২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৪ কার্তিক ১৪৩৩

সঙ্গীর প্রতিটি কথায় বিরক্ত হওয়ার কারণ

সঙ্গীর সাধারণ কোনও কথা শুনলেও কি ভেতরে বিরক্তি কাজ করে? মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এর নাম ‘নেগেটিভ সেন্টিমেন্ট ওভাররাইড’।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 29 Oct 2026, 06:39 PM

Updated : 29 Oct 2026, 06:39 PM

দাম্পত্য বা প্রেমের সম্পর্কের শুরুতে, যার প্রতিটি কথা বা কাজকে মিষ্টি ও আকর্ষণীয় মনে হতো, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কি সেই চেনা মানুষের সাধারণ কোনও কথা বা সামান্য আচরণেও বিরক্তি বা জেদ তৈরি হচ্ছে?

সঙ্গী হয়ত খুব সাধারণ একটি প্রশ্ন করলেন, ‘আজ রাতের খাবারে কী রান্না হবে?’ বা ভালোবেসে বললেন, ‘তোমাকে আজ খুব সুন্দর দেখাচ্ছে।’ অথচ এই সাধারণ কথাগুলোও মনের ভেতর অনাকাঙ্ক্ষিত রাগ বা সন্দেহের জন্ম দিতে পারে।

এই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হলে অনেকেই মনে করেন সম্পর্কের ইতি ঘটেছে, যা একটি ভুল ধারণা। মনস্তত্ত্ব-বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি মূলত সম্পর্কের একটি জটিল তবে নিরাময়যোগ্য মানসিক অবস্থা।

মনস্তত্ত্ব-বিষয়ক ওয়েবসাইট ‘সাইকোলজি টুডে’-তে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে, ইসরায়েল-ভিত্তিক নিবন্ধিত পারিবারিক ও সম্পর্ক বিষয়ক প্রশিক্ষক এবং ‘দ্য রিম্যারেজ রোডম্যাপ’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ডা. আসায়েল রোমানেলি বলেন, “যখন একটি সম্পর্কের টানাপোড়েন দীর্ঘস্থায়ী হয়, তখন মস্তিষ্ক একে অপরের সমস্ত কথাকে নেতিবাচকভাবে পড়তে শুরু করে।”

‘নেগেটিভ সেন্টিমেন্ট ওভাররাইড’ বা ‘এনএসও’

মার্কিন মনস্তত্ত্ববিদ ও গবেষক ডা. জন গটম্যান এবং ডা. জুলি গটম্যান দাম্পত্য সম্পর্কের ওপর দীর্ঘকাল গবেষণা করে এই মানসিক অবস্থার নাম দিয়েছেন— ‘নেগেটিভ সেন্টিমেন্ট ওভাররাইড’ বা ‘এনএসও’।

ডা. আসায়েল রোমানেলির মতে, “যখন একটি সম্পর্কের রোমান্টিক বা ভালোবাসার আধার ধীরে ধীরে খালি হয়ে যায় এবং প্রশংসার চেয়ে অনবরত অভিযোগ বা অবহেলার পরিমাণ বৃদ্ধি পায়, তখন মানুষের চোখে এক ধরনের নেতিবাচক চশমা বা ফিল্টার বসে যায়। ফলে সঙ্গীর সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ বা ইতিবাচক কোনও কথা বললেও, মস্তিষ্ক সেটিকে নিজের সুরক্ষার স্বার্থে নেতিবাচক বা ক্ষতিকর হিসেবে ব্যাখ্যা করে।”

যেমন, সঙ্গী যখন বলেন, ‘আমি দুঃখিত’, তখন অন্য পক্ষের মনে হতে পারে— ‘সে নিশ্চিত কোনও দোষ লুকাতে এটি বলছে’।

এই মানসিক ফাঁদটি সাধারণত দুজনের মধ্যেই পারস্পরিকভাবে তৈরি হয় এবং সম্পর্ককে ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়।

মুক্তির ৩টি মনস্তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক পদক্ষেপ

ডা. আসায়েল রোমানেলি এবং গবেষক গালিত রোমানেলি, যুগলদের এই নেতিবাচক চক্র থেকে বের করে আনতে ৩টি কার্যকর পদক্ষেপের কথা জানান।

মানসিক চক্রটি চিহ্নিত করা

সবার আগে দুজনকে ঠাণ্ডা মাথায় বুঝতে হবে যে, তারা একটি পারস্পরিক ভুল বোঝাবুঝির চক্রে আটকে গেছেন।

