Published : 21 Sep 2025, 12:28 AM
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘পোষ্য কোটা’ বাতিলের দাবিতে কয়েক হাজার ছাত্রী হল থেকে বেরিয়ে আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন। তারা এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবনের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করছেন।
শনিবার রাত ১০টার পর থেকেই হলগুলো থেকে ছাত্রীরা বেরিয়ে জুবেরী ভবন ও প্রশাসনিক ভবনে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে যোগ দিতে থাকেন। কিন্তু রাত সাড়ে ১১টার পর একযোগে কয়েক হাজার ছাত্রী হল ছেড়ে বেরিয়ে আসেন।
আন্দোলনকারীরা দুটি দাবিতে সেখানে স্লোগান দিচ্ছেন। তারা ‘পোষ্য কোটা’র প্রজ্ঞাপন বাতিল এবং ২৫ সেপ্টেম্বরেই রাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি করেছেন।
আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী আবু হুরায়রা বলেন, “বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে আমাদের লক্ষ্য ছিলো বৈষম্য দূর করা, আমরা সেটি আদায় করতে পেরেছিলাম। কিন্তু অগাস্ট পরবর্তী সময়ে এসে আবারও ‘পোষ্য কোটা’ নামে আরেকটি বৈষম্য আমাদের সামনে এসেছে, চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এই বৈষম্য আর অযৌক্তিক সুবিধার বিরুদ্ধেই আজ আমরা একত্রিত হয়েছি। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাব।”
আরেক শিক্ষার্থী রাফিয়া ইসলাম তমা বলেন, “আজকে আমাদের কয়েকজন ভাইয়ের উপরে যেভাবে একপ্রকার হামলা চালিয়েছে প্রশাসন, তাতে আমাদের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালানো ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। অযৌক্তিক এই ‘পোষ্য কোটা’ অবিলম্বে বাতিল করতে হবে এবং যথাসময়েই রাকসু নির্বাচন আয়োজন করতে হবে। এর কোনো ব্যতিক্রম হলে আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাব।”
১৭ সেপ্টেম্বর শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের একাংশ পোষ্য কোটা পুনর্বহাল না করা হলে ২১ সেপ্টেম্বর থেকে পূর্ণদিবস কর্মবিরতির হুঁশিয়ারি দেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার বিকালে ভর্তি কমিটির সভায় ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সন্তানদের শর্তসাপেক্ষে ‘পোষ্য কোটা’য় ভর্তির সিদ্ধান্ত অনুমোদন করা হয়।
ওই দিন সন্ধ্যায় শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অবস্থান নিয়ে এর প্রতিবাদ জানায়। তারই ধারাবাহিকতায় এই আন্দোলন চলছে।
এর মধ্যে শনিবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের জুবেরী ভবনে আন্দোলনরত শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যে ধস্তাধস্তির ঘটনাও ঘটে। এ সময় কয়েকজন আহত হন।

এর পর থেকে জুবেরী ভবনে উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মাইন উদ্দিন, প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমান, রেজিস্ট্রার ইফতেখারুল আলম মাসুদসহ কয়েকজন কর্মকর্তাকে আটকে বিক্ষোভ করেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।
তবে রাত সাড়ে ১১টায় গিয়ে দেখা যায়, জুবেরী ভবনে আন্দোলনকারীরা আর নেই। সবাই উপাচার্যের বাসভবনের সামনে চলে গেছেন। অবরুদ্ধ থাকা প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমান, রেজিস্ট্রার ইফতেখারুল আলম মাসুদও বেরিয়ে গেছেন। তবে উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মাইন উদ্দিনকে সেখানে একটি কক্ষে বসে থাকতে দেখা গেছে।
কর্মবিরতির ডাক
উপ-উপাচার্য ও প্রক্টরকে ‘শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত’ করার অভিযোগ এনে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটা অংশ কর্মবিরতির ডাক দিয়েছেন।
ক্যাম্পাসের উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে রোববার পূর্ণদিবস কর্মবিরতির ঘোষণা দেওয়া হল; যারা আবার ‘পোষ্য কোটার সমর্থক’ হিসেবে পরিচিত।
শনিবার রাতে ক্যাম্পাসের সিনেট ভবনের সামনে এক সংক্ষিপ্ত সংবাদ সম্মেলনে এই কর্মবিরতির ঘোষণা দেওয়া হয়। এতে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সভাপতি এবং অ্যাগ্রোনোমি অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচার এক্সটেনশন বিভাগের অধ্যাপক আব্দুল আলীম।
‘পোষ্য কোটা’র দাবিতে আন্দোলনকে ঘিরে ‘প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা বাস্তবায়ন’ কমিটি গঠন করা হয়। সেই কমিটিতে সদস্য হিসেবে রয়েছেন মোট ছয়জন। ছয়জনের একজন অধ্যাপক আব্দুল আলিম। সংবাদ সম্মেলনের লিখিত বক্তব্যে সেই ছয়জনই স্বাক্ষর করেছেন।

