০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নতুন কাঠামোর সন্ধানে

প্রতিটি সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার পররবর্তী তিন মাস সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে দেশ চলবে এবং তাদের অধীনে ভোট হবে? সেটি কি রাজনীতিবিদদের জন্য সম্মানজনক হবে? তাহলে বিকল্প কী?

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নতুন কাঠামোর সন্ধানে

সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা নাকি নতুন রাজনৈতিক সমঝোতা—তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়ে ভাবছে বাংলাদেশ।

আমীন আল রশীদ আমীন আল রশীদ

Published : 02 Nov 2026, 10:27 AM

Updated : 02 Nov 2026, 10:28 AM

রাজনীতিবিদরা যেমন পরস্পরকে বিশ্বাস করেন না, তেমনি দলীয় সরকারের অধীনে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব বলেও মনে করেন না; এই অবিশ্বাসের জায়গা থেকেই ১৯৯৬ সালে সংবিধানে যুক্ত করা হয়েছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা। যদিও এই ব্যবস্থাটিও পরবর্তীকালে বিতর্কিত হয় এবং দেশের সর্বোচ্চ আদালতও এই পদ্ধতি বাতিল করে দিলে ২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধানসংবলিত অনুচ্ছেদটি সংবিধান থেকে তুলে দেওয়া হয়।

কিন্তু দেখা গেল, আদালতের রায়ের দোহাই দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধান থেকে বাদ দিয়ে ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত পরপর যে তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন করা হলো, সেগুলো আগের চেয়েও বেশি বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। মূলত সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে দেওয়ার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ টানা দুই মেয়াদে ক্ষমতায় থাকতে পেরেছে। তৃতীয় মেয়াদ শুরুর কয়েক মাসের মধ্যেই চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের মুখে তাদের পতন হয়। এরপরই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নতুন করে আলোচনায় আসে। আদালতের রায়, জুলাই সনদ এবং বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতির আলোকে সংবিধানে আবারও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফেরানোর চেষ্টা চলছে। কিন্তু এবারের আলোচনাটি ভিন্ন। সেটি হলো, এই ব্যবস্থা কি আগের মতোই হবে নাকি এর জন্য নতুন কাঠামো তৈরি করা হবে?

জুলাই সনদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের যে পদ্ধতি ও প্রক্রিয়া বলা হয়েছে, সেটি বেশ জটিল। সংবিধানের অষ্টাদশ সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটিও এই জটিল পদ্ধতির পক্ষে নয়। বরং তারা দেশের সংবিধান বিশেষজ্ঞ, আইনজ্ঞ, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে যেসব বৈঠক করেছে, তাদের কাছেও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নতুন কোনো রূপরেখার প্রস্তাব চেয়েছে।

প্রশ্ন হলো, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য নতুন কাঠামো কেন লাগবে? আগে যে পদ্ধতিতে এই সরকার গঠিত হতো, সমস্যা কি সেই পদ্ধতিতে নাকি যারা এই সরকারের দায়িত্বে ছিলেন, তাদের যোগ্যতা, দক্ষতা, আন্তরিকতা ও নিয়তে গণ্ডগোল ছিল? বস্তুত কেন এবং কীভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাটি বিতর্কিত হলো এবং তার জন্য দায়ী কে—এর নির্মোহ উত্তর খুঁজলে সেটিও রাজনীতিবিদদের জন্য স্বস্তিদায়ক হবে না।

অনেক দিন ধরেই বলা হচ্ছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে সদ্য অবসরপ্রাপ্ত কোনো বিচারপতিকে রাখা উচিত নয়। কেননা যখনই সদ্য অবসরপ্রাপ্ত কোনো বিচারপতিকে এই সরকারের প্রধান করা হবে, তখনই ওই সময়ের সরকার প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিজেদের দলীয় আদর্শের এবং দলের প্রতি অনুগত কাউকে প্রধান বিচারপতির চেয়ারে বসাতে নানা ফন্দিফিকির করবে। যে ঘটনা দেশে এর আগে ঘটেছে। সে কারণে তত্ত্বাবধায়ক সরকারে বিচার বিভাগের কোনো ব্যক্তিকে না রাখার পরামর্শও দিয়েছেন অনেকেই। তাহলে বিকল্প কী?

