ব্যর্থতাই কি সফলতার আসল চাবিকাঠি?
মনস্তত্ত্বের গবেষণায় উঠে এসেছে চমকপ্রদ তথ্য।
শৈশব থেকেই সমাজ ও পরিবারে বহুল প্রচলিত প্রবাদ প্রবচন শেখানো হয়— ‘একবার না পারিলে দেখ শতবার।’
প্রতিটি সফল মানুষের পেছনের গল্পে লুকিয়ে থাকে অসংখ্য বাধা আর ব্যর্থতার ইতিহাস। তবে সমসাময়িক তীব্র প্রতিযোগিতামূলক যুগে অনেকেই একটি মাত্র ব্যর্থতায় ভেঙে পড়েন, যা তাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথকে হয়ত বন্ধ করে দেয়।
চিকিৎসাবিজ্ঞান ও বিবর্তনীয় মনস্তত্ত্ব অবশ্য বলছে অন্য কথা। নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, জীবনের ব্যর্থতা এবং সফলতা আসলে একে অপরের পরিপূরক এবং একটি ছাড়া অন্যটির অস্তিত্ব অসম্ভব।
মনস্তাত্ত্ব-বিষয়ক ওয়েবসাইট ‘সাইকোলজি টুডে’-তে প্রকাশিত প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের ‘স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউ ইয়র্ক অ্যাট নিউ প্যাল্টজ’-এর মনস্তত্ত্বের অধ্যাপক ড. গ্লেন গেহের এই বিষয়ে, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন।
তার মতে, “আমাদের মনস্তাত্ত্বিক সহনশীলতা বা মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা মূলত ব্যর্থতার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই গড়ে ওঠে।”
বিবর্তনীয় দৃষ্টিকোণ ও সহনশীলতার বিজ্ঞান
বিবর্তনীয় মনস্তত্ত্বের মার্কিন গবেষক ডেভিড বাস সাম্প্রতিক গবেষণায়, মানুষের মনস্তাত্ত্বিক সহনশীলতাকে ত্বকের ‘কড়া’ বা কীলকের সঙ্গে তুলনা করেছেন।
মানুষ যখন নতুন টেনিস খেলা শুরু করে বা খালি পায়ে দীর্ঘ পথ হাঁটে, তখন প্রাথমিকভাবে তার হাত বা পায়ে ফোস্কা বা কড়া পড়ে। এই কড়াগুলো সাময়িকভাবে অস্বস্তিকর হলেও দীর্ঘমেয়াদে, ত্বককে আরও শক্ত ও সুরক্ষিত করে তোলে।
ঠিক একইভাবে, মার্কিন মনস্তত্ত্ববিদ গ্রেগ লুকিয়ানফ এবং জোনাথন হাইড তাদের যৌথ গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, শৈশব বা তরুণ বয়সে কাউকে যদি সমস্ত ধরনের প্রতিকূলতা ও ব্যর্থতা থেকে অতিরিক্ত আগলে বা আড়াল করে রাখা হয়, তবে দীর্ঘমেয়াদে তার মানসিক সহনশীলতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়।
ফলস্বরূপ, প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে ছোটখাটো আঘাত বা ব্যর্থতাও তাদের বড় ধরণের মানসিক বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেয়।
ড. গ্লেন গেহের এবং গবেষক নিকোল ওয়েডবার্গ-এর যৌথ বই ‘পজিটিভ ইভোল্যুশনারি সাইকোলজি’-তে একটি ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন— ‘জীবনে যার ব্যর্থতার সংখ্যা যত বেশি, ভবিষ্যতে তার বড় ধরনের সফলতার সম্ভাবনাও ততটাই জোরালো।’
গবেষণায় যা দেখা গেছে
এই হাইপোথিসিস বা তত্ত্বটি প্রমাণ করতে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষক মায়া কার্দাস এবং ড. গ্লেন গেহের যৌথভাবে প্রায় ২০০ জন প্রাপ্তবয়স্কের ওপর একটি সমীক্ষা পরিচালনা করেন।
যার ফলাফল ২০২৫ সালের জুন মাসে অনুষ্ঠিত ‘নর্থ-ইস্টার্ন ইভোল্যুশনারি সাইকোলজি সোসাইটি’র বার্ষিক সম্মেলনে বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের জীবনের প্রধান প্রধান সফলতার তালিকা এবং সেগুলোর মানসিক প্রভাব ‘রেটিং’ করতে বলা হয়। একই সঙ্গে তাদের জীবনের বড় বড় ব্যর্থতা এবং সেগুলোর প্রভাবও পরিমাপ করা হয়।
গবেষণার ফলাফল বিজ্ঞানীদের ধারণাকে পুরোপুরি সমর্থন করে।
সংখ্যাগত সমতা: যারা জীবনে বেশি সফলতার কথা উল্লেখ করেছেন, আশ্চর্যজনকভাবে তাদের জীবনের ব্যর্থতার সংখ্যাও ছিল বেশি।
অন্যদিকে, যাদের জীবনে সফলতার হার কম, তারা ব্যর্থতার মুখোমুখিও হয়েছেন খুব কম।
মানসিক প্রভাবের মিল: যারা সফলতাকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে খুব গভীরভাবে অনুভব করেছেন, তারা ব্যর্থতার আঘাতকেও সমান গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেছিলেন।
অর্থাৎ, ব্যর্থতার তীব্র আঘাতই মানুষকে সফলতার স্বাদ পাওয়ার জন্য মানসিকভাবে যোগ্য করে তোলে।
কর্মজীবনের প্রাথমিক ধাক্কা: ব্রিটিশ সাময়িকী ‘নেচার কমিউনিকেশনস’-এ প্রকাশিত আরেকটি সমসাময়িক গবেষণাতেও দেখা গেছে, কর্মজীবন বা চাকরির শুরুর দিকের বড় ধরনের ব্যর্থতা বা প্রত্যাখ্যান, একজন কর্মীকে দীর্ঘমেয়াদে আরও বেশি কর্মক্ষম এবং সফল করে তোলে।
ব্যর্থতাকে ভয় না পাওয়ার পরামর্শ
এই মনস্তত্ত্ববিদদের মতে- অফিসে প্রমোশন না পাওয়া, পরীক্ষায় আশানুরূপ ফল না করা, ব্যবসায় লোকসান বা ব্যক্তিগত সম্পর্কে ভুল বোঝাবুঝি, সবকিছুই মানসিক সহনশীলতা বৃদ্ধির বিবর্তনীয় প্রক্রিয়া।
ড. গ্লেন গেহেরের মতে, “ভুল বা ব্যর্থতার পর নিজেকে অনবরত দোষারোপ না করে, এটিকে শিক্ষার একটি অংশ হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। কারণ বিজ্ঞান বলছে, জীবনে সফলতার সিঁড়িটি আসলে ব্যর্থতার পাথর দিয়েই তৈরি হয়।”
