মনোনয়ন প্রত্যাহার: যা বললেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ৩ আওয়ামী লীগ নেতা

সরাইল ও আশুগঞ্জে নানা গুঞ্জনও ডালপালা মেলতে শুরু করেছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 14 Jan 2023, 05:51 PM
Updated : 14 Jan 2023, 05:51 PM

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের উপ-নির্বাচনে তিন আওয়ামী লীগ নেতা প্রার্থী হয়ে যেমন আলোচনার জন্ম দিয়েছিলেন, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের পর এ নিয়ে সরাইল ও আশুগঞ্জ উপজেলায় নানা ‘গুঞ্জন’ও ডালপালা মেলতে শুরু করেছে।

মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের একদিন আগে শনিবার তিন প্রার্থী একসঙ্গে এসে তাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহারের আবেদন করেন বলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা জিল্লুর রহমান জানান।

তিন প্রার্থী হলেন- ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল বারী চৌধুরী, সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মঈন উদ্দিন এবং স্বাধীনতা শিক্ষক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান আলম সাজু।

তিন নেতার মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের সময় জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আল মামুন সরকার উপস্থিত ছিলেন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে রাতে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে আওয়ামী লীগের কোনো প্রার্থী ছিল না। যারা প্রার্থী হয়েছিলেন তারা স্বতন্ত্র হিসেবে প্রার্থী হয়েছিলেন।”

“তবে তাদের পক্ষে দলের নেতাকর্মীরা ভাগাভাগি হয়ে যাওয়াতে দলের মধ্যে অনৈক্য সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। এ কারণে তাদের ডেকে নির্বাচন করতে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।”

এই তিন প্রার্থী মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের ফলে নিজের ছেড়ে দেওয়া আসনের এই উপ-নির্বাচনে বিএনপির সাবেক নেতা ও বর্ষিয়ান রাজনীতিবিদ উকিল আব্দুস সাত্তার ভুঞা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে সহজেই উৎরে যাবেন বলে ভোটাররা আলোচনা করছেন।

আওয়ামী লীগ এই আসনটি উন্মুক্ত রেখেছিল; ফলে এখানে দলীয় কোনো প্রার্থী ছিলেন না।

বিএনপির পক্ষ থেকেও অভিযোগ করা হয়েছিল যে, দলটির সংসদ সদস্যদের পদত্যাগের বিষয়টিকে বিতর্কিত করতেই সরকার চাপ দিয়ে উকিল আব্দুস সাত্তারকে নির্বাচনে দাঁড় করিয়েছে।

উকিল আব্দুস সাত্তার ছাড়া এখন এই আসনের অপর চার প্রার্থী হচ্ছেন- জাতীয় পার্টি মনোনীত প্রার্থী আব্দুল হামিদ ভাসানী, জাতীয় পার্টির বহিষ্কৃত নেতা জিয়াউল হক মৃধা, জাকের পার্টির প্রার্থী জহিরুল ইসলাম জুয়েল এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী আবু আসিফ আহমেদ।

তিন আওয়ামী লীগ নেতা নির্বাচনের মাঠ ছেড়ে দেওয়ায় এখন ‘ভোটের মজা শেষ হয়ে গেছে’ বলে মন্তব্য করেছেন আশুগঞ্জ উপজেলার একজন ভোটার (৪৫)।

তিনি বলেন, “বোঝাই যাচ্ছে, আওয়ামী লীগ চায় না তার নেতারা নির্বাচনে থাকুক। তারা হয়তো উকিল আব্দুস সাত্তারকে পাশ করানোর চেষ্টা করবেন। তবে তিনজনের মধ্যে মঈন সাহেবও যদি মাঠে থাকতেন তাহলে নির্বাচন জমত। কারণ, তিনি ভাল ক্যান্ডিডেট ছিলেন।”

২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় নির্বাচনেও এই আসনটি আওয়ামী লীগ উন্মুক্ত রেখেছিল। সেবারও প্রার্থী হয়েছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা মঈন উদ্দিন। তিনি সেবার বিএনপির প্রার্থী উকিল আব্দুস সাত্তারের কাছে হেরেছিলেন। তবে এই আসনে আওয়ামী লীগের ইতিহাসে তিনি সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছিলেন।

ফলে এবার তিনি প্রার্থী হয়ে বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি নির্বাচন থেকে সেরে দাঁড়ালেন।

জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক এই যুগ্ম সম্পাদকের কাছে মনোনয়ন প্রত্যাহারের কারণ জানতে চাইলে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সরাইল-আশুগঞ্জের মানুষ বড় অসহায় এবং এতিম। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ এগিয়েছে বহুদূর। আমরা সরাইল-আশুগঞ্জবাসী পিছিয়ে থাকতে চাই না।

