Published : 21 Jun 2026, 09:00 PM
ওয়াশিংটন আর তেহরানের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের কালি না শুকাতেই নতুন করে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় সই হওয়া সমঝোতা চুক্তিটি যখন বাস্তব রূপ নেওয়ার কথা, তখনই লেবাননে অবিরাম বোমাবর্ষণ স্পষ্ট করে দেয় যে কাগজে-কলমে সংঘাতের অবসান আর মাঠের বাস্তবতায় যুদ্ধ থামা দুটো সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। সুইজারল্যান্ডের বুর্গেনস্টকে যখন দুই পক্ষের ফলো-আপ আলোচনায় বসার প্রস্তুতি চলছে, ঠিক তখনই লেবাননের বাতাসে বারুদের গন্ধ তীব্রতর হয়েছে। লেবাননকে যখন ইসরায়েল তাদের পরীক্ষাগারে পরিণত করেছে, তখন ওয়াশিংটন-তেহরান সমঝোতার গোলকধাঁধায় পড়ে যেতে পারে।
লেবাননসহ সব কটি রণক্ষেত্রে একযোগে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা ছিল ১৫ জুনের সেই চুক্তির মূল লক্ষ্য । দলিলের প্রথম অনুচ্ছেদেই লেবাননের শান্তিকে সামগ্রিক কাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। তবে এই বোঝাপড়ার প্রধানতম গলদ ছিল এর অংশীদারিত্বের অভাব। যে দুটি পক্ষ সরাসরি মাটিতে লড়াই করছে, সেই ইসরায়েল কিংবা হিজবুল্লাহর কেউই এই চুক্তির আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষরকারী ছিল না। ফলে দুটি বৃহৎ রাষ্ট্রের মধ্যকার আইনি দলিল মাঠের তৃতীয় ও চতুর্থ পক্ষকে শান্ত রাখতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়।
লেবাননে ইসরায়েলের টানা হামলায় অন্তত ৩২ জন নিহত হয়েছে, এতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া সমঝোতা স্মারক পরবর্তী আলোচনার ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ইরান ইতোমধ্যেই অভিযোগ করেছে, লেবাননে ইসরায়েলের অব্যাহত হামলা সমঝোতা স্মারকের প্রথম অনুচ্ছেদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
মাঠের এই আগ্রাসনের জবাবে তেহরানও তার সবচেয়ে পুরোনো এবং কার্যকরী অর্থনৈতিক অস্ত্রটি ব্যবহার করতে দেরি করেনি। হরমুজ প্রণালি বন্ধ এবং খোলার এই চিরচেনা রাজনীতিকে ইরান এখন কূটনৈতিক দরকষাকষির প্রধান হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছে। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের প্রধানতম এই প্রবেশদ্বারটি সাময়িকভাবে উন্মুক্ত করার পর ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত থাকায় তেহরান তা আবারও অবরুদ্ধ করে দেয়। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর স্পষ্ট বার্তা, হরমুজ প্রনালি বন্ধ করে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের প্রথম জবাব এবং আগ্রাসন না থামলে আরও বড় পদক্ষেপ আসবে। ইরানের এই রণকৌশল মূলত ওয়াশিংটনকে বাধ্য করতে চায় যাতে তারা ইসরায়েলের ওপর তাদের প্রভাব খাটায়। লেবাননের সংঘাত বন্ধের পাশাপাশি ইরানি বন্দরগুলোর ওপর থেকে মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার, হরমুজ দিয়ে নিরাপদ ও শুল্কমুক্ত জাহাজ চলাচল এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে নিজেদের অবরুদ্ধ সম্পদ উদ্ধার করাই এখন তেহরানের মূল লক্ষ্য।
