বড় হয়েও শৈশবের আনন্দ কেন ভালো লাগে?
বয়স বাড়লেও লেগো দিয়ে খেলতে ভালো লাগে? ভেতরের শিশুকে বাঁচিয়ে রাখার এই সংস্কৃতির নাম ‘কিডাল্ট’।
১৮ বছর পার হওয়া একজন প্রাপ্তবয়স্কের উৎসবের উপহারের তালিকায় যদি লেগো সেট, হরেক রকম খেলনা, কমিকস বা রং-পেন্সিলের বাক্স থাকে, তাহলে অনেকেই তাকে ‘ছেলেমানুষ’ বলে উপহাস করে।
তবে আধুনিক সমাজবিজ্ঞান ও মনস্তত্ত্ব বলছে, এই খোলস ভেঙে বের হয়ে আসার সময় হয়েছে।
বয়স কাগজে-কলমে আর দৈহিকভাবে বাড়লেও মনের ভেতরের শৈশবকে বাঁচিয়ে রাখা এবং খেলনা বা গেমসের মাধ্যমে আনন্দ খোঁজার এই বৈশ্বিক জীবনধারার নাম ‘কিডাল্ট’। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে তীব্র কাজের চাপ ও করপোরেট একঘেয়েমি কাটাতে বহু প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ এই ‘কিডাল্টিং’ সংস্কৃতিকে আপন করে নিচ্ছেন।
জীবনধারা-বিষয়ক ওয়েবসাইট রিয়েল সিম্পল-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে মনস্তত্ত্ববিদেরা জানিয়েছেন, বর্তমানের জটিল ও কোলাহলপূর্ণ সময়ে কেন মানুষ নিজের ভেতরের শিশুকে নতুন করে আবিষ্কার করছে এবং এর ইতিবাচক মনস্তাত্ত্বিক দিকগুলো কী।
যুক্তরাষ্ট্রের জরিপ পরিচালনাকারী সংস্থা ‘হ্যারিস পোল’ মানুষের খেলার ছন্দের ওপর একটি বৈশ্বিক সমীক্ষা পরিচালনা করে। গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, প্রায় ৮০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ কোনও না কোনোভাবে শৈশবের বিনোদন বা খেলার সঙ্গে যুক্ত, যার মধ্যে জেন জি প্রজন্মের তরুণদের হার বেশি (প্রায় ৯৫ শতাংশ)।
বিশ্লেষণ-ধর্মী মার্কিন প্রতিষ্ঠান ‘সারকানা’র বাজার গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে বৈশ্বিক খেলনার বাজারে শিশুদের চেয়ে একা থাকা প্রাপ্তবয়স্কদের অংশীদারিত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে।
কেন জনপ্রিয় হচ্ছে ‘কিডাল্ট’ জীবনধারা?
মনোবিদেরা এই প্রবণতার নেপথ্যে ৪টি প্রধান বৈজ্ঞানিক কারণ উল্লেখ করেছেন।
মানসিক স্বস্তি ও উপস্থিতি: যুক্তরাষ্ট্রের নিবন্ধিত ফ্যামিলি থেরাপিস্ট ললি কোলম্যান বলেন, “বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মস্তিস্ক বাস্তব জীবনের নানান কঠিন অভিজ্ঞতা ও দায়িত্বের কারণে ভারী হয়ে ওঠে। ফলে শিশুরা যেভাবে কোনও চাপ ছাড়া বর্তমানে মগ্ন থাকতে পারে, বড়রা তা পারে না। শৈশবের কোনও শখ বা খেলনা নিয়ে বসার মাধ্যমে মস্তিস্ককে সেই পুরানো স্বাধীনতা ও আনন্দের কথা মনে করিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়, যা তাৎক্ষণিকভাবে করপোরেট মানসিক চাপ ও বিষণ্নতা বহুগুণ কমিয়ে দেয়।”
হ্যারিস পোলের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় অর্ধেক প্রাপ্তবয়স্ক মানসিক চাপ কমাতে ‘বার’ বা মদ্যপানের চেয়ে খেলনা বা ক্রাফটিং নিয়ে সময় কাটানোকে থেরাপির মতো কার্যকর বলে মনে করেন।