১৯৯৬ সালে সংবিধানে এই বিধানটি যুক্ত করার আগে ১৯৯১ সালে যে নির্বাচন হয়েছে, সেটির নাম তত্ত্বাবধায়ক সরকার না হলেও কার্যত এর কাজ ও গঠন একইরকম ছিল। তখন ওই সরকারের প্রধান ছিলেন বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ—যার হাত ধরে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার ব্যবস্থার যাত্রা শুরু হয়। এরপর ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানরা ছিলেন সাবেক প্রধান বিচারপতি। কিন্তু এরপরে ২০০৭ সালে ওয়ান-ইলেভেনের মাধ্যমে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়—সেটি ছিল মূলত সেনা-নিয়ন্ত্রিত সুশীল সরকার। ওই সরকারের প্রধান ফখরুদ্দীন আহমদ ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে একটি নির্দলীয় পদ্ধতি বলা হলেও এই সরকারের অধীনে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর যে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, সেটিও পরবর্তীকালে বিতর্কিত হয়েছে। বরং বিচার বিভাগের কেউ এই সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে যেসব নির্বাচন হয়েছে, সেগুলো সেনা-নিয়ন্ত্রিত এই সুশীল সরকারের চেয়ে কম বিতর্কিত হয়েছে। সুতরাং, এখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের যে বিকল্প কাঠামোর প্রস্তাব চাওয়া হচ্ছে বা কেউ কেউ এরই মধ্যে যে প্রস্তাব দিয়েছেন, সেখানে বিচার বিভাগকে বাদ দিয়ে তারা কি সুশীলদের আনতে চান? তারাও বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকতে পারেননি। তাহলে কি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের নিয়ে এই সরকার গঠন করা উচিত? প্রশ্ন হলো, তারাও কি বিতর্ক ও প্রশ্নমুক্ত নির্বাচন করতে পারবেন? নাকি প্রতিটি সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরবর্তী তিন মাস সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে দেশ চলবে এবং তাদের অধীনে ভোট হবে? সেটি কি রাজনীতিবিদদের জন্য সম্মানজনক হবে? তাহলে বিকল্প কী?

গত ২৪ অক্টোবর দেশের বিশিষ্ট সংবিধান বিশেষজ্ঞ, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপকদের সঙ্গে বিশেষ কমিটি যে বৈঠক করে, সেখানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন প্রক্রিয়া, আকার ও কর্মপরিধি নিয়ে একাধিক বিকল্প প্রস্তাব এসেছে। এর মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন প্রক্রিয়ায় সংসদের উচ্চকক্ষের ভূমিকা, স্পিকার বা ভাইস-প্রেসিডেন্টকে প্রধান করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা যায় কি না, একই সঙ্গে উচ্চকক্ষ গঠন এবং উচ্চকক্ষের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন প্রক্রিয়া রাখা যায় কি না, সে বিষয়ে অনেকে মতামত দিয়েছেন। যদিও এই মুহূর্তে বাংলাদেশে উচ্চকক্ষ তথা দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা আদৌ প্রয়োজন কি না—সেটি অন্য তর্ক এবং সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির বৈঠকে এরই মধ্যে বিভিন্ন ফোরাম থেকে এই প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়েছে।

বৈঠক শেষে কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতেই হবে, এর কোনো বিকল্প নেই। তবে এই সরকার কীভাবে গঠিত হবে, এর ক্ষমতা ও কার্যপরিধি কী হবে এবং কত দিনের জন্য দায়িত্ব পালন করবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। তিনি জানান, উচ্চকক্ষের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠন প্রক্রিয়া রাখা যায় কি না; অথবা যদি বিকল্প থাকে, সেই ক্ষেত্রে বিরোধী দল ও সরকারি দলের সম্মতিতে নির্বাচিত স্পিকারকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করা যায় কি না—এরকম মতামতও এসেছে। তবে সবগুলো প্রস্তাব এলে কমিটিতে বসে রিপোর্ট প্রদানের সময় সেগুলো তুলে ধরবে কমিটি। (বাসস, ২৪ অক্টোবর ২০২৬)।