যেমন— স্ত্রী বা সঙ্গীনি যখন মনে করেন স্বামী বা সঙ্গী দায়িত্বজ্ঞানহীন, তখন তার মনে ক্ষোভ ও একাকিত্ব জন্মায়। আর তিনি সরাসরি কথা না বলে বাঁকা বা খোঁটাযুক্ত প্রশ্ন ছুড়ে দেন।

অন্যদিকে, স্বামী বা সঙ্গী যখন দেখেন স্ত্রী বা সঙ্গীনি সবসময় তার পরীক্ষা নিচ্ছেন বা আগে থেকেই অসন্তুষ্ট হয়ে আছেন, তখন তিনি নিজেকে অসহায় মনে করেন এবং ক্ষিপ্ত হয়ে আত্মপক্ষ সমর্থন শুরু করেন।

এই মনস্তাত্ত্বিক আচরণগুলো কাগজে লিখে বা চিহ্নিত করে নিলে অবচেতন মন সতর্ক হতে শুরু করে।

নিজের ভেতরের নেতিবাচকতা স্বীকার করা

বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষ প্রায়ই সঙ্গীর আচরণকে প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি নেতিবাচক বলে বাড়িয়ে ধরে।

মার্কিন মনোবিদ ও সেক্স থেরাপিস্ট ডা. ডেভিড স্নাচ-এর বৈজ্ঞানিক গবেষণায় একে ‘স্বাভাবিক বৈবাহিক নিষ্ঠুরতা’ বলা হয়েছে, যেখানে অবচেতনভাবেই যুগলরা মাঝেমধ্যে সঙ্গীর সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে ফেলেন।

এর থেকে মুক্তির উপায় হল, নিজের ভুল বা নেতিবাচক আচরণটি সঙ্গে সঙ্গে বা পরে হলেও সঙ্গীর কাছে অকপটে স্বীকার করা।

যেমন, ‘গতকাল যখন আমি চোখ উল্টে তোমার কথার অবজ্ঞা করেছিলাম, তখন আমি সত্যিই মনে মনে তোমাকে ‘জাজ’ করছিলাম। আমি দুঃখিত।’

এই স্পষ্ট স্বীকারোক্তি সঙ্গীর মস্তিষ্ককে আসল অন্যায় এবং কাল্পনিক সন্দেহের মধ্যকার পার্থক্য বুঝতে সাহায্য করে।

একটি মজার ‘কোড ওয়ার্ড’ বা সংকেত ব্যবহার করা

তীব্র মানসিক উত্তেজনার সময় মস্তিষ্কের যুক্তিবাদী অংশ বা ‘প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স’ কাজ করা বন্ধ করে দেয়। ফলে বড় কোনও ভালো বাক্য বা বোঝাপড়া মনে থাকে না।

এই অবস্থায় রাগ বা ভুল বোঝাবুঝি তাৎক্ষণিক থামাতে দম্পতি বা যুগলরা নিজেদের মধ্যে দুটি সহজ ও মজার কোড ওয়ার্ড ঠিক করে নিতে পারেন।

যেমন— সঙ্গী যখন অতিরিক্ত অভিভাবকসুলভ আচরণ করবেন, তখন অন্য পক্ষ রেগে না গিয়ে শুধু একটি শব্দ বলতে পারেন (যেমন- ‘কিন্ডার’ বা ‘বুয়েনো’)। এই সংকেতটি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দুজনেরই উচিত হবে, কথা বলা বন্ধ করে গভীর শ্বাস নেওয়া এবং নিজের মানসিক অবস্থাকে শান্ত করার জন্য সামান্য বিরতি বা ‘টাইম-আউট’ নেওয়া।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সম্পর্কের মধ্যকার অনাকাঙ্ক্ষিত দেয়ালগুলো আসলে নিজ থেকে তৈরি হয় না; বরং দুজনের মনের ভেতর জমে থাকা পুরানো জমাটবদ্ধ নেতিবাচকতাগুলো সত্যকে দেখতে বাধা দেয়।

এই মনস্তাত্ত্বিক চশমা নিয়মিত পরিষ্কার করার মাধ্যমেই দাম্পত্য বা প্রেমের সম্পর্কে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও দীর্ঘস্থায়ী ভালোবাসা ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

পুরনো খবর:

সবসময় দোষ চাপানো সঙ্গীর সঙ্গে মোকাবিলা করবেন যেভাবে
সান্ত্বনা দিতে ‍গিয়ে সঙ্গীর মানসিক চাপ বাড়াচ্ছেন না তো?
সম্পর্কজনিত দুশ্চিন্তা নিয়ন্ত্রণের উপায়