এই সংকটের গভীরতা বুঝতে হলে পেছনের ইতিহাস এবং লেবাননের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বের দিকে তাকাতে হবে। গাজা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে যে সীমিত মাত্রার সংঘাত চলছিল, তা ২০২৪ সালে হিজবুল্লাহ নেতা হাসান নাসরাল্লাহর মৃত্যুর পরও থামেনি। ২০২৬ সালের শুরুর দিক পর্যন্ত এই ধারা বজায় ছিল। তবে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যায় গত ২৮ ফেব্রুয়ারি, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা করে এবং এক হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি নিহত হন। এই চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে হিজবুল্লাহ তীব্র রকেট হামলা শুরু করলে লেবানন সরাসরি ওয়াশিংটন-তেহরান যুদ্ধের প্রধান উপ-রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। পরবর্তী সময়ে ইসরায়েলের পাঁচটি সামরিক ডিভিশন লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় পাঁচ শতাংশ এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু, বিপুলসংখ্যক আহত এবং প্রায় দশ লাখ মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার মানবিক বিপর্যয়ই প্রমাণ করে যে কেন লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতির জন্য বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে আকুল আবেদন জানিয়েছেন।
বর্তমান অচলাবস্থার মূল বিন্দুটি আসলে ইসরায়েলের অনমনীয় অবস্থানের মধ্যে নিহিত। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ইসরায়েল সাফ জানিয়ে দিয়েছে, তারা দক্ষিণ লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে না। তাদের দাবি, হিজবুল্লাহর সঙ্গে তাদের বিরোধ একটি স্বাধীন বিষয় এবং তা ইরানের সঙ্গে হওয়া মার্কিন চুক্তির অংশ হতে পারে না। ওয়াশিংটনে নিযুক্ত ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত স্পষ্ট করেছেন যে হিজবুল্লাহ শর্ত মানলেই কেবল তারা যুদ্ধবিরতি বজায় রাখবে। অন্যদিকে হিজবুল্লাহর অবস্থানও সমান সংঘাতময়। তাদের মতে, ইসরায়েলের এই অনড় অবস্থান আসলে ওয়াশিংটন-তেহরান চুক্তিকে ভেস্তে দেওয়ার একটি সুপরিকল্পিত চক্রান্ত। নিজেদের মাটিতে বিদেশি সেনার উপস্থিতিকে তারা কোনোভাবেই মেনে নেবে না এবং একেই তারা প্রতিরোধের প্রধান যুক্তি হিসেবে খাড়া করছে। ফলে একই চুক্তির দুটি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী ব্যাখ্যা তৈরি হয়েছে, ইরান একে একটি পূর্ণাঙ্গ দলিল মনে করলেও ইসরায়েল একে দেখছে আংশিক এবং শর্তসাপেক্ষ বিষয় হিসেবে।
হোয়াইট হাউজের জন্য এই পরিস্থিতি চরম অস্বস্তিকর। একদিকে মার্কিন প্রশাসন ইসরায়েলি অভিযানের সমালোচনা করে বলছে যে এতে শান্তি প্রক্রিয়া ভেস্তে যেতে পারে, অন্যদিকে মার্কিন প্রতিনিধি দল পারমাণবিক ইস্যু নিয়ে আলোচনার জন্য সুইজারল্যান্ডে পাড়ি জমিয়েছে। আন্তর্জাতিক পরমাণু সংস্থা বা আইএইএ-র প্রধানের উপস্থিতিতে এই আলোচনায় গতি আনতে খোদ মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সেখানে যাচ্ছেন। তবে লেবাননের আকাশে বোমার গর্জন সচল থাকায় তেহরানের প্রতিনিধিরা আদৌ এই বৈঠকে অংশ নেবেন কিনা তা নিয়ে যে সংশয় দেখা দিয়েছিল শেষপর্যন্ত ইরানের উপস্থিতিতে তার অবসান ঘটেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স এবং ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের কালিবাফের নেতৃত্বে দুই দেশের প্রতিনিধিদল এই আলোচনায় বসেছে। ইরান বৈঠকে বসার আগেই তাদের অবস্থান স্পষ্ট করে জানিয়ে বলেছে, আলোচনার মূল বিষয় হবে লেবানন। লেবাননে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি না হলে পুরো শান্তি প্রক্রিয়াই মুখ থুবড়ে পড়তে পারে। যদিও ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, মার্কিন চাপের মুখে নেতানিয়াহু ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ সামরিক বাহিনীকে কিছুটা সংযত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন, তবে সেনা প্রত্যাহারের কোনো লক্ষণ না থাকা প্রমাণ করে যে মূল বিরোধটি এখনো অমীমাংসিত রয়ে গিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই জ্বলন্ত পরিস্থিতির আঁচ সুদূর দক্ষিণ এশিয়া তথা বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও লাগা স্বাভাবিক। প্রথমত, হরমুজ প্রণালির এই অনিশ্চিত বন্ধ-খোলার খেলা বিশ্ব বাজারে তেলের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। বাংলাদেশের মতো আমদানি-নির্ভর জ্বালানি অর্থনীতির জন্য এটি সরাসরি বড় ধাক্কা। তেলের দাম বাড়লে দেশের অভ্যন্তরীণ পরিবহন খরচ, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় এবং সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি এক লাফে বেড়ে যাওয়ার প্রবল ঝুঁকি থাকে। দ্বিতীয়ত, সংঘাত সরাসরি উপসাগরীয় অঞ্চলের শ্রমবাজারকে স্পর্শ না করলেও মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত লাখ লাখ বাংলাদেশি প্রবাসীর নিরাপত্তা এবং রেমিটেন্স প্রবাহের ওপর এক ধরনের নেতিবাচক প্রভাব তৈরি করে। তবে এই পুরো সমীকরণের একটি ইতিবাচক ও আকর্ষণীয় দিক হলো পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা। একটি দক্ষিণ এশীয় দেশ যখন বিশ্ব রাজনীতির এমন একটি জটিল ও স্পর্শকাতর সংকটের সমাধান টেবিলে নেতৃত্ব দেয়, তখন তা আঞ্চলিক কূটনৈতিক পুঁজির ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নতুন এক সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেয়।
পরিশেষে এই চুক্তির ভবিষ্যৎ মূলত তিনটি প্রধান অমীমাংসিত প্রশ্নের উত্তরের ওপর ঝুলে রয়েছে। ইসরায়েল কি শেষ পর্যন্ত লেবানন থেকে তাদের সেনা সরাতে রাজি হবে, নাকি সাময়িক সংযমের আড়ালে দীর্ঘমেয়াদি দখলদারিত্বের জন্য কালক্ষেপণ করবে, সেটিই প্রথম দেখার বিষয়। দ্বিতীয়ত, হিজবুল্লাহর মতো একটি স্বাধীন সশস্ত্র গোষ্ঠী নিজেদের ভূখণ্ডে শত্রু সেনার উপস্থিতি মেনে নিয়ে কতদিন অস্ত্র সংবরণ করে রাখবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। আর তৃতীয়ত, পারমাণবিক আলোচনার মূল এজেন্ডাটি লেবানন সংকটের কারণে কতটা মুখ থুবড়ে পড়ে, তার ওপরই নির্ভর করছে বিশ্ব রাজনীতির আগামী দিনগুলো। মাঠের বাস্তবতা এটাই শিক্ষা দেয় যে বিবদমান মূল পক্ষগুলোকে বাদ দিয়ে কেবল দূরবর্তী দুই পরাশক্তির সই করা কোনো কাগজ কখনো স্থায়ী শান্তি এনে দিতে পারে না। লেবানন আজ এমন এক আন্তর্জাতিক পরীক্ষাগার, যার ফলাফলের ওপরই নির্ভর করছে পশ্চিম এশিয়ার এই নতুন শান্তি প্রক্রিয়া আলোর মুখ দেখবে নাকি চিরতরে অন্ধকারের অতল গহ্বরে হারিয়ে যাবে।
শিপ্রা বিশ্বাস কবি ও কলামলেখক। ই-মেইল: [email protected]