১১ অক্টোবর ২০২৬, ২৬ আশ্বিন ১৪৩৩

নজর এড়ানো কিছু বিষয় যেভাবে বাড়ায় মানসিক চাপ

নিজের হয়ত খেয়াল পড়ছে না, তবে শরীর ও মনে ঠিকই চাপ ফেলছে অদৃশ্য কিছু ‍বিষয়।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 11 Oct 2026, 04:54 PM

Updated : 11 Oct 2026, 04:54 PM

দৈনন্দিন প্রতিযোগিতামূলক জীবনে যখন মানসিক অবসাদ বা স্ট্রেসের কথা চিন্তা করে, তখন সাধারণত বড় কোনও ঘটনা— যেমন তীব্র আর্থিক সংকট, কর্মক্ষেত্রে বড় জটিলতা বা পারিবারিক কলহের কথাই মাথায় আসে।

তবে গবেষণায় দেখা গেছে, বড় কোনও ধাক্কা ছাড়াও জীবনে নীরবে ঘটে যাওয়া কিছু অদৃশ্য এবং ছোট ছোট ঘটনা মানসিক স্বাস্থ্যকে তিলে তিলে ধ্বংস করে চলেছে।

স্বাস্থ্য ও জীবনধারা বিষয়ক সাময়িকী ‘রিয়েল সিম্পল’-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন চিকিৎসক ডা. সোমা মন্ডল বলেন, “এই ধরনের অদৃশ্য মানসিক চাপগুলোকে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় ‘সাবটল স্ট্রেসর’ বা সূক্ষ্ম মানসিক চাপ বলা হয়।”

এই ছোট ছোট ঘটনাগুলো অবচেতনভাবেই শরীরে চাপের হরমোন ‘কর্টিসল’ ক্ষরণ অনবরত চালু রাখে, যা মানুষকে ‘ক্রনিক ফ্যাটিগ’ বা দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তির দিকে ঠেলে দেয়।

অসমাপ্ত ছোট কাজের তালিকা

চোখের সামনে টেবিলের ওপর পড়ে থাকা কোনও বিলের কাগজ, অনেকদিন ধরে দেব দেব করেও না দেওয়া কোনও ছোট ইমেইলের উত্তর বা ঘরের ড্রয়ারের একটি আলগা কব্জা ঠিক করার মতো ছোট ছোট কাজগুলো প্রায়ই অলসতার কারণে এড়িয়ে যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সি’তে জার্সি শোর ইউনিভার্সিটি মেডিকেল সেন্টার’-এর নারী স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক ডা. সোমা এই বিষয়ে ব্যাখ্যা করেন, “বাহ্যিকভাবে খুব সামান্য মনে হলেও, অবচেতন মন এগুলোকে একটি ‘অসম্পূর্ণ কাজ’ হিসেবে অনবরত ভেতরে ভেতরে ‘টোকা’ দিতে থাকে। মনস্তত্ত্বের ভাষায় একে ‘জেইগারনিক ইফেক্ট’ বলা হয়, যা মস্তিষ্কের এনার্জি বা শক্তি গোপনে শুষে নিতে থাকে।”

এর সমাধান হল, ৫ মিনিটের কম সময় লাগে এমন ছোট কাজগুলো ফেলে না রেখে সঙ্গে সঙ্গে শেষ করে ফেলা, যা মস্তিষ্ককে এক অদৃশ্য স্বস্তি দেয়।

ডিজিটাল অবহেলা ও অনবরত তথ্যের চাপ

ফোনে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন নিউজ পোর্টালের নোটিফিকেইশন, অপ্রয়োজনীয় মেসেজের ভাইব্রেশন বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অনবরত ‘স্ক্রোলিং’- মস্তিষ্ককে সার্বক্ষণিকভাবে একটি কাল্পনিক বিপদের মুখোমুখি থাকার মেজাজে রাখে।

এই অনবরত তথ্যের চাপ বা ‘ইনফরমেশন ওভারলোড’ স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্রকে শিথিল হতে দেয় না।

এর থেকে বাঁচতে বিশেষজ্ঞরা ‘ডিজিটাল বাউন্ডারি’ তৈরির পরামর্শ দেন।

ডা. সোমা বলেন, “বিশেষ করে রাতে ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে ফোন সম্পূর্ণ দূরে রাখা এবং কাজের সময় সুনির্দিষ্ট অ্যাপের নোটিফিকেইশন বন্ধ রাখলে কর্টিসল হরমোনের নিঃসরণ প্রাকৃতিকভাবেই অনেক কমে যায়।

অনিচ্ছাকৃত ‘হ্যাঁ’ বলার সামাজিক প্রবণতা

নিজের চরম ক্লান্তি বা অনিচ্ছা থাকার পরও কেবল ভদ্রতা রক্ষা করতে বা অন্যকে খুশি করার তাগিদে কোনও সামাজিক আমন্ত্রণ বা অতিরিক্ত কাজের দায়িত্বে ‘হ্যাঁ’ বলে দেওয়া মনের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করে।

ডা. সোমা ব্যাখ্যা করেন, “অবচেতন মন যখন নিজের চাহিদাকে অবহেলা করে অন্যের ইচ্ছা পূরণে লিপ্ত হয়, তখন ভেতরে এক ধরনের চাপা ক্ষোভ ও হতাশার জন্ম নেয়।”

তাই মানসিক দীর্ঘায়ু অর্জনের জন্য নিজের সীমানা নির্ধারণ করা জরুরি।

“বিনীতভাবে ‘না’ বলতে শেখা কোনও স্বার্থপরতা নয়, বরং এটি নিজের মানসিক স্বাস্থ্যকে সুরক্ষিত রাখার একটি কৌশল”, পরামর্শ দেন এই চিকিৎসক।

পরিবেশগত কোলাহল ও বিশৃঙ্খলা

ঘরের কোণে স্তূপ করে রাখা অগোছালো জামাকাপড়, কাজের টেবিলে ছড়ানো কাগজ বা ঘরের বাইরে থেকে অনবরত আসতে থাকা হালকা যান্ত্রিক শব্দ- চোখ ও কানের স্নায়ুগুলোকে অনবরত ব্যস্ত রাখে।

এই পারিপার্শ্বিক বিশৃঙ্খলা মনোযোগের ক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং অবচেতন মনে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি করে।

একই প্রতিবেদনে শিকাগো’র ‘ফোকাস কার্ডিওলজি’র প্রতিষ্ঠাতা ও নিবন্ধিত হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সোনাল চন্দ্র বলেন, “গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, প্রতিদিন সকালে মাত্র ১০ মিনিট সময় নিয়ে, নিজের চারপাশ পরিচ্ছন্ন ও গোছগাছ রাখলে মস্তিষ্কের চিন্তার জট খুলতে সাহায্য করে। আর শরীরের ‘প্যারাসিমপ্যাথেটিক স্নায়ুতন্ত্র’ যা বিশ্রামের সময় শক্তি সঞ্চয়ের পাশাপাশি দেহকে শান্ত রাখে, সেটা সক্রিয় হয়ে দিনটিকে শান্ত ও ফলপ্রসু করে।”

পুরানো খবর:

মাত্র ২ মিনিটের চর্চায় মস্তিষ্কে ফিরতে পারে প্রশান্তি
ভালো ঘুমের জন্য ব্যায়ামের সেরা ও সবচেয়ে খারাপ সময়
অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততায় মানসিক ক্লান্তি দূর করার উপায়