অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততার মানসিক ক্লান্তি দূর করার উপায়
সারাক্ষণ কাজের চাপ ও ডিজিটাল দুনিয়ায় বন্দি থেকে হাঁপিয়ে উঠলে, ‘ঘাস ছুঁয়ে দেখুন’।
আধুনিক পুঁজিবাদী সমাজ ও করপোরেট সংস্কৃতিতে মানুষকে অনবরত আরও বেশি উৎপাদনশীল বা ‘প্রোডাক্টিভ’ হওয়ার জন্য এক অদৃশ্য ইঁদুরদৌড়ে লিপ্ত রাখা হয়।
সারাদিন ল্যাপটপের স্ক্রিন, ই-মেইলের নোটিফিকেশন বা সোশ্যাল মিডিয়ায় ডুবে থেকে মানুষ এক ধরনের তীব্র ডিজিটাল ক্লান্তি ও মানসিক অবসাদে ভোগে। অনেকে এই ক্লান্তি কাটাতে আরও বেশি কাজ করা বা ছুটির দিনেও কাজে থাকার অবাস্তব চেষ্টা করেন, যা আসলে মানসিক ক্ষতিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
মনস্তত্ত্ব-বিষয়ক ওয়েবসাইট ‘সাইকোলজি টুডে’-তে প্রকাশিত প্রতিবেদনে মনোবিদরা জানান, অবচেতন মনের এই তীব্র জট ও ক্লান্তি কাটাতে কোনো অতিরিক্ত কাজ নয়, বরং সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় হয়ে প্রকৃতির কাছে ফিরে যাওয়া বা চিকিৎসা-বিজ্ঞানের ভাষায় ‘টাচ গ্রাস’ বা ঘাস ছোঁয়ার অভ্যাস করা জরুরি।
প্রকৃতির সান্নিধ্যে মানসিক স্বাস্থ্যের এই বৈজ্ঞানিক রূপান্তর এবং করপোরেট সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার নিবন্ধিত ‘ম্যারেজ অ্যান্ড ফ্যামিলি থেরাপিস্ট’ সোফি ল্যাজারাস বিশ্লেষণধর্মী মনস্তাত্ত্বিক পর্যালোচনা তুলে ধরেছেন।
তার মতে, “বর্তমান করপোরেট সমাজ মানুষের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে বিভিন্ন ঐতিহাসিক গাণিতিক সূত্রকে ভুলভাবে মনস্তাত্ত্বিক চাপ হিসেবে প্রয়োগ করছে।”
যেমন, ১৮০০ শতকে ইতালীয় দার্শনিক ও গণিতবিদ ভিলফ্রেডো প্যারেটো একটি অর্থনৈতিক সূত্র আবিষ্কার করেছিলেন, যা পরবর্তী সময়ে ‘প্যারেটো নীতি’ বা ‘৮০/২০ নিয়ম’ নামে পরিচিতি লাভ করে।
এই নিয়মের মূল কথা হল, ৮০ শতাংশ ফলাফল বা অর্জন আসে মাত্র ২০ শতাংশ সুনির্দিষ্ট প্রচেষ্টা থেকে।
আধুনিক কর্মক্ষেত্রের পরিচালকেরা এই সূত্রটিকে বিকৃত করে ভাবেন যে, কর্মীদের প্রতিদিনের শতভাগ সময়কেই যদি তীব্র উৎপাদনশীল করা যায়, তবে ফলাফল বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
এই অবাস্তব প্রত্যাশা এবং অনবরত ‘আরও ভালো করতে হবে’— এমন চিন্তা শরীরে স্ট্রেস বা চাপের হরমোন ‘কর্টিসল’-এর মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেয়, যা শরীরকে সর্বদা এক কাল্পনিক বিপদের মুখোমুখি থাকার লড়াই বা ‘ফ্লাইট-অর-ফাইট’ মেজাজে পরোক্ষভাবে সক্রিয় রাখে।
ইন্টারনেট সংস্কৃতির একটি সুপরিচিত মিম হল ‘গো টাচ গ্রাস’ বা ‘যাও ঘা ছুঁয়ে আস’, যা কাউকে স্ক্রিনের ভার্চুয়াল জগৎ ছেড়ে বাস্তব পৃথিবীতে ফিরে আসার ব্যঙ্গাত্মক পরামর্শ দিতে ব্যবহৃত হয়।
তবে থেরাপিস্ট সোফি ল্যাজারাস একে একটি শক্তিশালী চিকিৎসাগত প্রতিষেধক হিসেবে দেখিয়েছেন।
স্নায়ুবিজ্ঞান ও পরিবেশগত মনস্তত্ত্বের বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, প্রকৃতির মাঝে মাত্র ১০ থেকে ১৫ মিনিট সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় বা ‘কিছু না করে’ সময় কাটালে, শরীরের ‘প্যারাসিমপ্যাথেটিক’ স্নায়ুতন্ত্রকে দ্রুত সক্রিয় করে তোলে।
এটি রক্তচাপ স্বাভাবিক করতে, হৃদস্পন্দন কমাতে এবং অবচেতন মনের পুঞ্জীভূত বিষণ্ণতা দূর করতে সরাসরি সাহায্য করে।
সোফি ল্যাজারাস পরামর্শ দেন, “ছুটির দিনেও কাজ বা দক্ষতার উন্নয়নের পেছনে ব্যয় করার অবাস্তব সামাজিক চাপ বর্জন করতে হবে। সপ্তাহে অন্তত একদিন ফোনের সব নোটিফিকেইশন বন্ধ করে, কোনও সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য বা কাজের কথা চিন্তা করা ছাড়া প্রকৃতির বুকে অলস সময় কাটানোই হল মানসিক দীর্ঘায়ু অর্জনের এবং স্নায়ুতন্ত্রকে পুনরুজ্জীবিত করার কার্যকর কৌশল।”