প্রযুক্তির ক্লান্তি ও নিরাপত্তার খোঁজ: বর্তমান সমাজ অনবরত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ‘এআই’, কম্পিউটার এবং মোবাইলের নোটিফিকেশনে আচ্ছন্ন। স্ক্রিন টাইমের এই একঘেয়েমি ও ‘ডুমস্ক্রোলিং’ (অনবরত খারাপ খবর পড়া) থেকে বাঁচতে মানুষ এনালগ বা হাতের কাজের দিকে ঝুঁকছে।
কাগজের প্রজেক্ট, লেগো ব্লক মেলানো বা রং করার মাধ্যমে মস্তিস্ক এক ধরনের নিরাপদ ও শান্ত নস্টালজিয়ায় ফিরে যায়, যা স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত করে।
আর্থিক প্রতিবন্ধকতা ও সামাজিক মাইলফলক বিলম্ব: সাম্প্রতিক এক অর্থনৈতিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, তীব্র মূল্যস্ফীতি ও আর্থিক সংকটের কারণে প্রায় তিন-চতুর্থাংশ জেন জি এবং অর্ধেকেরও বেশি মিলেনিয়ালসরা তাদের জীবনের বড় সামাজিক মাইলফলকগুলো (যেমন— নিজের বাড়ি কেনা, বিয়ে বা সন্তান নেওয়া) বিলম্ব করতে বাধ্য হচ্ছেন।
অনেকে মনে করছেন তারা হয়ত কখনই একটি বাড়ি কিনতে পারবেন না।
ফলে দীর্ঘমেয়াদী অবাস্তব লক্ষ্যগুলোর পেছনে টাকা না জমিয়ে, তারা বর্তমান সময়ে তাৎক্ষণিক আনন্দ দেয় এমন ছোটখাটো শখ বা খেলনার পেছনে খরচ করছেন, যাকে বলা হচ্ছে ‘ডুমস স্পেন্ডিং’।
ফলাফলহীন খাঁটি আনন্দ: প্রাপ্তবয়স্কদের প্রায় প্রতিটি কাজই কোনও না কোনও প্রতিযোগিতা, ফলাফল বা উৎপাদনশীলতার ওপর নির্ভরশীল।
ললি কোলম্যানের মতে, “কিডাল্টিং’ মানুষকে কোনও ধরনের ভালো করার বা জেতার তাগিদ ছাড়া স্রেফ নিষ্পাপ আনন্দ উপভোগ করার সুযোগ দেয়, যা মনকে নতুন করে চাঙা করতে সাহায্য করে।”
কখন এটি আসক্তি বা সমস্যা হতে পারে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, লেগো সেট মেলানো, টেডি বিয়ার জড়িয়ে ঘুমানো বা পোকেমন কার্ড সংগ্রহ করা কোনও মানসিক রোগ বা খামতি নয়; এটি সম্পূর্ণ সুস্থ একটি শখ।
তবে ললি কোলম্যান একটি সতর্কবার্তাও দিয়েছেন।
তার কথায়, “যদি এই শৈশবের শখ বা খেলনা কেনার আসক্তি দৈনিক বাজেটকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, আর ঘরের ভাড়া বা জরুরি বিল দিতে হিমশিম খান, বা এটি যদি পেশাগত ও পারিবারিক দায়িত্ব থেকে সম্পূর্ণ দূরে সরিয়ে দেয়, তবে বুঝতে হবে এটি একটি নেতিবাচক পলায়নীবাদ।”
যদি আশপাশের কেউ এই শখকে ‘বাচ্চামির’ বলে সমালোচনা করেন, তবে রেগে না গিয়ে থেরাপিস্টদের শেখানো এই চমৎকার কৌশলটি ব্যবহার করা যায়।
তাকে সরাসরি ও শান্তভাবে জিজ্ঞেস করুন: ‘এই কাজটি আমাকে আনন্দ দেয়। আপনাকে কোন জিনিসটি খাঁটি আনন্দ দেয়?’ এই প্রশ্নটি সমালোচনাকারীকে নিজের হারিয়ে যাওয়া শৈশবের শখের কথা মনে করিয়ে দিতে বাধ্য করবে।
তাই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অফিসের ডেস্কে একটি প্রিয় টেডি বিয়ার রাখা, দুপুরের খাবার অবসরে রঙিন বইয়ে রং করা বা ছুটির দিনে রোলার স্কেটিং করতে যাওয়া লজ্জার কিছু নয়; বরং এটি যান্ত্রিক পৃথিবীতে নিজের মানসিক সুস্থতা ও জীবনকে ভালোবাসার সুন্দর উপায়।
