ভালো ঘুমের জন্য ব্যায়ামের সেরা ও সবচেয়ে খারাপ সময়
সবার শরীরের ছন্দ এক রকম নয়। কেউ ভোরে চনমনে থাকেন, কেউ আবার রাতে বেশি সক্রিয়।
শরীরচর্চা যে শুধু শরীর ভালো রাখে তা নয়, ঘুমের গুণগত মান বাড়াতেও এর ভূমিকা আছে।
নিয়মিত ব্যায়াম মানসিক চাপ কমায়, শরীরকে স্বাভাবিক ছন্দে রাখে এবং ঘুম-জাগরণের জৈবিক চক্রকে সঠিকভাবে পরিচালনা করতেও সাহায্য করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক সময়ে করা ব্যায়াম ঘুম আসতে সময় কমায় এবং রাতের ঘুমকে গভীর ও আরামদায়ক করে।
তবে ভুল সময়ে বা অতিরিক্ত তীব্র কোন ব্যায়াম করলে আবার উল্টো ঘুমে ব্যাঘাত ঘটতে পারে।
ব্যায়াম যেভাবে ঘুমে সহায়তা করে
ঘুমবিজ্ঞান-বিষয়ক মার্কিন পরামর্শক কার্লিয়ারা ওয়েইস রিয়েলসিম্পল ডটকম’য়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলেন, “ব্যায়ামের সময় শরীরে এমন কিছু হরমোন নিঃসৃত হয় যা দুশ্চিন্তা ও উদ্বেগ কমায়। এতে শরীর ধীরে ধীরে শিথিল হয় এবং ঘুমের জন্য প্রস্তুত হয়।”
একই সঙ্গে ব্যায়াম শরীরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ হরমোন তৈরিতে সাহায্য করে, যা পরে ঘুমের হরমোনে রূপ নেয়। ফলে শরীর বুঝে নেয় কখন জাগতে হবে আর কখন বিশ্রাম নিতে হবে।
শরীরের তাপমাত্রা ও ঘুমের সংকেত
ব্যায়ামের সময় পেশিতে রক্তপ্রবাহ বাড়ে। ফলে শরীরের ভেতরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক ভাবেই কিছুটা বেড়ে যায়। পরে যখন এই তাপমাত্রা ধীরে ধীরে কমে আসে, তখন মস্তিষ্ক বিশ্রামের সংকেত পায়।
এই প্রক্রিয়াতে ঘুম আসতে সহায়তা করে।
ওয়েইস বলেন, “দিনের শুরু বা মাঝামাঝি সময়ে এই তাপমাত্রার ওঠানামা ঘুমের জন্য বেশি উপকারী।”
ঘুমের জন্য ব্যায়ামের সেরা সময়
যুক্তরাষ্ট্রের ‘ন্যাশনাল স্লিপ সেন্টার’য়ের প্রতিষ্ঠাতা ও ঘুমবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ অ্যান্ড্রু কোলস্কির মতে, “সকালে ব্যায়াম করা ঘুমের জন্য সবচেয়ে উপকারী। কারণ সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর শরীর নতুন দিনের আলো ও নড়াচড়ার মাধ্যমে নিজের জৈবিক ঘড়ি ঠিক করে নেয়। দিনের শুরুতে ব্যায়াম করলে এই প্রক্রিয়া আরও শক্তিশালী হয়। এতে সারাদিন শরীর চনমনে থাকে এবং রাতে ঘুম আসা সহজ হয়।”
দুপুরের শুরুতেও ব্যায়ামের উপকারিতা
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্লিংটনে অবস্থিত ‘ভার্মন্ট’ বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ চিকিৎসক ও ঘুম পরামর্শক ড্যানিয়েল ওয়াল একই প্রতিবেদনে বলেন, “দুপুরের প্রথম ভাগেও ব্যায়াম করা ভালো ফল দিতে পারে। এই সময় ব্যায়াম করলে শরীরের তাপমাত্রা বাড়ে, যা পরে কমে এসে ঘুমের সংকেত দেয়। ফলে রাতে শোয়ার সময় শরীর তুলনামূলকভাবে সহজে বিশ্রামের অবস্থায় যেতে পারে।”
যে কারণে ঘুমের ঠিক আগে ব্যায়াম সমস্যা তৈরি করে
যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইয়েল স্কুল অব মেডিসিন’য়ের অর্থোপেডিকস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক চার্লস ওডনকর বলেন, “ঘুমের খুব কাছাকাছি সময়ে তীব্র ব্যায়াম করলে ঘুম আসতে দেরি হয়। এ সময় শরীরের ভেতরে উত্তেজনা বাড়ে, হৃদস্পন্দন দ্রুত হয় এবং চাপের হরমোন নিঃসৃত হয়। এসব পরিবর্তন শরীরকে বিশ্রামের জন্য নয়, বরং কাজের জন্য প্রস্তুত করে তোলে।”
ফলে ঘুমের গভীরতা কমে যায় এবং ঘুম ভেঙে যেতে পারে।
সন্ধ্যায় ব্যায়াম করলে যা করবেন
সন্ধ্যায় যদি ব্যায়াম করতেই হয়, তাহলে হালকা ব্যায়াম বা ধীর গতির যোগাভ্যাস বেছে নেওয়া ভালো। এসব ব্যায়াম স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত রাখে এবং শরীরকে অতিরিক্ত উত্তেজিত করে না।
এই বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন, শোয়ার অন্তত দুই ঘণ্টা আগে ব্যায়াম শেষ করা উচিত।
ব্যক্তিভেদে ব্যায়ামের সময়ের পার্থক্য
যারা ভোরে উঠতে স্বচ্ছন্দ, তাদের জন্য সকাল বা দুপুরে তীব্র ব্যায়াম ভালো কাজ করে। আর যারা রাতে বেশি সজাগ থাকেন, তারা বিকেলের শেষ ভাগ বা সন্ধ্যার শুরুতে ব্যায়াম করলে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।
তবে সবার ক্ষেত্রেই শোয়ার অন্তত দেড় ঘণ্টা আগে ব্যায়াম শেষ করা গুরুত্বপূর্ণ।
যে ধরনের ব্যায়াম ঘুমের জন্য ভালো
হাঁটা, সাঁতার বা সাইকেল চালানোর মতো ব্যায়াম ঘুমের গভীরতা বাড়ায়। এগুলো শরীরকে ক্লান্ত করে কিন্তু অতিরিক্ত উত্তেজিত করে না।
পাশাপাশি শক্তি বাড়ানোর ব্যায়ামও ঘুমে সহায়তা করে, বিশেষ করে যখন তা অন্য ব্যায়ামের সঙ্গে মিলিয়ে করা হয়।
যোগাব্যায়াম মানসিক চাপ কমাতে বিশেষভাবে কার্যকর এবং এটি স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত করে।
ঘুমের জন্য আদর্শ ব্যায়ামের পরিমাণ
ভালো ঘুমের জন্য বিশেষজ্ঞরা, সপ্তাহে মাঝারি মাত্রার ব্যায়াম করার পরামর্শ দেন।
ড্যানিয়েল ওয়ালের মতে, “সপ্তাহে পাঁচ দিন আধা ঘণ্টা হাঁটলেই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঘুমের উন্নতি দেখা যায়।”
শুরুতে পরিবর্তন স্পষ্ট না হলেও কয়েক সপ্তাহ পর অধিকাংশ মানুষ দ্রুত ঘুমাতে পারেন, রাতে কম ঘুম ভাঙে এবং সকালে বেশি সতেজ অনুভব করেন।
আরও পড়ুন