বিচার বিভাগকে সরাসরি গঠনপ্রক্রিয়ার বাইরে রেখে এবং রাষ্ট্রপতির শেষ বিকল্পের ওপর নির্ভর না করে রাজনৈতিক ঐকমত্যে সরকার গঠনের পদ্ধতি নিয়েও আলোচনা হয়েছে। স্মরণ করা যেতে পারে, ২০১১ সালের ২৪ এপ্রিল ওই সময়ে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনের জন্য গঠিত বিশেষ কমিটি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে যে বৈঠক করে, সেখানেও অনেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে কোনো বিচারপতিকে নিয়োগ না দেওয়ার বিধান রেখে সংবিধান সংশোধনের পরামর্শ দিয়েছিলেন। তারা বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে বিচারপতিদের নিয়োগ দেওয়াটা স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এর মাধ্যমে বিচার বিভাগকে বিতর্কিত করা হয়েছে। বিচার বিভাগের ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ণ রাখতে এ বিতর্কের অবসান হওয়া প্রয়োজন। প্রশ্ন হলো, বিচার বিভাগের ব্যক্তিদের বাইরের লোকদের নিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করেও কি বিতর্কমুক্ত নির্বাচন করা গেছে? তাছাড়া ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের যে কাঠামো তৈরি করা হয়েছিল, সেই কাঠামোতে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনে অসুবিধা কোথায়?

প্রসঙ্গত, সংবিধানে ত্রয়োদশ সংশোধনী এনে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল, তার পেছনে আছে রাজনৈতিক সহিংসতার অতীত। তখনও যে তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগের দাবির মুখে বিএনপি সরকার এটি মেনে নিয়েছিল, তা নয়; বরং এর জন্য আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য বিরোধী দলকে কঠোর আন্দোলন করতে হয়েছে। সেই সঙ্গে ছিল আন্তর্জাতিক চাপ। মূলত সেই আন্দোলন ও চাপের মুখে বিএনপি সরকার ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি একটি নির্বাচন দিয়ে সেই নির্বাচনের পরে গঠিত সংক্ষিপ্ততম ষষ্ঠ সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল পাস করে।

মূলত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধানটিই অগণতান্ত্রিক এবং রাজনীতিবিদদের জন্য অসম্মানজনক। তারপরও গণতন্ত্রের স্বার্থে তারা এই অগণতান্ত্রিক পদ্ধতি মেনে নিয়েছেন। কিন্তু এই পদ্ধতি কতদিন চলবে? সহজ উত্তর হলো, যতদিন না প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হচ্ছে; নির্বাচন কমিশন কার্যত স্বাধীন এবং কমিশনারগণ দলনিরপেক্ষ অবস্থানে থেকে দায়িত্ব পালনের মতো সক্ষম ও আন্তরিক হয়ে উঠতে পারছেন; পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনী যতক্ষণ না সরকারের ক্ষমতায় টিকে থাকার লাঠিয়াল হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার প্রবণতা থেকে বের হতে পারছে; আমলাতন্ত্র যতক্ষণ না জনবান্ধব ও দুর্নীতিমুক্ত হতে পারছে—ততক্ষণ পর্যন্ত দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন তো বটেই, স্থানীয় সরকার নির্বাচনও শতভাগ স্বচ্ছ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য হবে—সেটি বিশ্বাস করা কঠিন।

