Published : 14 Oct 2025, 01:20 AM
কয়েক দফায় নির্বাচনের তারিখ পরিবর্তনের পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু), হল সংসদ ও সিনেট ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচনে ভোটগ্রহণের বাকি আর মাত্র তিন দিন। মঙ্গলবার মধ্যরাতে শেষ হচ্ছে প্রার্থীদের প্রচার।
শেষ সময়ে প্রার্থীদেরকে বিভিন্ন অনুষদ, বিভাগ, চত্বর ও শিক্ষার্থীদের সমাগমস্থলে প্রচার চালাতে দেখা গেছে। নির্বাচনের আচরণবিধি অনুযায়ী, মঙ্গলবার রাত ১২টার পর আর কোনো প্রার্থী প্রচারণা চালাতে পারবেন না।
নির্বাচনে মোট ভোটার ২৮ হাজার ৯০১ জন। রাকসুর ২৩টি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ২৪৭ জন প্রার্থী, সিনেট প্রতিনিধি পদে ৫৮ জন এবং হল সংসদ নির্বাচনে ৫৯৭ জন প্রার্থী অংশ নিচ্ছেন।
রাকসু নির্বাচনে প্রচারে প্রার্থীরা বেছে নিয়েছেন নানা অভিনব কৌশল। প্রচারের অংশ হিসেবে কেউ টাকার আদলে লিফলেট, আবার কেউ দলিল কিংবা পত্রিকার আকারে পোস্টার তৈরি করে শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দিয়েছেন। কেউবা গান গেয়ে নির্বাচনি বার্তা পৌঁছে দিচ্ছেন ভোটারদের কাছে।
নির্বাচনি মাঠে নজর কাড়তে এক প্রার্থী নবাব সিরাজউদ্দৌলা সেজে প্রচার চালান। এ ছাড়া অনেকে প্রচারপত্রে কার্টুন চরিত্র, পান্ডা, আলাদীনের প্রদীপ নিয়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে ঘুরে বেড়িয়েছেন নিজেদের প্রতিশ্রুতি জানাতে।
শুধু অফলাইন নয়, অনলাইনেও সমান তৎপর প্রার্থীরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট, ভিডিও, রিলস ও প্রচারমূলক গান দিয়ে তারা জোরালোভাবে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছেন ভোটারদের সামনে।
নির্বাচনি প্রচারের শেষ সময়ে এসে প্রার্থীরা ব্যস্ত সময় পার করছেন। তবে প্রচার ও ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিয়ে প্রার্থী এবং ভোটারদের প্রতিক্রিয়া ছিল মিশ্র। ভোটারদের কাছে রাকসু উৎসবমুখর মনে হলেও একাধিক প্রার্থী অর্থের অবাধ ব্যবহারের অভিযোগ তুলেছেন।

গণতান্ত্রিক শিক্ষার্থী পর্ষদ প্যানেলের সহসভাপতি (ভিপি) প্রার্থী ফুয়াদ রাতুল বলেন, “আমরা সকল শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছি। আবাসিক হল, মেসসহ ক্যাম্পাসে যেখানেই শিক্ষার্থীদের জমায়েত ছিল আমরা আমাদের প্রতিশ্রুতি নিয়ে তাদের কাছে গিয়েছি। শিক্ষার্থীরাও আমাদের ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন।”
‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নষ্ট হয়েছে অভিযোগ করে ফুয়াদ বলেন, “আমরা দেখেছি, অর্থের ঝনঝনানি কীভাবে প্রচারের সুষ্ঠু পরিবেশ নষ্ট করেছে। বিভিন্ন উপহার বিতরণ, খাবার বিতরণ, বড় স্ক্রিনে খেলা দেখানোসহ গ্রাম্য ভোটের পরিবেশ নিয়ে আসার চেষ্টা করেছে অনেকে। আমরা বারবার নির্বাচনি ব্যয় নির্ধারনের দাবি জানিয়ে এসেছি। সেটি করলে হয়তো প্রচার আরও ভালো হতে পারত।”
তবে ইসলামী ছাত্রশিবির ও ছাত্রদল ইতিবাচক প্রচারের কথা জানিয়েছে। ভোটের মাঠে বড় এই দুই দলই আশা ব্যক্ত করছে জয়ী হওয়ার।
