বাংলাদেশি শ্রমিক নিয়োগে জট, জলপাই সংগ্রহে বিপাকে গ্রিস
চলতি মৌসুমে অনেক জলপাই এখনও গাছেই রয়ে গেছে।
গ্রিসে জলপাই সংগ্রহের মৌসুমে প্রয়োজনীয় শ্রমিকের অভাবে সংকটে পড়েছেন দেশটির কৃষক ও জলপাই তেল উৎপাদকেরা। বিশেষ করে বৈধভাবে বিদেশি শ্রমিক নিয়োগের প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা এবং উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় চলতি মৌসুমে সময়মতো জলপাই সংগ্রহ করা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এ সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশ থেকে প্রয়োজনীয় শ্রমিক আনার জটিল প্রক্রিয়া। গ্রিসের কৃষকদের অভিযোগ, একদিকে শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না, অন্যদিকে উৎপাদন খরচ ও শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় জলপাই সংগ্রহ অনেক ছোট খামারের জন্য আর্থিকভাবে লাভজনক থাকছে না।
শুক্রবার গ্রিসের মূলধারার সংবাদমাধ্যম ‘কেথিমেরিনি’ এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, দেশটির জলপাই উৎপাদন খাত বর্তমানে শ্রমিকসংকট, কূটনৈতিক জটিলতা এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির সম্মিলিত চাপে রয়েছে। ২০২২ সালে বাংলাদেশ ও গ্রিসের মধ্যে শ্রমিক নিয়োগসংক্রান্ত সমঝোতা হলেও বাস্তবে সেই চুক্তির সুফল প্রত্যাশিত মাত্রায় পাওয়া যাচ্ছে না। বৈধভাবে বাংলাদেশি শ্রমিক আনার প্রক্রিয়ায় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে নয়াদিল্লিতে অবস্থিত গ্রিসের দূতাবাসের সীমিত জনবল ও আবেদন নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশ থেকে মৌসুমি ও অস্থায়ী কর্মী নিয়ে গ্রিসের কৃষি খাতের শ্রমিকসংকট মোকাবিলা করা। কিন্তু চুক্তি স্বাক্ষরের চার বছর পরও নিয়োগপ্রক্রিয়া কার্যকরভাবে চালু করা সম্ভব হয়নি।
কেথিমেরিনির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নয়াদিল্লিতে গ্রিসের দূতাবাসে ভারত, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও নেপালের প্রায় ২০ হাজার শ্রমিকের আবেদন জমে আছে। এসব আবেদন প্রক্রিয়াকরণের দায়িত্বে রয়েছেন মাত্র দুজন কর্মকর্তা। ফলে কৃষকেরা সময়মতো শ্রমিক পাচ্ছেন না। জলপাই সংগ্রহের নির্দিষ্ট মৌসুম পার হয়ে গেলে পরে শ্রমিক এলেও সেই ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হয় না।
এদিকে গ্রিসে বৈধপথে শ্রমিক নিয়োগের জটিলতার বিপরীতে অনিয়মিত অভিবাসনের প্রবণতাও দেশটির জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। গ্রিসের কোস্টগার্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সাল ও ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে প্রায় ৭ হাজার ২০০ বাংলাদেশি ক্রিট ও গাভদোস দ্বীপে পৌঁছেছেন। তাদের অনেকে উত্তর আফ্রিকার দেশ লিবিয়া হয়ে বিপজ্জনক সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়ে গ্রিসে প্রবেশ করেছেন।
