১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

স্মৃতিকাতরতা যেভাবে মেজাজ ও সম্পর্ককে উন্নত করে

পুরানো স্মৃতি মনে করে বিষণ্ণতা ও একাকিত্ব দূর করার নিয়ম।

লাইফস্টাইল ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 24 Aug 2026, 06:27 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:53 PM

উৎসব-পার্বণ, ছুটির দিন বা বছরের বিশেষ কিছু সময়ে মনে পুরানো দিনের চেনা ঐতিহ্য, পরিচিত আবহ, প্রিয় খাবার এবং প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানো সোনালিদিনগুলোর কথা বারবার ভেসে ওঠে।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় অতীতের এই মধুর ও আবেগঘন স্মৃতিরোমন্থনকে বলা হয় ‘নস্টালজিয়া’ বা ‘স্মৃতিকাতরতা’।

বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকেও চিকিৎসকেরা নস্টালজিয়াকে এক ধরনের মানসিক ব্যাধি বা শারীরিক যন্ত্রণার কারণ মনে করতেন। পরে একে ডিপ্রেশন বা বিষণ্নতার একটি লক্ষণ ধরা হত।

তবে আধুনিক নিউরোসায়েন্স ও মনস্তত্ত্বের গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, নস্টালজিয়া আসলে কোনো রোগ নয়; বরং এটি মানুষের মন ভালো করার এবং আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর এক হাতিয়ার।

স্বাস্থ্য-বিষয়ক পোর্টাল ‘হেলথ’-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে গবেষকেরা জানিয়েছেন, অতীতে ঘটে যাওয়া আনন্দের স্মৃতিগুলো বর্তমান জীবনের তীব্র একাকিত্ব, দুশ্চিন্তা এবং মানসিক অবসাদ দূর করতে প্রাকৃতিকভাবে ওষুধের মতো কাজ করে।

যুক্তরাষ্ট্রের সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইক্রিয়াট্রি অ্যান্ড বিহেভিওরাল সায়েন্সেসের ক্লিনিক্যাল সহকারী অধ্যাপক ডা. ডাকারি কুইম্বি  এবং গবেষক শেরি গর্ডন নস্টালজিয়ার মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব এবং মেজাজ ভালো করার ৫টি নিয়ম সম্পর্কে  জানান। 

মস্তিস্কের ওপর নস্টালজিয়ার প্রভাব ও ডোপামিন নিঃসরণ

ডা. ডাকারি কুইম্বি বলেন, “মানুষ যখন অবচেতনে বা সচেতনভাবে জীবনের সুন্দর ও সফল কোনো মুহূর্তকে মনে করে, তখন মস্তিস্কের ‘রিওয়ার্ড সেন্টার’ তীব্রভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে।”

তিনি ব্যাখ্যা করেন, “বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে দেখেছেন, অতীতের সুখকর স্মৃতিগুলো মগজের নিউরনে ‘ডোপামিন’-এর মতো ভালোলাগার হরমোন বা অভ্যাসের রাসায়নিক উপাদান নিঃসরণ বাড়িয়ে দেয়।

এই ডোপামিন স্পাইক রক্তে ক্ষতিকর ‘স্ট্রেস’ হরমোন কমিয়ে মানসিক চাপ শান্ত করে এবং মনে একটি গভীর তৃপ্তি ও নিরাপত্তার অনুভূতি তৈরি করে।”

মেজাজ ভালো করতে নস্টালজিয়া ব্যবহারের ৫টি নিয়ম

মানসিক অবসাদ দূর করতে এবং সামাজিক সম্পর্ক আরও মজবুত করতে এই বিশেষজ্ঞ ৫টি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

স্মৃতিতে নজর দিলেও বর্তমান মুহূর্তে বাস করা

অতীতের সুন্দর সময়কে মনে করা ভালো, তবে সারাক্ষণ অতীতের খাঁচায় বন্দি থাকা ভুল অভ্যাস। অতিরিক্ত স্মৃতিকাতরতা মনে বর্তমান নিয়ে অসন্তোষ, উদ্বেগ ও হতাশা তৈরি করতে পারে।

এর বৈজ্ঞানিক নিয়ম হল, অতীতের সুন্দর অনুভূতিগুলোকে শক্তি হিসেবে গ্রহণ করে বর্তমান কাজের মধ্যে তাকে রূপান্তর করা।

স্মৃতির ডায়েরি বা জার্নাল লেখা

চীনের সান ইয়াত-সেন ইউনিভার্সিটি’র করা গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ যখন তার জীবনের চমৎকার ও আনন্দময় পুরানো ঘটনাগুলো ডায়েরিতে নিজের হাতে লেখে, তখন অবচেতনে মনে হয় ‘সে একা নয়’ এবং তার পেছনে মানুষের ভালোবাসা রয়েছে।

এই অভ্যাস মানুষের তীব্র সামাজিক একাকিত্ব ও নিঃসঙ্গতা দূর করতে দারুণ কার্যকর।

কৃতজ্ঞতাবোধ ও আশাবাদের চর্চা

যদি অতীতে কোনো প্রিয়জনকে হারানোর শোকার্ত স্মৃতি বা বিষাদময় অভিজ্ঞতা থাকে, তবে নস্টালজিয়া কিছুটা যন্ত্রণাদায়ক হতে পারে।

এর প্রতিকারে দুঃখের পরিবর্তে, ‘তিনি জীবনে এসেছিলেন এবং সুন্দর কিছু সময় উপহার দিয়েছিলেন’, সেই সত্যের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা এবং ভবিষ্যতের প্রতি আশাবাদী হওয়ার অভ্যাস গড়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

পুরনো ঐতিহ্যকে পুনরুজ্জীবিত করা

নস্টালজিয়ার আবেগকে একা একা বুকে চেপে না রেখে, সামাজিকভাবে ‘শেয়ার’ করা উপকারী।

শৈশবে বন্ধুদের সঙ্গে করা কোনো খেলা, বিশেষ কোনো রান্না বা আত্মীয়দের সঙ্গে কাটানো পুনর্মিলনীর স্মৃতিগুলোকে নতুন করে বর্তমানে বন্ধুদের আমন্ত্রণ জানিয়ে আবার আয়োজন করা উচিত।

এটি পারস্পরিক সামাজিক সংযোগ বা ‘সোশ্যাল বন্ডিং’ বাড়িয়ে দেয়।

নিজের আসল স্বত্বা বা সততা খুঁজে নেওয়া

ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে প্রমাণিত হয়েছে যে, মানুষ যখন নস্টালজিক হয়, তখন সে তার অতীতের চরিত্রকে অনেক বেশি সৎ ও আসল হিসেবে দেখতে পায়।

বর্তমান জীবনের নানান কৃত্রিমতা ও অন্যকে খুশি করার ক্ষতিকর বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্ত হয়ে নিজের আসল পরিচয়কে ভালোবাসতে নস্টালজিয়া যেন এক মনস্তাত্ত্বিক বর্ম।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

নস্টালজিয়া মস্তিস্ককে এক ইতিবাচক শক্তি প্রদানের মাধ্যমে জীবনের কঠিন পরিস্থিতিতেও নতুন করে অর্থ খুঁজে পেতে সাহায্য করে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেই? মানসিক চাপ ও অস্থিরতা কমাতে যা করবেন

বসের ওপর রাগ উঠেছে করবেন এবার কী?

সাময়িক মন খারাপ নাকি বিষণ্নতা- যেভাবে বুঝবেন