ছাত্রশিবির মনোনীত ‘সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট’ প্যানেলের সহসভাপতি (ভিপি) প্রার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি মুস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেন, “আমরা শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছি। যেহেতু নির্বাচন পিছানোর কারণে সবচেয়ে বেশি সময় পেয়েছে রাকসু, তাই আমরা মনে করি প্রচারও যথেষ্ট ভালো হয়েছে।”
‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ প্রসঙ্গে জাহিদ বলেন, “আমরা মনে করি না, নির্বাচনি পরিবেশ নষ্ট হয়েছে। বড় কোনো অভিযোগও কারও বিরুদ্ধে আসেনি। আমরা অভিযোগ বা কাদা ছোড়াছুড়ি না করে আশাবাদী থাকতে চাই। আশা করছি, সব অভিযোগের জবাব শিক্ষার্থীরা ভোটের মাধ্যমে দেবে।”
ছাত্রদল মনোনীত ‘ঐক্যবদ্ধ নতুন প্রজন্ম’ প্যানেল থেকে সাধারণ সম্পাদক (জিএস) প্রার্থী নাফিউল ইসলাম জীবন বলেন, “আমরা যেই উৎসবমুখর পরিবেশ আশা করেছিলাম তা আমরা দেখতে পেয়েছি। শিক্ষার্থীরা বিরক্ত হওয়ার পরিবর্তে আমাদের ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে।”
এদিকে সকাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের নবীনবরণ অনুষ্ঠান ঘিরে প্রার্থীদের প্রচার বেড়েছে আরও বেশি।
ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির ছাড়াও এবারের নির্বাচনে আরও নয়টি প্যানেল নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। প্যানেলগুলো হলো- ছাত্র অধিকার পরিষদ ও ছাত্র ফেডারেশনের ‘রাকসু ফর র্যাডিক্যাল চেঞ্জ’, গণতান্ত্রিক ছাত্র জোটের ‘গণতান্ত্রিক শিক্ষার্থী পর্ষদ’, ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের ‘সচেতন শিক্ষার্থী পরিষদ’; ছাত্র ইউনিয়নের একাংশের ‘অপরাজেয় ৭১, অপ্রতিরোধ্য ২৪’, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক তিন সমন্বয়কের নেতৃত্বে ‘আধিপত্যবিরোধী ঐক্য’, সামাজিক সংগঠন ইউনাইটেড স্টুডেন্টস ডেমোক্রেটিক ফোরামের (ইউএসডিএফ) ‘সর্বজনীন শিক্ষার্থী সংসদ’, সাধারণ শিক্ষার্থীদের পক্ষে ‘স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী জোট’, ‘ইউনাইটেড ফর রাইটস’ এবং ‘ইন্ডিপেনডেন্ট স্টুডেন্ট অ্যালায়েন্স’। নির্বাচনি প্রচারে তাদেরও সরব উপস্থিতি দেখা গেছে।
প্রচারের এই উৎসবমুখর পরিবেশ উপভোগ করছে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরাও।

নবীনবরণে আসা প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ফারহানা ইয়াসমিন বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নবীনবরণ অনুষ্ঠান নিয়ে বেশ উচ্ছ্বসিত ছিলাম। রাকসুর প্রচার এর সাথে বাড়তি আমেজ যোগ করেছে। সবাই আমাদের কাছে আসছে, ভোট চাচ্ছে। এটি আমাদের কাছে একদমই নতুন অভিজ্ঞতা। সব মিলিয়ে বেশ ভালো লাগছে।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন চত্বরে প্রার্থীদের উপস্থিতিও চোখে পড়ার মত। শেষ সময়ে শিক্ষার্থীদের কাছে ছুটে যাচ্ছেন প্রার্থীরা।
চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী রনি আহমেদ বলেন, “রাকসু আমাদের দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি। রাকসু নিয়ে প্রত্যাশাও তাই অনেক বেশি। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা এখন যেভাবে আমাদের আসছেন, আশা করব, নির্বাচনের পরেও এমন করেই তারা শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সমস্যা শুনবেন এবং শিক্ষার্থীদের হয়ে কাজ করবেন।”
এদিকে প্রচারের অংশ হিসেবে অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের মেসে মেসে প্রচার চালিয়েছেন প্রার্থীরা।
মেহেরচণ্ডী এলাকায় মেসে থাকেন দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী হাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, “প্রার্থীরা যে সবার কাছে যাচ্ছেন এটি আমার কাছে ইতিবাচক মনে হয়েছে। যারা প্রচারে এসেছিলেন তাদের ব্যবহারও ছিল বেশ আন্তরিক। তবে অনেক শিক্ষার্থী ক্যাম্পাস থেকে অনেক দূরে থাকেন, তাদের কাছে প্রার্থীরা যেতে পারেননি। আমি আশা করব, রাকসু হওয়ার পর শতভাগ আবাসিকতার বিষয়টিকে যেন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।”
২৮ জুলাই তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। তফসিল অনুযায়ী, ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে নির্বাচনি প্রচার শুরু হয়েছিল। এটি চলার কথা ছিল ২৩ সেপ্টেম্বর রাত ১০টা পর্যন্ত।
তবে ২২ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত রাকসু নির্বাচন কমিশনের জরুরি সভায় গৃহীত সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে ১৬ অক্টোবর নির্বাচনের নতুন তারিখ ঘোষণা করা হয়। সংশোধিত সময়সীমা অনুযায়ী, ১৪ অক্টোবর রাত ১২টা পর্যন্ত প্রচার চালাতে পারবেন প্রার্থীরা।
১৬ অক্টোবর সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত নয়টি ভবনে ১৭টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ হবে। ভোটগ্রহণ শেষে কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে ফলাফল ঘোষণা করা হবে।
আরও পড়ুন:
প্রার্থীদের শেষ সময়ের প্রচারে সরগরম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
রাকসু ভোট: অনাবাসিক ভোটারদের হাতে জয়-পরাজয়!
রাকসু: ইশতেহারের 'গালগল্পে' বিশ্বাস নেই মেহেদীর
রাকসুর সংস্কার ও ক্ষমতা বাড়াতে চায় গণতান্ত্রিক ছাত্র জোট
রাকসু: আচরণবিধি ভাঙার পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ছাত্রদল-শিবিরের
রাকসু: নবাব সিরাজউদ্দৌলা সাজে ভোটের প্রচারে
ছুটির পর রাকসুর প্রচারে ভোটের আমেজ
রাবিতে পূর্ণদিবস কর্মবিরতি স্থগিত ঘোষণা জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামে
রাবির 'কমপ্লিট শাটডাউন': কর্মকর্তারা কাজে ফিরবেন, ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ দ্বিতীয় দিনে
নানা তালগোলে রাকসু ভোট পিছিয়ে ১৬ অক্টোবর
'শিক্ষক লাঞ্ছনা': জড়িতদের শাস্তির দাবিতে রাবিতে মানববন্ধন
'পোষ্য কোটা': মধ্যরাতে হল থেকে বেরিয়ে রাবির ছাত্রীরাও আন্দোলনে
‘পোষ্য কোটা’: অবরুদ্ধ রাবির প্রোভিসি-প্রক্টর-রেজিস্ট্রার, ক্যাম্পাসে উত্তেজনা
'পোষ্য কোটা': রাবিতে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ধস্তাধস্তি, উত্তেজনা
রাবিতে 'পোষ্য কোটা' পুনর্বহালের পর বৃষ্টির মধ্যে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