০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩

যাদের শ্রমে সমৃদ্ধি, তাদের জীবন কতটা নিরাপদ?

শ্রমিক রাজপথে নামলেই আমরা যানজট, ভাঙচুর আর উৎপাদন ক্ষতির হিসাব কষি; কিন্তু লাগামহীন বাজারে তাদের দৈনন্দিন অনিশ্চয়তা আর মানসিক ক্ষয়ের খবর কি রাখি?

যাদের শ্রমে সমৃদ্ধি, তাদের জীবন কতটা নিরাপদ?

কর্মক্ষেত্রের কঠিন শ্রম আর সংসারের তীব্র টানাপোড়েনের মাঝে সম্মানজনকভাবে বাঁচার নিশ্চয়তা চান নারী পোশাকশ্রমিকেরা; অধিকার আদায়ে শিল্পাঞ্চলে তাদের মিছিল।

মুশফিকা জাহান মুশফিকা জাহান

Published : 02 Nov 2026, 03:49 PM

Updated : 02 Nov 2026, 03:49 PM

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প লাখো মানুষের জীবিকার ভিত্তি এবং দেশের রপ্তানি আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। অথচ এই শিল্পের শ্রমিকদের মজুরি, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেই আলোচনার বড় অংশ আটকে যায় উৎপাদন বন্ধ, সড়কে যানজট আর সংঘর্ষের খবরে। শ্রমিকেরা কেন বারবার রাস্তায় নামছেন, তাদের আয় দিয়ে জীবনযাপনের ন্যূনতম প্রয়োজন মেটে কি না এবং সংকট এড়াতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো কী করতে পারত, সেই প্রশ্নগুলোও সমান গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে।

১ নভেম্বর ঢাকার মিরপুরে তৈরি পোশাকশ্রমিকেরা মাসে ন্যূনতম ৩০ হাজার টাকা মজুরির দাবিতে বিক্ষোভ করেন। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে ইটপাটকেল নিক্ষেপ, লাঠিপেটা ও কাঁদুনে গ্যাস ব্যবহারের খবর এসেছে। আগের দিন মিরপুর, আশুলিয়া ও গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় সড়ক অবরোধের কারণে বহু কারখানায় কাজ বন্ধ ছিল। একই দিনে সরকার নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দেয়। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বন্ধ বা ছুটি ঘোষণার কারখানার সংখ্যা ভিন্নভাবে এসেছে, তবে শিল্পাঞ্চলজুড়ে অস্থিরতার ব্যাপ্তি স্পষ্ট।

মজুরির অঙ্কের বাইরে জীবনের হিসাব

২০২৩ সালের নভেম্বরে তৈরি পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। এখন শ্রমিকদের একটি বড় অংশ ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবি তুলছেন। দাবির অঙ্ক নিয়ে আলোচনা হতে পারে, কিন্তু তার ভিত্তি হওয়া উচিত শ্রমিকের বাস্তব জীবনযাত্রার ব্যয়।

১ নভেম্বরের একটি সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে ১৮ বছর ধরে পোশাকশিল্পে কাজ করা এক শ্রমিকের কথা পড়লাম। অতিরিক্ত কাজসহ তার মাসিক আয় ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা; এর মধ্যে আট হাজার টাকা চলে যায় বাসাভাড়ায়। খাবার, যাতায়াত, চিকিৎসা ও সন্তানের পড়াশোনার জন্য অবশিষ্ট অর্থ কতটা যথেষ্ট, তা সহজেই বোঝা যায়।

ন্যূনতম মজুরি কাগজে লেখা একটি অঙ্কমাত্র নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে খাবারের মান, অসুস্থ হলে চিকিৎসা নেওয়ার সামর্থ্য, সন্তানের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া এবং ভবিষ্যতের জন্য সামান্য সঞ্চয়ের সুযোগ। মজুরি নির্ধারণে তাই শুধু উৎপাদন ব্যয় বা মালিকের সক্ষমতা নয়, বাসাভাড়া, খাদ্য, চিকিৎসা, যাতায়াত ও শিক্ষার ব্যয়ও বিবেচনায় নিতে হবে। শ্রমিকের আয় দিয়ে তার মৌলিক প্রয়োজন মেটে কি না, সেটি আলোচনার অন্যতম প্রধান মানদণ্ড হওয়া উচিত।

মানসিক সুস্থতা কাজের পরিবেশেরও প্রশ্ন

বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করতে গিয়ে আমার কাছে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে: মানসিক সুস্থতা শুধু ব্যক্তির মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে না; তিনি যে পরিবেশে কাজ করেন ও জীবনযাপন করেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, আর্থিক অনিশ্চয়তা, চাকরি হারানোর ভয়, কর্মক্ষেত্রে অসম্মান কিংবা অভিযোগ জানানোর নিরাপদ সুযোগ না থাকা মানুষের মানসিক সুস্থতাকে প্রভাবিত করতে পারে। মাস শেষে সংসার চলবে কি না, অসুস্থ হলে চিকিৎসা পাওয়া যাবে কি না, এমন দুশ্চিন্তা দীর্ঘস্থায়ী হলে তার প্রভাব পরিবার, ঘুম, মনোযোগ ও দৈনন্দিন জীবনেও পড়ে।

