জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে কেন এত রাগ হয়?
দাম দিয়ে কফি পান করতে মন খারাপ হয় না, অথচ তেলের খরচ বাড়লে ক্ষোভ জাগে। কারণটা ভেবে দেখেছেন কি কখনও?
তেলের দাম বাড়লে পকেটের চেয়ে মগজে আঘাত লাগে বেশি! তীব্র মানসিক যন্ত্রণা তৈরি রয়েছে নানান কারণ।
বিশ্বজুড়ে চলমান জীবনযাত্রার ব্যয়সংকট বা ‘কস্ট-অফ-লিভিং ক্রাইসিস’-এর প্রভাব বাজারের প্রতিটি পণ্যেই দৃশ্যমান। তবে একজন সাধারণ ক্রেতা বা চালক এই তীব্র মূল্যস্ফীতির ধাক্কা বেশি যেখানে অনুভব করেন, তা হল জ্বালানি তেলের পাম্পে।
সকালবেলা অফিসে যাওয়ার পথে গাড়িতে তেল নেওয়ার সময় পাম্পের নজেলটি তোলার পর স্ক্রিনের ডিজিটাল মিটারের সংখ্যাগুলো যখন অনবরত দ্রুত গতিতে ওপরের দিকে উঠতে থাকে, তখন পকেটের চেয়ে মানুষের অবচেতন মনে আঘাত লাগে বেশি।
ভোক্তা আচরণ বিশেষজ্ঞদের মতে, সমপরিমাণ টাকা অন্য যেকোনো বিলাসবহুল জিনিস বা রেস্তোরাঁর খাবারে খরচ করতে মানুষের যতটা না কষ্ট হয়, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি মানসিক যন্ত্রণা বা ‘স্ট্রেস’ তৈরি হয় পাম্পে গাড়ি লিটার মেপে ফুয়েল বা তেল নেওয়ার সময়।
সাইকোলজি টুডে ডটকম’য়ে প্রকাশিত, যুক্তরাজ্যের ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজারজাতকরণ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এবং ভোক্তা আচরণ-বিষয়ক গবেষক ডা. অ্যারন অ্যাটকিনসন-টোয়াল-এর এই বিষয়ক পর্যালোচনাগুলো এখানে দেওয়া হল।
একই সময়ে ভোগ ও অর্থপ্রদানের মনস্তাত্ত্বিক যন্ত্রণা
সাধারণত মানুষ যখন কোনও সেবা বা পণ্য ভোগ করে, ততক্ষণে সেই টাকা পরিশোধের স্মৃতি অবচেতন মন থেকে অনেকটাই আবছা হয়ে যায়।
যেমন, ক্যাফেতে কফি কিনে চুমুক দেওয়ার সময়, এর চমৎকার স্বাদে মগ্ন থাকে ক্রেতা। ফলে কফির দামের কথা তার মনে থাকে না। ওটিটি প্ল্যাটফর্মের সাবস্ক্রিপশন ফি প্রতি মাসে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বা অটোমেটেড উপায়ে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে কেটে নেওয়া হয়, সিনেমা দেখার সময় ক্রেতার মাথায় খরচের চিন্তা থাকে না।
তবে ১৯৯৮ সালে মার্কিন আচরণগত গবেষক প্রেলিস ও লোয়েনস্টাইন, এই মনস্তাত্ত্বিক কষ্টকে ‘পেইন অব পেয়িং’ বা অর্থপ্রদানের তীব্র যন্ত্রণা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
তাদের তত্ত্ব অনুযায়ী, এই মানসিক যন্ত্রণা তখনই শীর্ষে পৌঁছায়, যখন কোনও পণ্যের ভোগ এবং তার জন্য নগদ টাকা প্রদান একই সেকেন্ডে বা সময়ে চোখের সামনে ঘটতে থাকে।
ফুয়েল পাম্পে তেল সরাসরি গাড়ির ট্যাংকে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে টাকার অঙ্ক অনবরত লাফাতে থাকে, যা অবচেতন মনকে তীব্র আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি দাঁড় করায়।
‘ট্যাক্সি মিটার ইফেক্ট’
ভোক্তারা অবচেতন মনে এই দৃশ্যমান খরচের ট্র্যাকিং বা অনবরত টাকার সংখ্যা বেড়ে যাওয়া এতটাই ঘৃণা করেন যে, তারা এই মানসিক অস্বস্তি এড়াতে প্রয়োজনে বেশি টাকা খরচ করতেও রাজি থাকেন।
২০০৬ সালে বেলজিয়ামের গেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই গবেষক ল্যামব্রেখ্ট ও সকিয়েরা ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের আচরণ নিয়ে একটি গবেষণা চালান। যেখানে দেখা যায় ক্রেতারা সস্তা ‘পে-পার-ইউজ’ অফার ছেড়ে বেশি দামের ‘ফ্ল্যাট রেট’ বা আনলিমিটেড মাসিক প্যাকেজ বেছে নিচ্ছেন।
গবেষকেরা একে ‘ট্যাক্সি মিটার ইফেক্ট’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
ট্যাক্সির পেছনের সিটে বসে সামনের রানিং মিটারের সংখ্যা বাড়তে দেখলে যাত্রীর মনে যে তীব্র মনস্তাত্ত্বিক চাপ ও অস্বস্তি তৈরি হয়, পাম্পের তেলের মিটারের ক্ষেত্রেও ঠিক একই স্নায়বিক খেলা কাজ করে।
‘ফিক্সড’ বা ‘অলস রেট’ থাকলে মানুষ মানসিক শান্তি পায়। তবে প্রতি লিটারে টাকার দ্রুত বৃদ্ধি ভোক্তার মনে ক্ষোভের সৃষ্টি করে।
দাম বাড়া ও কমার ক্ষেত্রে চালকদের আচরণগত অসঙ্গতি
তেলের দাম যখন বৃদ্ধি পায়, তখন চালকদের মধ্যে এক ধরনের তীব্র আচরণগত পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়।
২০১১ সালে দুই মার্কিন গবেষক লুইস ও মার্ভেল, তেলের দাম তুলনা করতে গিয়ে একটি আন্তর্জাতিক ওয়েবসাইটের তথ্য পর্যালোচনা করে চমকপ্রদ তথ্য পান।
দেখা যায়, তেলের দাম যখন প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকে, তখন চালকেরা সামান্য কয়েক পয়সা বা টাকা বাঁচানোর জন্য বিভিন্ন অ্যাপস স্ক্রোল করেন এবং বেশি তেল পুড়িয়ে দূরবর্তী কোনও সস্তা পাম্পে গিয়ে লাইন ধরেন।
তবে মজার বিষয় হল, যখন তেলের দাম প্রাকৃতিকভাবেই কমতে শুরু করে, তখন এই ‘পেইন অব পেয়িং’-এর মানসিক তীব্রতা কমে যায় এবং চালকেরা তাদের কষ্টকর অনুসন্ধান বা অ্যাপস চেক করা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়ে নিজের বাড়ির কাছের চেনা সুবিধাজনক পাম্প থেকেই তেল নেওয়া শুরু করেন।
ভবিষ্যৎ মূল্যস্ফীতির কাল্পনিক প্রত্যাশা
জ্বালানি তেলের এই উচ্চমূল্য কেবল যাতায়াত খরচই বাড়ায় না, বরং এটি সামগ্রিক অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিকে আমূল বদলে দেয়।
২০২৬ সালে ‘ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব সান ফ্রান্সিসকো’র গবেষক সুং এবং কিম, ভোক্তা আচরণের ওপর করা একটি ‘মেটা-অ্যানালাইসিস’-এ দেখিয়েছেন যে, মানুষ যখনই তেলের দাম বাড়ার আশঙ্কা করে, তখন তার অবচেতন মন স্বয়ংক্রিয়ভাবে ধরে নেয় যে বাজারের চাল, ডাল, সবজিসহ অন্য প্রতিটি জিনিসের দামও একই সঙ্গে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়বে।
তবে অবাক করার মতো বিষয় হল, তেলের দাম কমলে কিন্তু মানুষের মনে অন্য জিনিসের দাম কমার এই ইতিবাচক প্রত্যাশা তৈরি হয় না।
গবেষকদের মতে, এই ক্ষতিকর প্রভাবটি সমাজের উচ্চবিত্তদের তুলনায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের পরিবারগুলোর স্নায়ু এবং মানসিক সুস্থতার ওপর অলক্ষ্যে নেতিবাচক চাপ সৃষ্টি করে।
