০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩

শ্রমিকের ঘাম, মালিকের বিলাস এবং ন্যায্য মজুরির প্রশ্ন

মজুরির প্রশ্ন উঠলেই উৎপাদন খরচ আর লোকসানের অজুহাত, কিন্তু শ্রমিকের পেটের ক্ষুধার সমাধান কোথায়? পোশাকশিল্পের সাম্প্রতিক অসন্তোষ, সহিংসতা বর্জন ও টেকসই সমাধানের উপায় অনুসন্ধান।

শ্রমিকের ঘাম, মালিকের বিলাস এবং ন্যায্য মজুরির প্রশ্ন

মাসিক ন্যূনতম  ৩০ হাজার টাকা মজুরির দাবিতে রাজপথে পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভ।

চিররঞ্জন সরকার চিররঞ্জন সরকার

Published : 02 Nov 2026, 08:26 AM

Updated : 02 Nov 2026, 08:27 AM

একটি পোশাক কারখানার মালিক যখন দামি গাড়িতে চড়ে কারখানায় আসেন, শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে ব্যবসার হিসাব করেন, অফিস থেকে ফিরে বিলাসবহুল বাড়িতে আরাম করেন, তখন তার মনে রাখা উচিত, এই বিলাসের পেছনে অসংখ্য শ্রমিকের ঘাম জড়িয়ে আছে। যারা দিনের পর দিন কারখানার মেঝেতে দাঁড়িয়ে কাজ করেন, সুই-সুতার সঙ্গে লড়াই করেন, কাপড় কাটেন, সেলাই করেন, প্যাকেটজাত করেন, তাদের শ্রমেই মালিকের ব্যবসা দাঁড়িয়ে থাকে। মালিক পুঁজি বিনিয়োগ করেন, ব্যবসার ঝুঁকি নেন—নিশ্চয়ই। কিন্তু সেই পুঁজিকে সচল রাখেন শ্রমিকেরা। তাদের হাত থেমে গেলে কোটি টাকার মেশিনও লোহার স্তূপ ছাড়া আর কিছু নয়। অথচ শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি ও জীবনযাপনের প্রশ্ন উঠলেই মালিকপক্ষের অনেকের কণ্ঠে ব্যয়ের হিসাব, লোকসানের আশঙ্কা আর আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার অজুহাত শোনা যায়। প্রশ্ন হলো, শিল্পের সমৃদ্ধিতে শ্রমিকের অবদান এত সহজে ভুলে যাওয়া হয় কেন?

দেশের পোশাকশ্রমিকেরা মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে আন্দোলন করছেন। সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর ও মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ, কর্মবিরতি ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। পাঁচ শতাধিক কারখানা বন্ধ বা ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। প্রায় ১০ লাখ শ্রমিক কাজে যোগ দেননি। কোনাবাড়ী, শফিপুর, পল্লী বিদ্যুৎ, চন্দ্রা, ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-আরিচা মহাসড়কসহ বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, গাড়ি ও পুলিশ বক্সে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে। নিরাপত্তার কারণে মিরপুরের কয়েকটি মেট্রো স্টেশন সাময়িক বন্ধ রাখতে হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার নতুন ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দিয়েছে।

এই আন্দোলনের পেছনে শ্রমিকদের জীবনযাপনের বাস্তবতা বোঝা জরুরি। বাজারে চাল, ডাল, তেল, মাছ, সবজি—কোনো কিছুর দামই সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে নেই। বাড়িভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, যাতায়াত, চিকিৎসা ও সন্তানের পড়াশোনার খরচ প্রতিনিয়ত বাড়ছে। অথচ শ্রমিকের আয় সেই অনুপাতে বাড়ছে কি? একজন শ্রমিক মাসের শুরুতে বেতন পান। বাড়িভাড়া দিয়ে, বাজার করে, সন্তানের স্কুলের খরচ মিটিয়ে মাসের মাঝামাঝি তার পকেট প্রায় ফাঁকা হয়ে যায়। বাকি দিনগুলো কাটে ধারদেনা, দোকানের বাকি আর খরচ কমানোর হিসাব কষে। অনেকের কাছে মাছ-মাংস নিয়মিত খাবার নয়, বিশেষ দিনের আয়োজন। অসুস্থ হলে চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার আগেও ভাবতে হয়, ওষুধের টাকা আসবে কোথা থেকে। এই বাস্তবতায় মজুরি বাড়ানোর দাবি কোনো বিলাসী আবদার নয়; এটি সম্মানজনকভাবে বেঁচে থাকার দাবি।

শ্রমিকের শ্রমের মূল্য শুধু মাস শেষে পাওয়া বেতনের অঙ্ক দিয়ে বিচার করা যায় না। তাদের সময়, শারীরিক পরিশ্রম, দক্ষতা এবং জীবনের বড় একটি অংশ ব্যয় হয় উৎপাদনের কাজে। তাদের শ্রমে তৈরি পোশাক বিদেশের বাজারে বিক্রি হয়, দেশের রপ্তানি আয় বাড়ে, মালিকের ব্যবসা সম্প্রসারিত হয়। মালিকের সন্তান ভালো স্কুলে পড়ে, বিদেশে উচ্চশিক্ষা নেয়, পরিবারের সদস্যরা উন্নত জীবনযাপন করেন। এতে আপত্তির কিছু নেই। কিন্তু যে শ্রমিকের হাত ধরে এই সমৃদ্ধি আসে, তার সন্তান কেন ভালো খাবার, শিক্ষা ও চিকিৎসার নিশ্চয়তা পাবে না? শ্রমিকের সন্তানও তো মানুষ; তারও সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখার অধিকার আছে।

তাই শ্রমিকদের প্রতি মালিকদের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনা জরুরি। শ্রমিককে শুধু উৎপাদন খরচের একটি খাত হিসেবে দেখলে চলবে না; তাকে দেখতে হবে শিল্পের অপরিহার্য অংশীদার হিসেবে। ব্যবসায় মন্দা থাকলে শ্রমিকেরা আগে বেতন, কাজ ও নিরাপত্তার সংকটে পড়বেন, আর ভালো সময় এলে লাভের সুফল শুধু মালিকের ঘরে জমা হবে—এমন ব্যবস্থা ন্যায়সংগত হতে পারে না। কারখানার সম্পর্ক কেবল মালিকের নির্দেশ আর শ্রমিকের আনুগত্যের সম্পর্ক নয়। সেখানে পারস্পরিক সম্মান, আস্থা ও সহযোগিতা থাকা দরকার। শ্রমিকের প্রতি সহানুভূতি দেখানো মালিকের দয়া নয়, বরং তার নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব।

তবে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির আন্দোলনে সহিংসতার কোনো স্থান থাকতে পারে না। পুলিশ বক্সে আগুন দেওয়া, গাড়ি পোড়ানো, কারখানা ভাঙচুর, লুটপাট কিংবা সাধারণ মানুষের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। যে কারখানায় শ্রমিকের জীবিকা, সেখানেই আগুন দিলে শেষ পর্যন্ত নিজের কর্মসংস্থানই বিপন্ন হয়। মেশিন ভাঙলে উৎপাদন বন্ধ হয়, অর্ডার বাতিলের ঝুঁকি বাড়ে, বিদেশি ক্রেতার আস্থা কমে। এর ধাক্কা মালিকের পাশাপাশি শ্রমিকের ঘরেও পৌঁছায়। রাস্তা অবরোধের কারণে অসুস্থ রোগী হাসপাতালে যেতে না পারলে কিংবা সাধারণ মানুষ দুর্ভোগে পড়লে আন্দোলনের প্রতিও জনসমর্থন কমে যায়। ন্যায্য দাবি আদায়ের জন্য শান্তিপূর্ণ কর্মবিরতি, মিছিল, স্মারকলিপি ও আলোচনার পথ খোলা রাখতে হবে। সহিংসতা আন্দোলনের নৈতিক শক্তি দুর্বল করে।

এ ক্ষেত্রে মালিকদেরও দায়িত্ব কম নয়। কাজে যোগ না দিলে কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হবে, এমন হুমকি দিয়ে শ্রমিক অসন্তোষের সমাধান সম্ভব নয়। শ্রমিককে ভয় দেখিয়ে সাময়িকভাবে কাজে ফেরানো গেলেও তার ক্ষোভ দূর হবে না। একইভাবে আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে শ্রমিকদের বেছে বেছে চাকরিচ্যুত করা বা হয়রানি করা হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে। কারখানার ভেতরে অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা না থাকলে, মালিকপক্ষ কথা শুনতে না চাইলে, মজুরি নিয়ে বারবার আশ্বাস দিয়েও বাস্তবায়ন না করলে শ্রমিক কোথায় যাবেন? তাদের কথা শোনার জন্য মালিকদের আলোচনার টেবিলে বসতে হবে। শ্রমিকদের সমস্যাকে অবজ্ঞা না করে তাদের অভাব-অভিযোগ ও দাবিদাওয়া আন্তরিকভাবে বিবেচনা করতে হবে।