“আমি এই সংসদীয় আসনের আনাচে-কানাচে ঘুরেছি। মানুষের যে বিপুল প্রত্যাশা, আমি যদি নির্বাচিত হইও এই আট মাসে সব আমার দ্বারা পূরণ করা সম্ভব না।”

মঈন আরও বলেন, “এই কারণে ২০২৪ সালের দ্বাদশ নির্বাচনকে সামনে রেখে আমি জনমানুষের বিশ্বাস ও আস্থার প্রতি অটুট বিশ্বাস রেখে এ নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছি।”

মনোনয়ন প্রত্যাহারের কারণ হিসেবে প্রায় কাছাকাছি কথা বলেছেন অপর প্রার্থী জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল বারী চৌধুরী মন্টু।

রাতে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমি শারীরিভাবে অসুস্থ। তাছাড়া নির্বাচনে বিজয়ী হলেও এই অল্প সময়ে জনগণের জন্যে তেমন কাজ করতে পারবো না। তাই মনোনয়ন প্রত্যাহার করেছি। এখন দলীয় কর্মকাণ্ডে আগের চেয়ে আরও বেশি সময় দেব।”

দলীয় সিদ্ধান্তে গত ১১ ডিসেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের উকিল আবদুস সাত্তারসহ বিএনপির ৭ সংসদ সদস্য পদত্যাগপত্র জমা দেন স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর কাছে। ছেড়ে দেওয়া এসব আসনে আগামী ১ ফেব্রুয়ারি উপ-নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

তার আগে দলীয় চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদসহ বিএনপির সব ধরনের পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ার কথা জানান তিনি। পরে তাকে দলীয় সব পদ ও প্রাথমিক সদস্য থেকে বহিষ্কার করে দল। 

উকিল আব্দুস সাত্তার কুমিল্লা জেলা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সহসভাপতি ছিলেন। তিনি ২৮ বছর জেলা সভাপতির দায়িত্ব সামলেছেন।

বর্ষিয়ান এই রাজনীতিবিদ নিজের ছেড়ে দেওয়া আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার পর ভোটারদের মধ্যে নানা গুঞ্জন শুরু হয়েছিল।

সরাইল উপজেলার একটি বেসরকারি স্কুলের শিক্ষক (৫০) নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আওয়ামী লীগের তিন নেতার মধ্যে মঈন উদ্দিন গত নির্বাচনে অল্প ভোটে হেরেছিলেন। এখানে বিএনপির শক্ত অবস্থান আছে। ফলে উকিল আব্দুস সাত্তার বার বার জিতেছেন; জাতীয় পার্টিও জিতেছে। কিন্তু মানুষের মধ্যে এবার মঈনকে নিয়ে কথাবার্তাও আছে। যদি তিনি মাঠে থাকতেন তাহলে ফলাফল অন্যরকম হতে পারত। হয়তো দল এটি চায়নি। তাহলে দল কী চাচ্ছে, সেটিও কিন্তু মানুষ জানে। হয়তো বলে না।”

“তবে এটা ঠিক, মঈন মাঠে থাকলে উকিল আব্দুস সাত্তারের জন্য ভোটে জয় পাওয়া এতটা সহজ হতো না।”

সরাইলের একজন ভোটারের মতে, “এখন এখানে জাতীয় পার্টির ভোট আছে সেটি লাঙ্গল পাবে; আর জিয়াউল হক মৃধা সাহেবেরও কিছু অনুসারী আছেন তিনিও কিছু ভোট পাবেন। তবে নির্বাচনটা জমবে বলে মনে হয় না।”

নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানো স্বাধীনতা শিক্ষক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান আলম সাজু বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, তিনি ‘ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কারণে’ শেষ মুহূর্তে এসে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।

আরও পড়ুন:

ভোট থেকে সরলেন ৩ আওয়ামী লীগ নেতা, উকিল সাত্তারকে নিয়ে ‘গুঞ্জন’

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ভোটে আছেন আওয়ামী লীগের মঈন, সাবেক এমপি জিয়াউল

সরকার উকিল আব্দুস সাত্তারকে চাপ দিয়ে নির্বাচনে এনেছে: রুমিন ফারহানা

ব্রাহ্মণবাড়িয়া উপ-নির্বাচনে ৮ প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ, ৫ জনের বাতিল

মনোনয়নপত্র জমা দিলেন উকিল আব্দুস সাত্তার

পদত্যাগী উকিল আব্দুস সাত্তারকে এলাকায় অবাঞ্ছিত ঘোষণা বিএনপির

বিএনপি ছেড়ে ভোটে লড়তে মনোনয়নপত্র নিলেন উকিল আব্দুস সাত্তার

বিএনপি ছাড়লেন উকিল আবদুস সাত্তার

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক