Published : 20 Sep 2025, 11:25 PM
উপ-উপাচার্য ও প্রক্টরকে ‘শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত’ করার অভিযোগ এনে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটা অংশ কর্মবিরতির ডাক দিয়েছেন।
রাকসু নির্বাচনের প্রচারের মধ্যে ‘পোষ্য কোটা’ কার্যকরের সিদ্ধান্ত, তার প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ-বিক্ষোভ, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে ধস্তাধস্তি, উপ-উপাচার্য ও প্রক্টরকে অবরুদ্ধ করে রাখার মধ্যে ক্যাম্পাসের উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে রোববার পূর্ণদিবস কর্মবিরতির ঘোষণা দেওয়া হল; যারা আবার ‘পোষ্য কোটার সমর্থক’ হিসেবে পরিচিত।
শনিবার রাতে ক্যাম্পাসের সিনেট ভবনের সামনে এক সংক্ষিপ্ত সংবাদ সম্মেলনে এই কর্মবিরতির ঘোষণা দেওয়া হয়। এতে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সভাপতি এবং অ্যাগ্রোনোমি অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচার এক্সটেনশন বিভাগের অধ্যাপক আব্দুল আলীম।

‘পোষ্য কোটা’র দাবিতে আন্দোলনকে ঘিরে ‘প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা বাস্তবায়ন’ কমিটি গঠন করা হয়। সেই কমিটিতে সদস্য হিসেবে রয়েছেন মোট ছয়জন। ছয়জনের একজন অধ্যাপক আব্দুল আলিম। সংবাদ সম্মেলনের লিখিত বক্তব্যে সেই ছয়জনই স্বাক্ষর করেছেন।
অধ্যাপক আব্দুল আলিম রাতে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আজকের যে ঘটনা, সেখানে উপ-উপাচার্যসহ শিক্ষকদের লাঞ্চিত করা হয়েছে। আমরা এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করছি। বিচার করা না হলে সোমবার থেকে লাগাতার কর্মবিরতি পালন করা হবে।”
কর্মবিরতির ঘোষণা যখন দেওয়া হয়, তখনও ‘পোষ্য কোটা’ বাতিলের দাবিতে আন্দোলনকারীরা জুবেরী ভবনে অবরুদ্ধ করে রেখেছিলেন উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মাইন উদ্দিন, প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমান, রেজিস্ট্রার ইফতেখারুল আলম মাসুদসহ কয়েকজন কর্মকর্তাকে।
কর্মবিরতির ঘোষণা দেওয়ার কিছু আগেই অবরুদ্ধ রেজিস্ট্রার ইফতেখারুল আলম মাসুদ কক্ষ থেকে বেরিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন। তখন শিক্ষার্থীরা রেজিস্ট্রারের কাছে নির্বাহী আদেশে ‘পোষ্য কোটা’ বহালের প্রজ্ঞাপন বাতিলের দাবি জানান। তখন রেজিস্ট্রার বলেন, রোববার আলোচনা করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
কিন্তু আন্দোলনকারীরা রেজিস্ট্রারের এই কথায় সায় দেননি। তখন রেজিস্ট্রার আবার নিজের কক্ষে ফিরে যান।

এদিকে জুবেরী ভবনের ভেতরে ও বাইরে থাকা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ছাত্রীরাও যুক্ত হয়েছেন। রাত ১০টার দিকে অনেকেই হল থেকে এসে সেখানে অবস্থান নিয়েছেন।
এদিকে ‘পোষ্য কোটা’ পুনর্বহালের প্রতিবাদে শুক্রবার বিকাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ভবনের সামনে অনশনে বসেন নয় শিক্ষার্থী। তারা তাদের অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন।
অনশনকারী শিক্ষার্থীদের তিন শিক্ষার্থী আরিফ আলভী, সজিবুর রহমান ও আসাদুল ইসলামকে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় রাত সাড়ে ১০টার দিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনের লিখিত বক্তব্য
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়েছে, “আনুমানিক দুপুর ২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) দাপ্তরিক কাজ শেষে দুপুরের খাবারের জন্য বাসায় যাবার জন্য গাড়িতে ওঠেন। এমতাবস্থায় কতিপয় ছাত্র তাকে গাড়ি থেকে জোরপূর্বক নামিয়ে গাড়ির চাবি নিয়ে নেয় এবং অশালীন উক্তিসহ তার গাড়ির উপরে ভিক্ষা হিসাবে টাকা ছুড়ে দেয়।
“এরপর হেঁটে তার বাসায় ঢুকতে গেলে প্রধান ফটকে তালা লাগিয়ে দেয়। অনন্যেপায় হয়ে তিনি জুবেরী ভবনে গেলে তাকে ঘিরে নানা ধরনের কটুক্তি করে ও তাকে নিয়ে ধস্তাধস্তি করতে থাকে।
“প্রক্টরসহ তার বডির সদস্যবৃন্দ তাকে প্রোটেকশন দেওয়ার চেষ্টা করলে প্রক্টরকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করাসহ তার পকেট হতে ১০ হাজার টাকা ও তার হাত ঘড়ি ছিনিয়ে নেয়। প্রো-ভিসি নিরুপায় হয়ে জুবেরী ভবনের দোতালায় একটি কক্ষে আশ্রয় নিতে গেলে তার গলা চেপে ধরে এবং তাকে ধাক্কা মেরে সিঁড়িতে ফেলে দেয়।
“জুবেরী ভবন একটি আবাসিক ও ক্লাব ভবন। এখানে অনেক পরিবার বাস করে যার মধ্যে স্ত্রী, কন্যা-শিশুরাও আছে।
“জুবেরী ভবনের অবস্থানরত কক্ষে বিদ্যুৎ সংযোগ ও খাবার পানির ব্যবস্থা বন্ধ করে দিয়েছে। তারা সেখানে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালিসহ স্লোগান দিচ্ছে যার ফলে ওই ভবনে একটা ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। ফলশ্রুতিতে ভবনের পরিবারগুলি আতঙ্কিত ও নিরাপত্তাহীনতায় আছে।”

সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, “রাবির প্রাক্তন প্রক্টর ও রাকসুর নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক এনামুল হক সেখানে অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং তাকে হাসপাতালে নিতে হয়।”
এসব ঘটনা আসন্ন ‘রাকসু নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্রের অংশ’ বলে শিক্ষক কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মনে করছেন মন্তব্য করে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, “শিক্ষক লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছাত্রদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে এবং ক্যাম্পাসের সার্বিক নিরাপত্তার স্বার্থে আগামীকাল (রোববার) পূর্ণ দিবস কর্মবিরতি ঘোষণা করছি।”
দাবি না মানা হলে সোমবার থেকে কর্মবিরতি চলমান থাকবে বলেও সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
১৭ সেপ্টেম্বর শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের একাংশ পোষ্য কোটা পুনর্বহাল না করা হলে ২১ সেপ্টেম্বর থেকে পূর্ণদিবস কর্মবিরতির হুঁশিয়ারি দেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার বিকালে ভর্তি কমিটির সভায় ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সন্তানদের শর্তসাপেক্ষে ‘পোষ্য কোটা’য় ভর্তির সিদ্ধান্ত অনুমোদন করা হয়।
সন্ধ্যায় শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অবস্থান নিয়ে এর প্রতিবাদ জানায়। তারই ধারাবাহিকতায় এই আন্দোলন চলছে।
এর আগে ২ জানুয়ারি শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে উপাচার্য স্থায়ীভাবে ‘পোষ্য কোটা’ বাতিলের সিদ্ধান্ত নেন।
১৩ অগাস্ট থেকে ‘পোষ্য কোটা’ পুনর্বহালসহ আট দফা দাবিতে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের একটি অংশ কর্মবিরতি ও অবস্থান ধর্মঘট শুরু করেন। এরই অংশ হিসেবে ২৪ থেকে ২৬ অগাস্ট পূর্ণদিবস কর্মবিরতির ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল।
পরে ২৪ অগাস্ট প্রশাসনের আশ্বাসে তিন দিনের অবস্থান ধর্মঘট কর্মসূচি স্থগিত ঘোষণা করেছিলেন ‘পোষ্য কোটা’ পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা।
আরও পড়ুন:
‘পোষ্য কোটা’: অবরুদ্ধ রাবির প্রোভিসি-প্রক্টর-রেজিস্ট্রার, ক্যাম্পাসে উত্তেজনা
'পোষ্য কোটা': রাবিতে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ধস্তাধস্তি, উত্তেজনা
'পোষ্য কোটা': রাবিতে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ধস্তাধস্তি, উত্তেজনা
রাবিতে 'পোষ্য কোটা' পুনর্বহালের পর বৃষ্টির মধ্যে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ
ভোটের আগে রাবিতে 'পোষ্য কোটার' দাবিতে ফের কর্মবিরতির ঘোষণা
রাকসু নির্বাচন: গানে গানে প্রচার প্রার্থীর
ছাত্র সংসদে উপাচার্য-কোষাধ্যক্ষ, আপত্তি উঠল রাকসু ভোটেও
রাকসু: সমন্বয়কদের 'আধিপত্যবিরোধী ঐক্যে' ভাঙন, সরে দাঁড়ালেন ৩ জন
রাকসু নির্বাচন: কোন হলের শিক্ষার্থী কোন ভবনে ভোট দেবেন
রাকসু নির্বাচন: ৯ ভবনের ১৭ কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ
রাকসু: ছাত্রদলের পাল্টায় মেশিনে ভোট গোনার দাবি শিবিরের
রাকসু: স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স এবং হাতে গণনা চায় ছাত্রদল
অনলাইন-অফলাইনে রাকসুর ভোটযুদ্ধ