Published : 18 Jul 2026, 11:32 AM
মার্কিন প্রযুক্তিকে টেক্কা দিতে ২.৮ ট্রিলিয়ন প্যারামিটারের বিশ্বের সবচেয়ে বড় এআই মডেল উন্মোচন করেছে চীনা স্টার্টআপ মুনশট।
‘কিমি কে৩’ নামের নতুন এ মডেলের মাধ্যমে আমেরিকার শীর্ষস্থানীয় বিভিন্ন এআই সিস্টেমের সঙ্গে চীনের প্রযুক্তিগত ব্যবধান আরও কমে এল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
মুনশটের দাবি, এ মডেলটির কার্যসক্ষমতা শীর্ষস্থানীয় মার্কিন এআই জায়ান্ট অ্যানথ্রপিকের সর্বাধুনিক ‘ফেইবল’ মডেলের কাছাকাছি।
রয়টার্স লিখেছে, নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে মার্কিন সরকার অ্যানথ্রপিকের ‘ফেইবল’ ও ‘মিথোস’ মডেল দুটি আকস্মিকভাবে প্রত্যাহারের ঠিক এক মাস পরেই ‘কিমি কে৩’-এর এ আত্মপ্রকাশ ঘটল।
এ ঘটনায় ইঙ্গিত মেলে, চীনের ওপেন এআই ইকোসিস্টেম কত দ্রুত আমেরিকার সবচেয়ে উন্নত সিস্টেমগুলোর সঙ্গে ব্যবধান কমিয়ে আনছে। ‘মুনশট’, ‘জেডডটআই’ ও ‘মিনিম্যাক্স’-এর মতো বিভিন্ন চীনা কোম্পানি এখন তুলনামূলক কম খরচে শক্তিশালী এআই মডেল বাজারে আনছে।
এমন পদক্ষেপের মাধ্যমে পশ্চিমা বিশ্বের সেই দীর্ঘদিনের ধারণা এখন বড় চ্যালেঞ্জের মুখে, যেখানে ভাবা হত চীনা প্রযুক্তি নির্মাতারা আমেরিকানদের চেয়ে কয়েক মাস পিছিয়ে রয়েছে।
মুনশট বলেছে, তিন লাখ কোটি প্যারামিটারের মাইলফলক ছুঁইছুঁই প্রথম ওপেন-ওয়েট মডেল ‘কিমি কে৩’, যা জটিল গাণিতিক যুক্তি, দীর্ঘ কোডিং ও জ্ঞানভিত্তিক কাজের জন্য বিশেষভাবে তৈরি হয়েছে।
মডেলটিতে রয়েছে ১ মিলিয়ন টোকেনের বড় ‘কনটেক্সট উইন্ডো’, যার ফলে আগের যে কোনো প্রজন্মের চেয়ে একক প্রম্পটে অনেক বেশি তথ্য প্রসেস বা মনে রাখতে পারবে এই মডেল।
ক্লোজড-সোর্স বা মালিকানাধীন মডেলের বিপরীতে ওয়ান-ওয়েট মডেলের সুবিধা হচ্ছে, ব্যবহারকারীরা এর মূল সিস্টেমটি নিজেদের ডিভাইসে ডাউনলোড ও রান করতে এবং প্রয়োজনমতো কাস্টমাইজ বা পরিবর্তন করে নিতে পারেন।
কোম্পানিটি দাবি করেছে, “জিপিইউ কার্নেল অপটিমাইজেশানের ক্ষেত্রে ‘ফেইবল ৫’-এর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে ‘কিমি কে৩’ এবং অ্যানথ্রপিকের ‘ওপাস ৪.৮’, ‘জিপিটি ৫.৬ সল’ ও ‘জিপিটি ৫.৫’-এর চেয়ে ভালো পারফর্ম করেছে।”
‘জিপিইউ কার্নেল অপটিমাইজেশান’ প্রযুক্তিটি এআই হার্ডওয়্যারের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে এবং ডেটা প্রসেসিংয়ের গতি বাড়িয়ে দেয়।
থার্ড পার্টির বিভিন্ন মূল্যায়নেও মডেলটি দারুণ ফলাফল দেখিয়েছে। ওয়েব ইন্টারফেইস তৈরির সক্ষমতা যাচাইয়ের একটি সূচকে ‘কিমি কে৩’-কে প্রথম স্থান দিয়েছে ‘এরেনা ডটআই’।
অন্যদিকে, সার্বিক পারফরম্যান্সে নতুন মডেলটিকে ‘ফেইবল ৫’-এর ঠিক পরে দ্বিতীয় স্থানে রেখেছে ভালস এআই, যা ‘জিপিটি-৫.৬ সল’-এর চেয়ে এগিয়ে।
এ ছাড়া আর্টিফিশিয়াল অ্যানালাইসিস বলেছে, জটিল ও বহুধাপ বিশিষ্ট কাজের মূল্যায়নে মডেলটি চ্যাটজিপিটির নির্মাতা ওপেনএআইয়ের ‘জিপিটি-৫.৫’ এবং অ্যানথ্রপিকের ‘ক্লড ওপাস ৪.৮’-এর সমান পারফরম্যান্স দেখিয়েছে।
এদিকে, মুনশটের এ বড় ঘোষণার পর হংকং শেয়ার বাজারে তাদের দেশীয় প্রতিযোগী ‘জিপু’ ও ‘মিনিম্যাক্স’-এর শেয়ার মূল্যে বড় ধস নেমেছে। বাজার বন্ধ হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে জিপুর শেয়ার দর ২৭.৭ শতাংশ ও মিনিম্যাক্সের শেয়ার দর ১৬.৫ শতাংশ পর্যন্ত পড়েছে।
দ্রুতগতিতে নতুন মডেল উন্মোচন
বিশ্বজুড়ে এআই প্রযুক্তির প্রতিযোগিতা তীব্র হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চীনা বিভিন্ন প্রযুক্তি কোম্পানি নিজেদের নতুন নতুন মডেল বাজারে আনার গতি নাটকীয়ভাবে বাড়িয়েছে।