এটা ঠিক যে, গণতন্ত্রই যদি শেষ কথা হয়, তাহলে তার স্বার্থে সংবিধানে এমন একটি বিধান থাকা বাঞ্ছনীয় যে বিধানের আলোকে নির্বাচনকালীন এমন একটি পদ্ধতি থাকবে যেখান থেকে ক্ষমতাসীন দল নির্বাচনে কোনো ধরনের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পাবে না। অর্থাৎ বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় অর্ধেকের বেশি আসনে প্রার্থীদের জয়ী হওয়া, ভোটের আগের রাতে ব্যালট বাক্স ভরে ফেলা কিংবা আমি-ডামির নির্বাচন করা সম্ভব হবে না। বরং সকল দল নির্বাচনে সমান সুযোগ পাবে। কিন্তু দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে যেহেতু এটা নিশ্চিত করা যায় না, অতএব এমন একটি মধ্যবর্তী ব্যবস্থা প্রয়োজন হবে যেখানে কেউ বিশেষ সুবিধা পাবে না। আবার কারো জন্য নির্বাচনের মাঠ অনেক বেশি উঁচুনিচুও হবে না। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এখন পর্যন্ত সেই পদ্ধতির গ্রহণযোগ্য নাম তত্ত্বাবধায়ক সরকার। ফলে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এর যে রূপরেখা তৈরি করা হয়েছিল, সেই কাঠামোতে সমস্যা নাকি সমস্যা অন্য কোথাও, তার নির্মোহ বিশ্লেষণ প্রয়োজন। আর যদি সত্যিই এর কাঠামো পরিবর্তন করতে হয়, তাহলে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জাতীয় সংসদে খোলামেলা আলোচনার মাধ্যমে নেওয়া উচিত। সরকার এবং অন্য রাজনৈতিক দলগুলো যদি সেই পদ্ধতির পরিবর্তন চায় তাহলে কিছু বিষয় স্পষ্ট করতে হবে। যেমন:

১. তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান ও উপদেষ্টাদের নিয়োগের চূড়ান্ত পদ্ধতি।

২. তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান ও উপদেষ্টা হওয়ার যোগ্যতা ও অযোগ্যতা।

৩. তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সদস্যসংখ্যা, ক্ষমতা ও দায়িত্বের সীমা।

৪. সংসদ ভেঙে যাওয়ার কত দিনের মধ্যে সরকার গঠিত হবে।

৫. নির্বাচন শেষ হওয়া পর্যন্ত সরকারের মেয়াদ এবং ক্ষমতা হস্তান্তরের নিয়ম।

সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের পূর্ণাঙ্গ রায়ে আপিল বিভাগ বলেছেন, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য ১৯৯৬ সালে সংবিধানে ত্রয়োদশ সংশোধনী এনে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা চালু করা হলেও এর পদ্ধতিগত দুর্বলতার কারণে এটি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ফলে নির্বাচন কমিশনকে আরও শক্তিশালী এবং এর প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করা দরকার যাতে সব সময়ই একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব হয়। সেই সঙ্গে সর্বোচ্চ আদালত এটিও মনে করিয়ে দেন যে, যতক্ষণ পর্যন্ত না জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিরপেক্ষ, স্বাধীন ও প্রভাবমুক্ত করা সম্ভব হচ্ছে, ততক্ষণ গণতন্ত্র বিকশিত হবে না। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ছাড়া গ্রহণযোগ্য সংসদও প্রতিষ্ঠিত হবে না। বরং আমাদের নির্বাচনি ব্যবস্থা ও সংসদ অপরিপক্বই থেকে যাবে।

পরিশেষে, বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাটি বারবার হোঁচট খেয়েছে মূলত নির্বাচনি ব্যবস্থা ধ্বংস করার কারণে। আর চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতনও হয়েছে যেসব কারণে, সেখানেও তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করে নিজেদের অধীনে নির্বাচন করে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার ভূমিকা অনেক। অতএব অগণতান্ত্রিক অজুহাতে সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের পক্ষে যত যুক্তিই থাকুক না কেন, যতক্ষণ না রাজনৈতিক সংস্কৃতি উন্নত হচ্ছে; রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আস্থা ও বিশ্বাস তৈরি হচ্ছে এবং একটি শক্তিশালী নির্বাচনি ব্যবস্থা গড়ে উঠছে—ততক্ষণ একটা বিকল্প ব্যবস্থা লাগবে। কিন্তু একটা সময়ে গিয়ে এই পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে আসতেই হবে। সেই ধরনের রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে আরও কত বছর লাগবে, তা বলা কঠিন।

আমীন আল রশীদ: সাংবাদিক ও লেখক। ইমেইল: aminalrasheed@gmail.com