২০২৬ সালে ‘হেলথ সায়েন্স রিপোর্টস’ সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় সাভারের দুটি কারখানার ২৮১ জন পোশাকশ্রমিকের মানসিক স্বাস্থ্য মূল্যায়ন করা হয়। অংশগ্রহণকারীদের ৫৮.৭ শতাংশের মধ্যে বিষণ্নতার লক্ষণ, ৭৩.৬ শতাংশের মধ্যে উদ্বেগের লক্ষণ এবং ১৯.৯ শতাংশের মধ্যে মানসিক চাপের লক্ষণ পাওয়া যায়। নারী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে বিষণ্নতা ও উদ্বেগের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি ছিল। তবে গবেষণাটি দুটি কারখানার সীমিত নমুনার ওপর পরিচালিত; তাই ফলাফলকে দেশের সব পোশাকশ্রমিকের চিত্র হিসেবে ধরে নেওয়া যাবে না। তবু কর্মক্ষেত্রে মানসিক সুস্থতার প্রশ্নটি গুরুত্ব দিয়ে দেখার যথেষ্ট কারণ এটি দেয়।

এখানে একটি পার্থক্য জরুরি। প্রশিক্ষণ, কাউন্সেলিং ও মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা শ্রমিকদের কাজে লাগতে পারে। কিন্তু কম মজুরি, অনিরাপদ পরিবেশ, অতিরিক্ত কাজের চাপ ও চাকরির অনিশ্চয়তা অক্ষুণ্ন রেখে শুধু চাপ সামলানোর কৌশল শেখালে সমস্যার মূল কারণ অমীমাংসিত থেকে যায়। মানুষকে প্রতিকূলতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে সাহায্য করা দরকার, কিন্তু প্রতিকূলতাকে স্থায়ী রেখে সেই দায়িত্ব শুধু শ্রমিকের ওপর চাপানো যায় না।

নারী শ্রমিকের কাজ কারখানার গেটেই শেষ হয় না

পোশাকশিল্পে বিপুলসংখ্যক নারী কাজ করেন। তাদের অনেকের আয় পরিবারের খাদ্য, সন্তানের শিক্ষা ও দৈনন্দিন ব্যয়ের প্রধান অবলম্বন। কিন্তু কর্মক্ষেত্রের দায়িত্ব শেষে অনেক নারীকে ঘরের কাজ ও সন্তানের যত্নও সামলাতে হয়। এই বাড়তি দায়িত্বের জন্য আলাদা পারিশ্রমিক নেই, অথচ সময় ও শক্তি দুটোই ব্যয় হয়। ফলে বিশ্রাম, ব্যক্তিগত সময় কিংবা চিকিৎসার প্রয়োজন অনেক সময় পিছিয়ে যায়।

মজুরি ও নিরাপত্তার আলোচনায় তাই নারীদের বাস্তবতা আলাদা করে বিবেচনা করা দরকার। শিশুযত্নের ব্যবস্থা, নিরাপদ যাতায়াত, হয়রানির বিরুদ্ধে কার্যকর অভিযোগপ্রক্রিয়া এবং কর্মক্ষেত্রে মর্যাদাপূর্ণ আচরণ বাড়তি সুবিধা নয়; এগুলো দায়িত্বশীল কর্মপরিবেশের অংশ।

সংঘর্ষের দায় আছে, সংলাপেরও দায়িত্ব আছে

সাম্প্রতিক বিক্ষোভে সড়ক অবরোধ, ভাঙচুর ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে সাধারণ মানুষ দুর্ভোগে পড়েছেন, যান চলাচল ব্যাহত হয়েছে এবং কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়েছে। সহিংসতা বা সম্পদ নষ্ট করাকে গ্রহণযোগ্য বলা যায় না। অভিযোগ থাকলে নিরপেক্ষ তদন্ত ও জবাবদিহি প্রয়োজন। একই সঙ্গে শ্রমিকদের দাবি জানানোর অধিকারও স্বীকার করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার সময় বলপ্রয়োগ হতে হবে প্রয়োজনীয় ও আনুপাতিক, এবং মানুষের জীবন ও নিরাপত্তা রক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

বারবার সংঘর্ষের পর কারখানা বন্ধ, আশ্বাস এবং পরে আবার অস্থিরতা, কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। শ্রমিকেরা যদি মনে করেন তাদের কথা শোনার কার্যকর জায়গা নেই, অভিযোগ জানিয়ে ফল পাওয়া যায় না, কিংবা আলোচনার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয় না, তাহলে আস্থার সংকট আরও গভীর হয়। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা বাংলাদেশের শিল্পসম্পর্ক উন্নয়নে গঠনমূলক সংলাপ, শ্রমিকের অধিকার ও নিরাপদ কর্মপরিবেশের গুরুত্ব তুলে ধরেছে।

