১৫ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩

দীর্ঘমেয়াদে দিনের বেলায় ক্লান্তিবোধ মোটেই ভালো লক্ষণ নয়

সারাদিন অলসতা আর ঝিমুনি কি কেবলই ঘুমের অভাব, নাকি শরীরের ভেতর লুকিয়ে আছে কোনও রোগ?

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 15 Oct 2026, 12:24 PM

Updated : 15 Oct 2026, 12:23 PM

আধুনিক গতিশীল জীবনযাত্রায় দিনের বেলায় অনবরত ক্লান্তি, অলসতা বা ঝিমুনি অনুভব করা যেন সাধারণ সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অনেকেই রাতে দীর্ঘ সময় বিছানায় কাটানোর পরেও সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে চরম ক্লান্তি বা ‘এক্সট্রিম ফ্যাটিগ’ অনুভব করেন। দৈনন্দিন এই ক্লান্তিকে শুধুই অলসতা বা কাজের চাপ ভেবে অবহেলা করা বিপজ্জনক।

এই বিষয়ে স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা বিজ্ঞান-বিষয়ক ওয়েবসাইট ‘হেলথ’-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দিনের বেলার এই তীব্র অবসাদ কোনও একক কারণে ঘটে না; বরং এর পেছনে লুকিয়ে থাকতে পারে দেহের অভ্যন্তরীণ দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ, অনিদ্রা বা নিদ্রাহীনতা কিংবা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার এক জটিল মনস্তাত্ত্বিক ও স্নায়বিক বৈকল্য।

প্রদাহের সঙ্গে ক্লান্তির সম্পর্ক

দিনের বেলার তীব্র ক্লান্তির অদৃশ্য কারণ হতে পারে শরীরের ভেতরের ‘ক্রনিক ইনফ্লামেইশন’ বা দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ।

এই বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কানেকটিকাট-এ অবস্থিত ‘ব্রিজপোর্ট হসপিটাল’-এর ঘুম-বিষয়ক চিকিৎসক জুবিন ভাম বলেন, “যখন কোনও ব্যক্তি দীর্ঘমেয়াদী মানসিক চাপ, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস বা কোনও সুপ্ত সংক্রমণের মধ্য দিয়ে যান, তখন শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনবরত ‘সাইটোকাইনস’ নামক প্রদাহজনিত প্রোটিন নিঃসৃত করতে থাকে। এই উচ্চমাত্রা সরাসরি মস্তিষ্কের ভাষা ও সংকেত আদান-প্রদান প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে এক ধরনের কুয়াশা বা ‘ব্রেইন ফগ’ তৈরি করে।”

তিনি আরও বলেন, “পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে যে, এই অভ্যন্তরীণ প্রদাহ শরীরের কোষের শক্তি উৎপাদন কেন্দ্র ‘মাইটোকন্ড্রিয়া’র কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়। ফলে পর্যাপ্ত খাবার খাওয়ার পরেও শরীর প্রয়োজনীয় শক্তি পায় না এবং তীব্র অবসাদ জাঁকিয়ে বসে।”

নিদ্রাহীনতা ও ঘুমের ঘাটতি

দিনের বেলার ঝিমুনির একটি কারণ হল নিদ্রাহীনতা বা অপর্যাপ্ত ঘুম। অ

নবরত ল্যাপটপ বা ফোনের স্ক্রিনের নীল আলোর কারণে শরীরে ঘুমের হরমোন ‘মেলাটোনিন’ প্রাকৃতিকভাবেই বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে সময়মতো বিছানায় গেলেও শরীর তার প্রয়োজনীয় গভীর ঘুম বা ‘রেস্টোরেটিভ স্লিপ’-এর স্তরে পৌঁছাতে পারে না।

ডা. ভাম বলেন, “এই অবহেলায় তৈরি হওয়া ঘুমের ঘাটতি দিনের বেলায় স্নায়ুতন্ত্রকে সম্পূর্ণরূপে ক্লান্ত করে ফেলে। ঘুমের অভাবের কারণে শরীরে স্ট্রেস হরমোন ‘কর্টিসল’ এবং ‘অ্যাড্রেনালিন’-এর মাত্রা সবসময় উচ্চ স্তরে থাকে, যা খিটখিটে, উদাসীন এবং দীর্ঘমেয়াদে ক্লান্তির দিকে ঠেলে দেয়।”

