০১ নভেম্বর ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩

মজুরি আন্দোলনে সংঘর্ষ: ২৮ জনকে আটক করে পুলিশ বলছে, ‘আওয়ামী লীগ’

“আন্দোলনকারীদের মধ্যে কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠনের সদস্যরা ঢুকে পড়েছে।”

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 01 Nov 2026, 04:31 PM

Updated : 01 Nov 2026, 04:47 PM

ন্যূনতম বেতন ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে মিরপুরে আন্দোলনরত পোশাক শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের পর বাহিনীটি ২৮ জনকে আটক করার কথা জানিয়েছে।

পুলিশের ভাষ্য, আটকরা কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী। তারা সাধারণ শ্রমিকদের আন্দোলনের মধ্যে ঢুকে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও নাশকতার চেষ্টা করছিলেন।

ঘটনাস্থল থেকে ১১ জনকে গ্রেপ্তার করার কথা জানিয়েছেন ডিবির মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ রাকিব খান।

তিনি বলেন, তারা বিভিন্ন জেলা থেকে আসা আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী।

“মিরপুর ১০ ও এর আশপাশের এলাকায় অভিযানে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা বরিশাল, পটুয়াখালী, কক্সবাজার, গাইবান্ধাসহ বিভিন্ন জেলার তৃণমূল নেতা।”

ঢাকার পল্লবী ও রূপনগর এলাকা নিয়ে গঠিত ঢাকা-১৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহর ভাগ্নে আলিফ মোল্লাহ এ কার্যক্রমের ‘সমন্বয়ক’ হিসেবে কাজ করছেন বলে দাবি করেন ডিবি কর্মকর্তা রাকিব খান।

তার ভাষ্য, “আলিফ মোল্লাহই ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলা থেকে নেতাকর্মীদের ঢাকায় এনেছেন এবং প্রায় শতাধিক নেতা-কর্মী সেখানে (আন্দোলনস্থল) উপস্থিত ছিলেন। তাদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার অভিযান চলমান রয়েছে।”

উপকমিশনার রাকিব বলেন, সাধারণ শ্রমিকদের ‘ব্যবহার করে’ কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা নাশকতার চেষ্টা করছেন।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “কয়েকদিন ধরে গার্মেন্টস শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন চলছে। তবে গতকাল থেকে তারা বেশ সহিংস হয়ে উঠেছে।

“আজও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ ও পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।”

গ্রেপ্তারদের মধ্যে রাকিব ও আরিফ নামের দুজন রয়েছেন। বাকিদের নাম জানা যায়নি।

এর আগে দুপুর ১২টার দিকে মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরে সাংবাদিকদের সঙ্গে তাৎক্ষণিক এক ব্রিফিংয়ে একই ধরনের অভিযোগ করেন ডিএমপির যুগ্ম পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম প্রিভেনশন উত্তর) মো. মহিদুল ইসলাম।

তিনি বলেন, “আন্দোলনকারীদের মধ্যে কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠনের সদস্যরা ঢুকে পড়েছে।”

এদিকে ডিএমপির মিরপুর বিভাগ আরও ১৭ জনকে আটক করেছে বলে জানিয়েছেন এ বিভাগের উপকমিশনার আবু নাসের রিকাবদার।

তিনি বলেন, “সহিংসতা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় অন্তত আরও ১৭ জন আটক আছে। পরে তাদের নাম ও পরিচয় জানানো হবে।

“আটকরা নাশকতার পরে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের হয়ে মিছিল করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।”

পাঁচ ঘণ্টার অবরোধ ও সংঘর্ষ

ন্যূনতম বেতন ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে রোববার সকাল থেকে মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ করেন পোশাক শ্রমিকরা।

মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ পরে মিরপুর ১১, ১২ ও আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ শুরু হয়, যা চলে প্রায় দুপুর ২টা পর্যন্ত।

এ সময় মিরপুরের বিভিন্ন সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সাধারণ মানুষ, যাত্রী, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়।

দুপুরের দিকে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে মিরপুর ১০, মিরপুর ১১ ও পল্লবী মেট্রোরেল স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে সড়ক ও রেল—দুই পথেই যোগাযোগ ব্যাহত হয়।

মিরপুরের বিভিন্ন আবাসিক এলাকার প্রবেশমুখের নিরাপত্তা ফটকও তালাবদ্ধ করে রাখা হয়। ফলে রিকশা, মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহন নিয়ে অনেক এলাকায় প্রবেশ করা যায়নি। পথচারীদের হেঁটে বা বিকল্প পথ ধরে গন্তব্যে যেতে হয়েছে।

মিরপুর ১১ নম্বর বাসস্ট্যান্ড এলাকার হিড স্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ুয়া মেয়েকে আনতে বের হওয়া মো. শাওন বলেন, “ওকে আনতে যাচ্ছি। রিকশা নিয়ে যেতে পারছি না। তাই হেঁটে রওনা দিয়েছি।

“স্কুলে ফোন দিচ্ছি, কেউ ফোন ধরছে না। কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছি না। এখন বাধ্য হয়ে সরাসরি গিয়ে মেয়েকে নিয়ে আসব।”

মিরপুর ১২ থেকে ফার্মগেট ও কারওয়ান বাজারের উদ্দেশে হেঁটে রওনা হওয়া বেসরকারি চাকরিজীবী আসাদুল ইসলাম বলেন, “রাস্তায় কোনো গাড়ি নেই। ভেবেছিলাম মেট্রো দিয়ে চলে যাব, এসে দেখি মেট্রো স্টেশনও তালা মারা। এখন এই রোদের মধ্যে হেঁটে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।”

স্টেশনের কাছে আটকে পড়া বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী রাইসা আক্তার বলেন, “নিরাপত্তার কারণে বন্ধ করা হয়েছে বুঝলাম, কিন্তু আমাদের মতো সাধারণ মানুষের ভোগান্তির তো কোনো শেষ নেই। পরীক্ষা দিতে যাচ্ছিলাম, এখন কীভাবে যাব বুঝতে পারছি না।”

এদিকে বিকল্প সড়ক ও ভেতরের গলিগুলোতে যানবাহনের চাপ বেড়ে যায়। রিকশা ও মোটরসাইকেলের ভাড়া কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা।

ডিএমপির ট্রাফিক মিরপুর বিভাগের সহকারী পুলিশ কমিশনার মাহফুজল হক বকশী বলেন, “রাস্তায় আন্দোলন হয়েছে, ফলে ব্যাপকভাবে যান চলাচল ব্যাহত হয়েছে। সকাল থেকে বিভিন্ন জায়গায় ব্লকেড ছিল। এর ফলে যান চলাচল হয়নি।”

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ট্রাফিক পুলিশ কাজ করে যাচ্ছে বলে জানান তিনি।