ঘরের ভেতরের যেসব জিনিস অলক্ষ্যে বাড়ায় মানসিক চাপ
বাইরে থেকে ফিরে ঘরে শান্তি পাচ্ছেন না? মনস্তত্ত্ববিদদের মতে, ঘরে থাকা সাধারণ জিনিসই মানসিক ক্লান্তি বাড়াতে পারে।
ঘর এমন একটি নিরাপদ আশ্রয়, যেখানে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের পেশিগুলো শিথিল হয়ে আসে এবং মানসিক ক্লান্তি দূর হয়।
তবে অনেক সময় দেখা যায়, দিনের পর দিন ঘরের ভেতরে থাকার পরও মন শান্ত হতে পারে না, বরং এক ধরনের অদৃশ্য অস্বস্তি ও উদ্বেগ তাড়া করে বেড়ায়।
স্বাস্থ্য ও জীবনধারা-বিষয়ক ওয়েবসাইট ‘রিয়েল সিম্পল’-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে মনোবিদরা জানান, ঘরে অবহেলায় রেখে দেওয়া খুব সাধারণ ৭টি জিনিস, অবচেতনে ‘স্ট্রেস’ বা মানসিক চাপের হরমোনের নিঃসরণ বাড়িয়ে দেয়। ফলে দেহ-মন পুরোপুরি শিথিল বা শান্ত হতে পারে না।
ফ্লোরিডার ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ডা. প্যাট্রিসিয়া ডিকসন এবং নিবন্ধিত মার্কিন থেরাপিস্ট নিক দেসিস্টো
-এর যৌথ মনস্তাত্ত্বিক ও আচরণগত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ঘরের ভেতর মানসিক চাপ সৃষ্টিকারী সেই ৭টি প্রধান জিনিসের বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:
বিশ্রামের জায়গায় কাজের জিনিসপত্র
শোবার ঘর বা ড্রইংরুমের সোফা হল, বিশ্রামের সুনির্দিষ্ট জায়গা। নিবন্ধিত মার্কিন থেরাপিস্ট নিক দেসিস্টোর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলেন, “এই স্থানগুলোতে ল্যাপটপ, অফিসের ফাইল বা পড়াশোনার ব্যাগ ফেলে রাখলে মস্তিষ্ক অবচেতনভাবেই অফিসের অমীমাংসিত দায়িত্ব ও কাজের চাপের কথা ভাবতে শুরু করে। ফলে শরীর বিশ্রামের মেজাজে যেতে পারে না।”
এই সমস্যা এড়াতে কাজ শেষে অফিসের জিনিসপত্র চোখের আড়ালে রাখার পরামর্শ দেন তিনি।
জমে থাকা চিঠি ও জরুরি কাগজপত্র
টেবিলের ওপর জমে থাকা বিভিন্ন বিলের কাগজ, ডকুমেণ্ট বা চিঠির স্তূপ মনে সার্বক্ষণিক একটি দীর্ঘসূত্রতার চাপ তৈরি করে। এগুলো দেখলেই মনে হয় কোনও জরুরি কাজ বা সিদ্ধান্ত নেওয়া এখনও বাকি রয়ে গেছে।
ফ্লোরিডার ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ডা. প্যাট্রিসিয়া ডিকসন একই প্রতিবেদনে বলেন, “এই মানসিক চাপ দূর করতে প্রতি সপ্তাহে বা মাসে একটি সুনির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করে সব ফাইল গুছিয়ে ফেলা এবং সেই অনুযায়ী আলাদাভাবে সাজিয়ে রাখা প্রয়োজন।”
ডিজিটাল যন্ত্রের অনবরত নোটিফিকেইশন
ফোনের অনবরত রিংটোন, মেসেজের শব্দ বা অ্যাপসের লাইট জ্বলে ওঠা মস্তিষ্ককে সার্বক্ষণিক একটি সতর্ক অবস্থায় রাখে। ফলে শরীর কখনই পুরোপুরি শিথিল হওয়ার সুযোগ পায় না।
ডা. ডিকসন বলেন, “রাতে ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে ফোনটি ‘ডু নট ডিস্টার্ব’ মোডে দেওয়া বা বিছানা থেকে দূরে রেখে চার্জ দেওয়া শরীরের স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত করতে অত্যন্ত সাহায্য করে।”
চোখের আড়ালের জমে থাকা ময়লা
অনেকেই ঘরের বড় বড় আসবাবপত্র বা মেঝে পরিষ্কার রাখলেও সোফার পেছনে, খাটের নিচে, দরজার হ্যান্ডেল কিংবা দেয়ালের কোণে জমে থাকা ধুলোবালি পরিষ্কার করতে ভুলে যান।
চাক্ষুষভাবে এগুলো সবসময় সামনে না আসলেও, অবচেতন মন কিন্তু খুব ভালো করেই জানে যে ঘরের ওই অংশগুলোতে ময়লা জমে আছে।
এই অদৃশ্য ময়লাও মানুষের মনে এক ধরনের সূক্ষ্ম অস্বস্তি তৈরি করে।
অতিরিক্ত আলো
ঘরের সিলিংয়ে থাকা একটিমাত্র তীব্র ও কড়া আলো কার্যকারিতার দিক থেকে ভালো মনে হলেও, সেটা মস্তিষ্ককে সারাক্ষণ উত্তেজিত রাখে।
ইন্টেরিয়র ডিজাইনার এবং চিকিৎসকদের মতে, রাতে ঘরের পরিবেশ শান্ত করতে তিন স্তরের লাইটিং ব্যবহার করা উচিত; যার মধ্যে টেবিল ল্যাম্প বা হালকা শেইডের আলো অন্যতম, যা শরীরে ঘুমের হরমোন ‘মেলাটোনিন’ নিঃসরণে সাহায্য করে।
অগোছালো জিনিসের স্তূপ
শোবার ঘরের চেয়ারে স্তূপ করে রাখা জামাকাপড়, টেবিলে ছড়ানো কাগজ বা রান্নাঘরের সিঙ্কে জমে থাকা এঁটো বাসন মস্তিষ্ককে সংকেত দেয় যে, সে জীবনের সব কাজে পিছিয়ে আছে এবং তার অনেক কাজ এখনও বাকি।
ডা. নিক দেসিস্টোর-এর মতে, “পুরো ঘর একবারে গোছানোর চাপ না নিয়ে প্রতিদিন মাত্র একটি সুনির্দিষ্ট পৃষ্ঠ বা টেবিল পরিষ্কার করার ছোট অভ্যাসই মানসিক স্বস্তির ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।”
বেডসাইড বা খাটের পাশের টেবিলের বিশৃঙ্খলা
শোবার ঘরের নাইটস্ট্যান্ড বা খাটের পাশের ছোট টেবিলটি হল, ঘুমের ঠিক আগের ও পরের প্রধান দৃশ্যপট।
সেখানে এক সপ্তাহ আগের পানির গ্লাস, ওষুধের প্যাকেট বা অপ্রয়োজনীয় কাগজ জমে থাকলে সকালের শুরুটাকেই মানসিকভাবে নোংরা ও অগোছালো করে তোলে।
তাই শান্ত ও পরিচ্ছন্ন ঘুমের পরিবেশ নিশ্চিত করতে এই অংশ সর্বদা খালি ও পরিপাটি রাখা জরুরি।