দীর্ঘমেয়াদি অবসাদ বনাম সাধারণ ক্লান্তি

মার্কিন প্রতিষ্ঠান মায়ো ক্লিনিকের ‘স্লিপ মেডিসিন’ বিশেষজ্ঞ ডা. ইয়াসমিন টাশামান, এই বিষয়ে সতর্ক করে বলেন, “সাধারণ ক্লান্তি সাধারণত কয়েক দিন বিশ্রাম নিলে বা ভালো ঘুম হলে দূর হয়ে যায়। তবে এই ক্লান্তি বা শক্তির স্বল্পতা যদি টানা ছয় মাস বা তার বেশি সময় ধরে চলতে থাকে এবং বিশ্রাম নেওয়ার পরেও কোনও উন্নতি না হয়, তবে সেটা ‘ক্রনিক ফ্যাটিগ সিনড্রোম’-এর লক্ষণ হতে পারে।”

এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হল- সামান্য শারীরিক বা মানসিক পরিশ্রমে শরীর একদম ভেঙে পড়া, পেশি ও হাড়ের জোড়ে অনবরত আড়ষ্টতা বা ব্যথা থাকা এবং মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা তীব্রভাবে কমে যাওয়া।

এই জটিলতায় শরীরের স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্র সব সময় উত্তেজিত বা ‘ফ্লাইট-অর-ফাইট’ মোডে থাকে, যা দৈনন্দিন জীবনের উৎপাদনশীলতাকে বাধাগ্রস্ত করে।

দিনের বেলার ক্লান্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কৌশল

এই অদৃশ্য স্বাস্থ্যসংকট থেকে শরীরকে পুনরুজ্জীবিত করতে চিকিৎসকেরা ৩টি নিয়ম অনুসরণের পরামর্শ দেন।

ডিজিটাল সীমা নির্ধারণ ও ঘুমের শৃঙ্খলা: প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে ফোন ‘সাইলেন্ট’ করে অন্য ঘরে রেখে আসতে হবে। প্রতিদিন একটি সুনির্দিষ্ট সময়ে বিছানায় যাওয়া এবং অন্তত ৭ থেকে ৮ ঘণ্টার নিরবচ্ছিন্ন ঘুম নিশ্চিত করা স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত করতে জাদুকরী ওষুধের মতো কাজ করে।

প্রদাহরোধী সুষম খাদ্যাভ্যাস ও পানি: অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার, অতিরিক্ত তেল-মসলা ও চিনি বর্জন করতে হবে। খাদ্যে পর্যাপ্ত উদ্ভিজ্জ প্রোটিন, সবুজ শাকসবজি, ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ বাদাম এবং ভিটামিন ‘বি’ এবং ‘ডি’ নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া পানিশূন্যতা এড়াতে সারা দিনে পর্যাপ্ত পানি পান করা বাধ্যতামূলক।

নিয়মিত পরিমিত শারীরিক পরিশ্রম: শরীর ক্লান্ত থাকলে অনেকেই ব্যায়াম বন্ধ করে দেন, যা ভুল। প্রতিদিন মাত্র ১৫ থেকে ২০ মিনিট খোলা বাতাসে হালকা হাঁটাচলা বা ‘স্ট্রেচিং’ করলে রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা বাড়িয়ে ‘এন্ডোরফিনস’ হরমোন নিঃসৃত করে, যা শরীরকে প্রাকৃতিকভাবেই চাঙা ও চনমনে রাখতে সাহায্য করে।

পুরানো খবর:

কর্মক্ষেত্রে কাজে মন বসছে না? হতে পারে ভুগছেন কর্মবিমুখতায়
অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততায় মানসিক ক্লান্তি দূর করার উপায়
রাতের খাবারের পর ৩ অভ্যাসে দূরে থাকবে মানসিক চাপ ও ক্লান্তি
নির্ঘুম রাতের সমাধান