সরকারের নতুন মজুরি বোর্ড গঠন একটি প্রয়োজনীয় উদ্যোগ হতে পারে। কিন্তু বোর্ড গঠনই যেন শেষ কথা না হয়। অতীতে দেখা গেছে, শ্রমিক অসন্তোষ তীব্র হলে মজুরি কমিশন বা বোর্ড গঠনের ঘোষণা আসে, আলোচনা শুরু হয়, কিছু আশ্বাস দেওয়া হয়। পরিস্থিতি শান্ত হলে সেই উদ্যোগের গতি কমে যায়। শেষ পর্যন্ত শ্রমিকের ভাগ্যে জোটে আগের বেতন, আগের অনিশ্চয়তা। এবার যেন তার পুনরাবৃত্তি না ঘটে। মজুরি বোর্ডকে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার প্রকৃত ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, বাড়িভাড়া, খাদ্য, চিকিৎসা, যাতায়াত ও শিক্ষার খরচ বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত দিতে হবে। শ্রমিক ও মালিক উভয় পক্ষের প্রতিনিধিদের মতামত শুনতে হবে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময়সীমা এবং তা বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনাও প্রকাশ করতে হবে।

৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবি নিয়ে মালিকপক্ষের আপত্তি থাকতে পারে। শিল্পের সক্ষমতা, উৎপাদন খরচ, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ও রপ্তানি আদেশের বিষয়গুলোও বিবেচনা করতে হবে। কিন্তু এসব যুক্তি দেখিয়ে শ্রমিকের জীবনযাপনের সংকট উপেক্ষা করা যায় না। প্রয়োজন হলে ধাপে ধাপে মজুরি বাড়ানোর ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তবে তার নির্দিষ্ট সময়সীমা ও বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা থাকতে হবে। পাশাপাশি উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং ছোট কারখানাগুলোকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। শ্রমিকের মজুরি বাড়লে উৎপাদন খরচ কিছুটা বাড়বে, কিন্তু তাদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়লে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

শ্রমিকদের আন্দোলনের পেছনে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অভিযোগও তোলা হচ্ছে। কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠী শ্রমিকের অসন্তোষকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে চাইলে তা অবশ্যই অনভিপ্রেত। কিন্তু রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলে শ্রমিকের প্রকৃত সমস্যাকে আড়াল করাও ঠিক নয়। ক্ষুধার্ত মানুষের হাতে রাজনৈতিক স্লোগান তুলে দিলেই তার ক্ষুধা মেটে না। শ্রমিক কেন রাস্তায় নামলেন, তাদের বেতনে সংসার চলে কি না, কর্মস্থলে তারা কতটা নিরাপদ—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। আন্দোলনে অপরাধ সংঘটিত হলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনানুগ বিচার হোক। কিন্তু শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকে ষড়যন্ত্র আখ্যা দিয়ে দমন করলে সংকটের সমাধান হবে না।

পোশাকশিল্পের সমৃদ্ধি শুধু রপ্তানি আয়ের অঙ্কে মাপা যায় না; এই শিল্পের শ্রমিকেরা কতটা ভালো আছেন, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে। মালিকের পুঁজি ও উদ্যোক্তা-দক্ষতার মূল্য আছে, কিন্তু শ্রমিকের ঘাম ছাড়া সেই পুঁজি থেকে উৎপাদন ও মুনাফা আসে না। তাই মালিকদের উচিত শ্রমিকদের সঙ্গে বসা, তাদের কথা মন দিয়ে শোনা এবং পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজে বের করা। সরকারকে সেই আলোচনার পরিবেশ তৈরি করতে হবে এবং প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। শ্রমিকদেরও দায়িত্বশীল ও শান্তিপূর্ণ থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে, শ্রমিকের ঘামেই মালিকের সমৃদ্ধি, আর শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত হলেই শিল্পের ভিত শক্ত হবে। শ্রমিককে বঞ্চিত রেখে কোনো শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধি সম্ভব নয়।

চিররঞ্জন সরকার: লেখক ও কলামনিস্ট। ই-মেইল: chiros234@gmail.com