মজুরি বোর্ড গঠন একটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। তবে বোর্ডে শ্রমিকদের কার্যকর প্রতিনিধিত্ব, জীবনযাত্রার ব্যয়ের নির্ভরযোগ্য তথ্য, সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা এবং বাস্তবায়নের সময়সীমা না থাকলে শুধু বোর্ড গঠনেই প্রত্যাশিত ফল আসবে না। ১ নভেম্বর ঘোষিত ছয় সদস্যের বোর্ডে শ্রমিক প্রতিনিধি রাখা হয়েছে; এখন গুরুত্বপূর্ণ হলো তাদের অংশগ্রহণ কতটা অর্থবহ হয় এবং সিদ্ধান্ত কীভাবে বাস্তবায়িত হয়।

শিল্পের স্থিতিশীলতা শ্রমিকের নিরাপত্তা থেকে আলাদা নয়

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা হলে শ্রমিকের আয়, মালিকের উৎপাদন, ক্রেতার সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক এবং দেশের অর্থনীতি, সবই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কিন্তু শিল্পের স্থিতিশীলতা বলতে শুধু কারখানা খোলা রাখা বা নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করাকে বোঝালে চলবে না। শ্রমিকের জীবন যদি ক্রমাগত অনিশ্চিত থাকে, তাহলে অস্থিরতার কারণ উৎপাদনব্যবস্থার ভেতরেই থেকে যাবে।

সরকারের দায়িত্ব শ্রম আইন কার্যকর করা, শ্রমিকের অধিকার রক্ষা এবং মজুরি নির্ধারণের প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ রাখা। মালিকপক্ষের দায়িত্ব সময়মতো মজুরি ও অতিরিক্ত কাজের অর্থ পরিশোধ, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদেরও নিজেদের ভূমিকা বিবেচনা করতে হবে। পণ্যের দাম, সরবরাহের সময়সীমা ও ক্রয়সংক্রান্ত শর্ত এমন হওয়া প্রয়োজন, যাতে উৎপাদনের চাপ শেষ পর্যন্ত শ্রমিকের ওপর অসহনীয় বোঝা হয়ে না পড়ে।

কারখানা বন্ধ বা ছুটি ঘোষণার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে শ্রমিকের বেতন ও অন্যান্য পাওনা কীভাবে নিশ্চিত হবে, সেটিও স্পষ্ট থাকা দরকার। উৎপাদন বন্ধ হতে পারে, কিন্তু শ্রমিকের বাসাভাড়া, খাবার ও পরিবারের খরচ থেমে থাকে না।

এখন প্রয়োজন বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত

প্রথমত, মজুরি বোর্ডকে জীবনযাত্রার প্রকৃত ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে স্বচ্ছ ও সময়বদ্ধ প্রক্রিয়ায় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, শ্রমিক প্রতিনিধিদের আলোচনায় কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, কারখানায় অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা, হয়রানি প্রতিরোধ, স্বাস্থ্যসেবা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার সুযোগ বাড়াতে হবে। চতুর্থত, শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধ ও কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইন প্রয়োগে ধারাবাহিকতা থাকতে হবে। পঞ্চমত, শ্রমিক, মালিকপক্ষ ও সরকারের মধ্যে নিয়মিত সংলাপ চালু রাখতে হবে, যাতে সংকট তৈরি হওয়ার পরই কেবল আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া না হয়।

এসব পদক্ষেপ এক দিনে সব সমস্যার সমাধান করবে না। কিন্তু সমস্যার বাস্তব কারণগুলো স্বীকার করে দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া গেলে সংঘাতের পুনরাবৃত্তি কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।

একজন শ্রমিকের ন্যায্য মজুরির দাবি কেবল তার ব্যক্তিগত আয় বাড়ানোর প্রশ্ন নয়। এটি তার পরিবারের পুষ্টি, সন্তানের শিক্ষা, চিকিৎসা পাওয়ার সামর্থ্য, মানসিক সুস্থতা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করার সক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত। একইভাবে, একটি শিল্পের সাফল্যও শুধু রপ্তানি আয় বা উৎপাদনের পরিমাণ দিয়ে বিচার করা যায় না। সেই সাফল্যের পেছনে যারা শ্রম দেন, তাদের জীবন কতটা নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও স্থিতিশীল, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে।

শ্রমিকেরা রাস্তায় নামলে আমরা যানজট দেখি, কারখানা বন্ধ হলে উৎপাদনের ক্ষতি দেখি, সংঘর্ষ হলে আইনশৃঙ্খলার সংকট দেখি। কিন্তু এসব ঘটনার পেছনে জমে থাকা অনিশ্চয়তা, অভাব এবং আস্থার সংকটকেও দেখতে হবে। যাদের শ্রমে আমাদের অর্থনীতি সচল থাকে, তাদের জীবন যদি প্রতিদিন অনিশ্চয়তার মধ্যে চলে, তাহলে সেই অর্থনৈতিক অগ্রগতির সাফল্য কতটা পূর্ণ? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু শ্রমিকদের নয়। এর দায় রাষ্ট্র, মালিকপক্ষ, আন্তর্জাতিক ক্রেতা এবং আমাদের সবার।

মুশফিকা জাহান: মানসিক স্বাস্থ্য অধিকারকর্মী ও উন্নয়ন পেশাজীবী। ইমেইল: : memushfika@yahoo.com