গবেষণায় দেখা গেছে, রাতের বেলা ‘আলো দূষণ’ মানুষের ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দকে নষ্ট করে দিতে পারে।
হ্যানসন বলেছেন, “চাঁদের আলো আসলে সূর্যেরই প্রতিফলিত আলো। ফলে আমাদের শরীরের প্রাকৃতিক ছন্দ এই আলোর মাধ্যমে প্রভাবিত হওয়াটা যুক্তিসঙ্গত।”
তিনি আরও বলেছেন, মানুষ কেবল কয়েক শতাব্দী ধরে রাতের বেলা কৃত্রিম আলো, যেমন বাল্ব বা স্ট্রিট লাইট ব্যবহার করছে। তবে তাদের ঘুমের চক্র বা সিস্টেমটি তৈরি হয়েছে লাখ লাখ বছরের বিবর্তনের মাধ্যমে, যা ওই সময় পুরোপুরি প্রাকৃতিক আলো ও অন্ধকারের ওপর ভিত্তি করে চলত।
কিছু গবেষণায় ইঙ্গিত মিলেছে, মানুষ কোন ধরনের পরিবেশে বাস করে তার ওপর ভিত্তি করে তার ঘুমের ওপর চাঁদের প্রভাব কম-বেশি হতে পারে।
গবেষকরা বলছেন, পূর্ণিমার আগের রাতগুলোতে সন্ধ্যার পর যখন চাঁদের আলো ছড়িয়ে পড়ে তখন মানুষ অনেক বেশি সামাজিক হয়ে ওঠে এবং তাদের ঘুমের মান কমে যায়, বিশেষ করে যারা গ্রামে বা বিদ্যুৎহীন এলাকায় বাস করেন তাদের বেলায়।
তবে, শহরাঞ্চলের কৃত্রিম আলো বা ‘আলো দূষণ’ রয়েছে সেখানেও এই একই প্রভাব দেখা গেছে। গবেষণায় অংশগ্রহণকারী সবাই পূর্ণিমার তিন থেকে পাঁচ দিন আগে সবচেয়ে দেরিতে ঘুমাতে গিয়েছেন ও সবচেয়ে কম সময় ঘুমিয়েছেন।
ওই গবেষণার সহ-লেখক লিয়েন্দ্রো কাসিরাগি বলেছেন, “আমাদের ধারণা, মানুষের এ আচরণটি আসলে বিবর্তনের ফলে পাওয়া সহজাত এক বৈশিষ্ট্য, যা আমাদের পূর্বপুরুষদের সেই সময় সাহায্য করত যখন তারা চন্দ্রচক্রের নির্দিষ্ট সময়ে পাওয়া এ প্রাকৃতিক বিকেলের আলো বা সন্ধ্যার আলোকে নিজেদের কাজে ব্যবহারের সুযোগ পেতেন।”
বিষয়টি মানবদেহের অভ্যন্তরীণ ঘড়ির কোনো পুরানো বিবর্তনীয় বৈশিষ্ট্য হতে পারে। তবে এর সঠিক কারণ এখনও স্পষ্ট নয়। টেসমার-রাইবল বলেছেন, “মনে হচ্ছে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে তাদের শরীরের অভ্যন্তরীণ ঘড়ি চাঁদের এসব প্রভাবের প্রতি বেশ সংবেদনশীল।”
‘প্লস ওয়ান’ জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় কিছু চমকপ্রদ ধারণা মিলেছে। গবেষণায় উঠে এসেছে, চন্দ্রচক্র মেনে চলা হয়ত আফ্রিকার সাভানা অঞ্চলে বসবাসকারী আদিম মানুষদের সিংহের হাত থেকে বাঁচতে সাহায্য করেছিল। স্বাভাবিকভাবেই, জোছনালোকিত রাতে সিংহের আক্রমণ সফল হওয়ার সম্ভাবনা কমে যেত। কারণ পূর্ণিমার আলো মানুষকে তাদের আশপাশ স্পষ্টভাবে দেখতে সাহায্য করত।
প্রাচীন লোককথার মতো চাঁদের প্রভাব মানুষের ওপর ততটা শক্তিশালী নয়। আর মানুষের চেয়ে পশুদের ওপরই এর প্রভাব হয়ত বেশি। তবে এই মহাজাগতিক শক্তির প্রভাব এবং এ নিয়ে মানুষের যে চিরন্তন কৌতূহল তা অস্বীকারের উপায় নেই।
হ্যানসন বলেছেন, “চাঁদ হয়ত সরাসরি বা দৃশ্যমানভাবে আমাদের শরীরের ওপর প্রভাব ফেলে না তবে তা দারুণ আকর্ষণীয় বস্তু। ইতিহাসের পাতা খুললেও দেখা যায়, আমাদের পূর্বপুরুষদের কাছেও চাঁদ সমান আকর্ষণীয় ছিল।”
একটু রসিকতার ছলে তিনি বলেছেন, “চাঁদ আমাদের এতটাই প্রভাবিত করেছে যে, আমরা রকেট বানিয়ে সেখানে মানুষ পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”