‘জেডডটআই’-এর আধুনিক মডেল ‘জিএলএম-৫.২’ আত্মপ্রকাশের পরই এ প্রবণতা আরও জোরদার হয়েছে। বিভিন্ন বেঞ্চমার্ক পরীক্ষায় আমেরিকার শীর্ষস্থানীয় ক্লোজড-সোর্স মডেলগুলোর প্রায় সমান স্কোর তুলে নিয়ে বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের তাক লাগিয়েছিল মডেলটি।
এর মাধ্যমে পশ্চিমা বিশ্লেষকদের সেই দীর্ঘদিনের ধারণা কার্যত ভেস্তে গেছে, যেখানে দাবি করা হত, চীনা বিভিন্ন এআই মডেল আমেরিকার চেয়ে অন্তত ছয় মাস পিছিয়ে রয়েছে।
প্রযুক্তি গবেষণা কোম্পানি ‘ওমদিয়া’র প্রধান বিশ্লেষক লিয়ান জাই সু বলেছেন, চীনা বিভিন্ন এআই মডেল বাজারে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে কারণ এগুলো শীর্ষস্থানীয় বিভিন্ন মার্কিন সিস্টেমের তুলনায় কম খরচে ব্যবহার করা যায়।
“ওপেনএআই তাদের গ্রাহকদের কাছ থেকে যে পরিমাণ ফি নেয়, চীনা মডেলগুলো তার সামান্য ভগ্নাংশ বা নামমাত্র খরচে চালানো সম্ভব।”
তিনি সতর্ক করে বলেছেন, কিমি কে৩-এর বড় আকার মানেই এই নয় যে মডেলটি সব ক্ষেত্রে শতভাগ সেরা পারফরম্যান্স দেখাবে।
এ ছাড়া, কিমি কে৩ একটি ‘ওপেন-ওয়েট’ মডেল হওয়ায় ব্যবহারকারীদের তা নিজেদের সিস্টেমে ডাউনলোড করার সুযোগ থাকলেও, এর বড় আকারের কারণে খুব কম ব্যবহারকারীই নিজস্ব উদ্যোগে মডেলটি চালাতে পারবেন।
লিংকডইন পোস্টে আমেরিকান ‘এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট’-এর গবেষক রায়ান ফেডাসিউক বলেছেন, ২ লাখ ৮০ হাজার কোটি প্যারামিটারের এমন বড় মডেল স্থানীয়ভাবে বা নিজস্ব ডিভাইসে চালাতে গেলে শত হাজার ডলার মূল্যের কম্পিউটিং হার্ডওয়্যার ও যন্ত্রাংশের প্রয়োজন হবে।
লাখ কোটি প্যারামিটার সিস্টেমের লড়াই
প্যারামিটার হচ্ছে, একটি এআই মডেলের অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনশীল চলক, যা মডেলটি এর প্রশিক্ষণ বা ট্রেনিংয়ের সময় শেখে। একে সাধারণত এআই মডেলের আকার বা স্কেলের একটি স্থূল পরিমাপ হিসেবে ধরা হয়। তবে তা সরাসরি কার্যসক্ষমতার চূড়ান্ত প্রমাণ নয়।
কিমি কে৩ বাজারে আসার আগে চীনের বাজারে ‘মেইতুয়ান’-এর ‘লংক্যাট-২.০’ ও ডিপসিকের ‘ভি৪-প্রো’ ১.৬ ট্রিলিয়ন প্যারামিটার নিয়ে শীর্ষস্থানে ছিল। চীনের আরও বেশ কয়েকটি দেশীয় প্রতিযোগী এরইমধ্যে ট্রিলিয়ন বা লাখ কোটি প্যারামিটারের মাইলফলক স্পর্শ করেছে।
আমেরিকার আধুনিকমানের বিভিন্ন মডেলের সঙ্গে এগুলোর সরাসরি তুলনা করা বেশ কঠিন। কারণ অ্যানথ্রপিক বা ওপেনএআইয়ের মতো শীর্ষ মার্কিন কোম্পানি নিজেদের ‘ফেইবল’, ‘মিথোস’ বা ‘জিপিটি-৫.৫’-এর মতো শক্তিশালী বিভিন্ন সিস্টেমের সুনির্দিষ্ট প্যারামিটার সংখ্যা কখনোই প্রকাশ করে না।
মুনশট বলেছে, কিমি কে৩ মডেলে দুটি বড় ধরনের আর্কিটেকচারাল বা কাঠামোগত আপগ্রেড করা হয়েছে, যা এর কম্পিউটিং সক্ষমতা বহুলাংশে বাড়িয়েছে। ফলে মডেলটি মানুষের ন্যূনতম তত্ত্বাবধানেই দীর্ঘ ও জটিল কোডিংয়ের কাজ অনায়াসে সম্পন্ন করতে পারে।
আলিবাবা ও টেনসেন্টের মতো চীনা টেক জায়ান্টদের আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সমর্থনে পুষ্ট মুনশট এআই খাতে নিজেদের শীর্ষস্থান ধরে রাখতে তাদের সক্ষমতা ও পুঁজি দুই-ই ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে চলেছে।
গেল মাসে ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, হংকং শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার সম্ভাব্য প্রস্তুতি হিসেবে স্টার্টআপটি প্রায় তিন হাজার কোটি ডলার মূল্যায়নে নতুন করে ২০০ কোটি ডলারের তহবিল সংগ্রহের চেষ্টা চালাচ্ছে।