Published : 23 Aug 2026, 01:53 PM
ব্যক্তিগত জীবন, কর্মক্ষেত্রের গুরুদায়িত্ব কিংবা আকস্মিক কোনো পারিবারিক সংকটের মুখে অনেক সময়ই মনে হয়, চারপাশের পরিস্থিতি একদম নিয়ন্ত্রণে নেই।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় এই তীব্র অসহায়ত্ব ও মানসিক অচল অবস্থাকে বলা হয় ‘কগনিটিভ ওভারলোড’ বা মানসিক অবসাদ।
যখন কোনো মানুষের অবচেতনে এই ধারণা কাজ করে যে, সে তার চারপাশের ঘটনাগুলো পরিবর্তন করতে পারছে না, তখন মস্তিস্ক ও স্নায়ুতন্ত্র চরম আতঙ্কের মুখোমুখি হয়।
সাধারণ মানুষ অনেক সময় এই পরিস্থিতিতে আরও বেশি তাড়াহুড়ো বা ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন, যা মানসিক চাপকে পুঞ্জীভূত করে তোলে।
যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের মনোরোগ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. কার্লিন ম্যাককিনন এবং আচরণগত বিজ্ঞানী ডা. এলিজাবেথ স্কট এই অবাধ্য পরিস্থিতি শান্ত করার ৪টি বৈজ্ঞানিক নিয়ম বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।
মস্তিস্কের ‘ফাইট-অর-ফ্লাইট’ মেজাজ শান্ত করা
ডা. কার্লিন ম্যাককিনন স্বাস্থ্য-বিষয়ক ওয়েবসাইট ‘হেলথ ডটকম’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে ব্যাখ্যা করেছেন যে, পরিস্থিতি যখন হাতের বাইরে চলে যায়, তখন মস্তিস্কের ‘অ্যামিগডালা’ নামক অংশটি শরীরকে এক অদৃশ্য হুমকির সংকেত পাঠায়। ফলে রক্তে স্ট্রেস হরমোন ‘কোর্টিসল’ ও ‘অ্যাড্রেনালিন’ মারাত্মকভাবে স্পাইক করে বা বাড়ে, যা রক্তনালী সংকুচিত করে হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দেয়।
সমাধান: এই অবস্থা থেকে রেহাই পেতে, চিকিৎসকদের সেরা পছন্দ হলো ‘৪-৭-৮’ ব্রেথওয়ার্ক বা শ্বাসের ব্যায়াম। ৪ সেকেন্ড নাক দিয়ে শ্বাস নিয়ে, ৭ সেকেন্ড তা ভেতরে আটকে রেখে, ৮ সেকেন্ড ধরে মুখ দিয়ে ধীরে ধীরে বাতাস বের করে দিলে, স্বয়ংক্রিয়ভাবে মস্তিস্কের ‘প্যারাসিমপ্যাথেটিক’ স্নায়ুতন্ত্রকে সচল করে। আর হৃদস্পন্দন স্বাভাবিক মাত্রায় নামিয়ে আনে।
নিয়ন্ত্রণের বৃত্ত সনাক্ত করা
আচরণগত বিজ্ঞানী ডা. এলিজাবেথ স্কট, তার ‘দ্য স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট গাইড’ গবেষণাপত্রে দেখিয়েছেন, মানুষ যখন এমন বিষয় নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা করে যা তার নিয়ন্ত্রণে নেই (যেমন: অন্যের আচরণ বা ভবিষ্যৎ), তখন মানসিক অবসাদ বা ‘বার্নআউট’ তৈরি হয়।
সমাধান: পরিস্থিতি জটিল হলে একটি ডায়েরি নিয়ে দুটি কলাম তৈরি করা বৈজ্ঞানিক নিয়ম। একপাশে লিখতে হবে ‘যা আমার নিয়ন্ত্রণে নেই’ এবং অন্যপাশে লিখতে হবে ‘এই মুহূর্তে আমি নিজে যা করতে পারি’।
এই বিভাজন মস্তিস্কের ‘ফ্রন্টাল কর্টেক্স’ (মগজের সামনের অংশ যা- চিন্তা করা, পরিকল্পনা তৈরি করা, সিদ্ধান্ত নেওয়া, আবেগ নিয়ন্ত্রণ করা এবং কোনো কাজের ভালো-মন্দ বিচার করার মতো জটিল কাজগুলো চালায়) সক্রিয় করে অযথা চিন্তা করা বন্ধ করে দেয়।
খাবারের দিকে নজর
তীব্র মানসিক চাপের সময় মানুষের পরিপাকতন্ত্র এবং ‘গাট-ব্রেন এক্সিস’ মানে মস্তিষ্কের সঙ্গে অন্ত্রের যোগাযোগ, ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে অনেকেই জাঙ্ক ফুড বা অতিরিক্ত চিনিযুক্ত কফি পান শুরু করেন।
সমাধান: ডা. স্কটের মতে, “চাপের মুখে ক্যাফিন বা প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণ করলে, রক্তে ইনসুলিনের ভারসাম্য নষ্ট করে অলসতা ও বিষণ্ণতা আরও বাড়িয়ে দেয়।
প্রতিকারে সুষম প্রোটিন ও আঁশ সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া উচিত। আর স্নায়ুর অভ্যন্তরীণ দূষণ দূর করতে এবং কোষের সতেজতা ধরে রাখতে সারাদিনে পর্যাপ্ত পরিমাণ বিশুদ্ধ পানি পান করা আবশ্যক।
ডিজিটাল ডিটক্স ও ‘ব্রেন পজ’
যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের স্নায়ুবিজ্ঞানীদের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, পরিস্থিতি খারাপ হলে মানুষ যখন অনবরত মোবাইল স্ক্রিনে নেতিবাচক খবর বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম দেখতে থাকেন, তখন মস্তিস্কের ‘কগনিটিভ রিজার্ভ’ বা স্বাভাবিক চিন্তা করার প্রক্রিয়া পুরোপুরি অবশ হয়ে যায়।
সমাধান: তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে অন্তত ২ ঘণ্টার জন্য সমস্ত ডিজিটাল যন্ত্র থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকা বা ডিজিটাল ডিটক্স করা উপকারী।
প্রকৃতির মাঝে সামান্য হাঁটাচলা করলে মস্তিস্কে আনন্দের হরমোন ডোপামিন ও এন্ডোরফিন নিঃসরণ বাড়িয়ে দেয়।
পরামর্শ
পরিস্থিতি হাতের বাইরে যাওয়া মানেই জীবন শেষ হয়ে যাওয়া নয়; এটি মূলত মস্তিস্ককে সামান্য বিরতি বা ‘ব্রেন পজ’ দেওয়ার একটি প্রাকৃতিক সংকেত।
‘আমেরিকান অ্যাকাডেমি অফ ডার্মাটোলজি অ্যান্ড মেন্টাল হেল্থ’-এর বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি দেখা যায় দীর্ঘ সময় ধরে অনবরত তীব্র প্যানিক অ্যাটাক বা আতঙ্ক জাগছে, অনিদ্রা বা একা একা ছটফট করার মতো লক্ষণ প্রকাশ পাচ্ছে, তবে ঘরে বসে অবহেলা না করে অবিলম্বে একজন নিবন্ধিত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টের পেশাদার নির্দেশনা নেওয়াই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
আরও পড়ুন