অধ্যাপক আব্দুল আলিম রাতে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আজকের যে ঘটনা, সেখানে উপ-উপাচার্যসহ শিক্ষকদের লাঞ্চিত করা হয়েছে। আমরা এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করছি। বিচার করা না হলে সোমবার থেকে লাগাতার কর্মবিরতি পালন করা হবে।”
৩ অনশনকারী মেডিকেল সেন্টারে
‘পোষ্য কোটা’ পুনর্বহালের প্রতিবাদে শুক্রবার বিকাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ভবনের সামনে অনশনে বসেন নয় শিক্ষার্থী। তারা তাদের অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন।

অনশনকারী শিক্ষার্থীদের তিন শিক্ষার্থী আরিফ আলভী, সজিবুর রহমান ও আসাদুল ইসলামকে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় রাত সাড়ে ১০টার দিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
শিক্ষক-শিক্ষার্থী ধস্তাধস্তি
উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মাইন উদ্দিন শনিবার আড়াইটায় প্রশাসনিক ভবনে আসলে শিক্ষার্থীরা গাড়ি আটকে ‘পোষ্য কোটা’ বাতিলের দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দেয়। শিক্ষার্থীরা এ সময় উপ-উপাচার্যের গাড়ির উপরে টাকা ছুড়ে দেন।
পরে উপ-উপাচার্য মাঈন উদ্দিন ও প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমান তার বাসভবনে প্রবেশের চেষ্টা করলে শিক্ষার্থীরা তার বাসভবনে তালা দেয়। এ সময় উপ-উপাচার্যসহ শিক্ষকদের একটি দল বিশ্ববিদ্যালয়ের জুবেরি ভবনে প্রবেশের সময় শিক্ষার্থীরা সামনে দাঁড়িয়ে নানা স্লোগান দিতে থাকে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, এ সময় উপ-উপাচার্যসহ শিক্ষকরা বিক্ষোভ উপেক্ষা করে ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করেন। তারা এগিয়ে যেতে চাইলে ধাক্কাধাক্কির মধ্যে কয়েকজন শিক্ষার্থী পড়ে যান। তাদের ডিঙ্গিয়ে শিক্ষকরা জুবেরী ভবনে প্রবেশ করেন। এ সময় কয়েকজন শিক্ষার্থী ও সাংবাদিক আহত হন।

প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমান বলেন, “পোষ্য কোটা বাতিলের দাবিতে শিক্ষার্থীরা উপ-উপাচার্য স্যারকে অবরুদ্ধ করে তার বাসায় তালা ঝুলিয়ে দেন। পরে আমরা জুবেরী ভবনের লাউঞ্জে বসি। সেখানে শিক্ষার্থীরা আবারও আমাদের বাধা দেয়। আমরা ফিরে গিয়ে পুনরায় আসার পর ভবনে ঢোকার চেষ্টা করলে তারা আবারও বাধা দেয়।
“এ সময় ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে। ধাক্কাধাক্কির মধ্যেই আমার হাতের ঘড়ি ও সঙ্গে থাকা ১০ হাজার টাকা হারিয়ে যায়। ধাক্কাধাক্কি হতে পারে, কিন্তু আমার হাতের ঘড়ি ও ১০ হাজার টাকা হারিয়ে যাওয়া কোনোভাবেই স্বাভাবিক নয়।”
আরও পড়ুন:
রাবিতে 'পোষ্য কোটা সমর্থকদের' কর্মবিরতির ডাক, শিক্ষকরা অবরুদ্ধই
‘পোষ্য কোটা’: অবরুদ্ধ রাবির প্রোভিসি-প্রক্টর-রেজিস্ট্রার, ক্যাম্পাসে উত্তেজনা
'পোষ্য কোটা': রাবিতে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ধস্তাধস্তি, উত্তেজনা
'পোষ্য কোটা': রাবিতে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ধস্তাধস্তি, উত্তেজনা
রাবিতে 'পোষ্য কোটা' পুনর্বহালের পর বৃষ্টির মধ্যে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ
ভোটের আগে রাবিতে 'পোষ্য কোটার' দাবিতে ফের কর্মবিরতির ঘোষণা
রাকসু নির্বাচন: গানে গানে প্রচার প্রার্থীর
ছাত্র সংসদে উপাচার্য-কোষাধ্যক্ষ, আপত্তি উঠল রাকসু ভোটেও
রাকসু: সমন্বয়কদের 'আধিপত্যবিরোধী ঐক্যে' ভাঙন, সরে দাঁড়ালেন ৩ জন
রাকসু নির্বাচন: কোন হলের শিক্ষার্থী কোন ভবনে ভোট দেবেন
রাকসু নির্বাচন: ৯ ভবনের ১৭ কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ
রাকসু: ছাত্রদলের পাল্টায় মেশিনে ভোট গোনার দাবি শিবিরের
রাকসু: স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স এবং হাতে গণনা চায় ছাত্রদল
অনলাইন-অফলাইনে রাকসুর ভোটযুদ্ধ