এ পথে মানবপাচারকারীদের অর্থ দেওয়ার পাশাপাশি জীবনহানির ঝুঁকিও রয়েছে। অথচ গ্রিসে পৌঁছানোর পর তাদের অনেককে আটক করা হচ্ছে এবং ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কেথিমেরিনির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত বাংলাদেশি নাগরিকদের দেশে ফেরত পাঠানোর সংখ্যা ছিল মাত্র ১২০। অর্থাৎ একদিকে দেশটির কৃষকেরা বিদেশি শ্রমিকের অভাবে ফসল তুলতে পারছেন না, অন্যদিকে বৈধ শ্রমিক নিয়োগ ও অভিবাসন ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে শ্রমিকের চাহিদা ও বাস্তবতার মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
গ্রিসের কৃষিখাতের এই সংকট শুধু বাংলাদেশি শ্রমিক নিয়োগের সমস্যায় সীমাবদ্ধ নয়। দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষিকাজের জন্য প্রয়োজনীয় শ্রমিকের অভাব দীর্ঘদিনের। জাতীয় কৃষি সমবায় সমিতির (ইথিয়াস) হিসাব অনুযায়ী, গ্রিসের কৃষিখাতে প্রতিবছর প্রায় ৭০ হাজার থেকে ৮০ হাজার শ্রমিক প্রয়োজন। জলপাই সংগ্রহ ছাড়াও ফল ও শাকসবজি উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যায়ে বিপুলসংখ্যক মৌসুমি শ্রমিকের প্রয়োজন হয়।
কিন্তু স্থানীয় শ্রমিকের স্বল্পতা এবং বিদেশ থেকে শ্রমিক আনার প্রশাসনিক জটিলতায় সেই চাহিদা পূরণ করা যাচ্ছে না। ফলে কৃষকদের উৎপাদন পরিকল্পনা ব্যাহত হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে ফসল সময়মতো ঘরে তোলা সম্ভব হচ্ছে না।
শ্রমিকের সংকটের কারণে জলপাই সংগ্রহের খরচও বেড়েছে। গ্রিসের বিভিন্ন এলাকায় বর্তমানে একজন কৃষিশ্রমিকের দৈনিক মজুরি ৭০ থেকে ৮০ ইউরো পর্যন্ত উঠেছে। এর সঙ্গে কৃষকদের শ্রমিকদের থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থাও করতে হচ্ছে। ক্রিট দ্বীপের কৃষকেরা মৌসুমি পর্যটনকাজে নিয়োজিত বিদেশি শ্রমিকদের কৃষিকাজে যুক্ত করার চেষ্টা করছেন। পর্যটনের ব্যস্ত মৌসুম শেষ হওয়ার পর পাকিস্তান, ভারত, মিশর ও বাংলাদেশ থেকে আসা কিছু শ্রমিক জলপাই সংগ্রহের কাজে যুক্ত হচ্ছেন। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় তাদের সংখ্যা কম থাকায় শ্রমিকের মজুরি ও আনুষঙ্গিক ব্যয় দুটোই বেড়েছে।
অন্যদিকে জলপাই তেলের বাজারমূল্য কমে যাওয়ায় কৃষকেরা আরও বেশি চাপে পড়েছেন। প্রায় দুই বছর আগে গ্রিসে উৎপাদকেরা প্রতি কেজি জলপাই তেল বিক্রি করতেন প্রায় ৮ ইউরোতে। বর্তমানে সেই দাম কমে ৩ দশমিক ২০ থেকে ৩ দশমিক ৪০ ইউরোর মধ্যে নেমে এসেছে। ফলে একদিকে শ্রমিকের মজুরি ও উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে উৎপাদিত তেলের দাম কমছে। অনেক কৃষক প্রয়োজনীয় শ্রমিক নিয়োগ করে ফসল সংগ্রহের পরিবর্তে কিছু জলপাই গাছেই রেখে দেওয়ার ঝুঁকি নিচ্ছেন।
গ্রিসের পেশাজীবী জলপাই তেল সংস্থার সভাপতি মানোলিস ইয়ান্নুলিসের বরাত দিয়ে কেথিমেরিনি জানিয়েছে, শ্রমিকসংকট ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে চলতি মৌসুমে প্রায় ১০ শতাংশ জলপাই এখনো গাছেই রয়ে গেছে। সময়মতো ফল সংগ্রহ করতে না পারলে কৃষকের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থাতেও প্রভাব পড়তে পারে।
