Published : 17 Jul 2026, 02:05 PM
মহাকাশের দুই তারার মধ্যবর্তী শূন্যস্থান বা ইন্টারস্টেলার স্পেসে প্রথমবারের মতো প্রাকৃতিক চিনির সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
নতুন এ আবিষ্কার মহাবিশ্বে ভিনগ্রহের প্রাণের অনুসন্ধান ও পৃথিবীতে প্রাণের উৎপত্তি সংক্রান্ত বৈজ্ঞানিক ধারণাকে পুরোপুরি বদলে দিতে পারে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্ট।
বিজ্ঞানীরা আমাদের ছায়াপথের ঠিক কেন্দ্রভাগের দিকে ‘এরিথ্রুলোজ’ নামের এক ধরনের প্রাকৃতিক চিনির কণার উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন। পৃথিবীতে এ চিনিটি মূলত লালচে রসাল ফল রাসবেরি ও ত্বকের কৃত্রিম ক্যানিং বা রং করার প্রসাধনী ‘ফেইক ট্যান’-এ পাওয়া যায়।
পৃথিবীতে কীভাবে প্রথম প্রাণের স্পন্দন জেগেছিল এবং মহাবিশ্বের অন্য কোথাও প্রাণের অস্তিত্ব গড়ে ওঠা সম্ভব কি না– এতকাল ধরে চলে আসা এমন বড় সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে এ আবিষ্কার বিজ্ঞানীদের সাহায্য করতে পারে।
যে কোনো জ্যান্ত প্রাণীর জন্য শর্করা বা চিনি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, যা মানবদেহ গঠনকারী ডিএনএ ও আরএনএ-এর মূল ভিত্তি হিসাবে কাজ করে এবং দেহের প্রধান জৈবিক বিভিন্ন প্রক্রিয়াকে সচল রাখতে শক্তি জোগায়।
গবেষকদের অনুমান, আজ থেকে কোটি কোটি বছর আগে পৃথিবীতে প্রাণের সূচনালগ্নেও এসব চিনির কণাই প্রধান অনুঘটক হিসাবে কাজ করেছিল।
তবে মানবজাতি ও জীবজগতের জন্য এতটা গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার পরও বিজ্ঞানীদের কাছে এখনও রহস্য যে, পৃথিবীতে বা মহাবিশ্বের অন্য কোথাও প্রথম কীভাবে এ চিনির উৎপত্তি হয়েছিল।
যেমন, বিজ্ঞানাগারে কৃত্রিমভাবে চালানো বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষায় দেখা গেছে, পৃথিবীতে প্রাণ তৈরির আগের আদিম পরিবেশে প্রাকৃতিকভাবে এই চিনি তৈরি হওয়া অসম্ভব।
এর আগে, জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা উল্কাপিণ্ড ও গ্রহাণুর বিভিন্ন নমুনায় চিনির অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছিলেন। সেই সূত্র ধরে তারা ধারণা করছেন, আমাদের সৌরজগৎ তৈরির আগের আদিম আণবিক মেঘ বা ‘প্রাইমরডিয়াল মলিকিউলার ক্লাউড’ থেকেই হয়ত এই চিনি পৃথিবীতে এসেছে।
এর আগে, তারার মধ্যবর্তী অংশে কখনো এমন কোনো চিনি কণার সন্ধান মেলেনি, যা এবার বিজ্ঞানীদের টেলিস্কোপে ধরা পড়ল।
গবেষকরা এবার মিল্কিওয়ে ছায়াপথের কেন্দ্রভাগের কাছাকাছি অবস্থিত ‘জি+০.৬৯৩−০.০২৭’ নামের আণবিক মেঘে এ প্রাকৃতিক চিনির সন্ধান পেয়েছেন। সংবেদনশীল দুটি শক্তিশালী টেলিস্কোপের সাহায্যে চালানো জরিপ থেকে এ সাফল্য এসেছে।
টেলিস্কোপ দুটি থেকে প্রাপ্ত উপাত্তের সঙ্গে ল্যাবরেটরিতে পরিমাপ করা ‘এরিথ্রুলোজ’ চিনির উপাত্তের নিখুঁত মিল খুঁজে পান বিজ্ঞানীরা।
গবেষণায় উঠে এসেছে, চার কার্বনওয়ালা কিটোন ঘরানার একমাত্র সম্ভবপর এই জটিল শর্করাটি সমগোত্রীয় তবে কম জটিল তিন কার্বনওয়ালা শর্করার চেয়ে বহুগুণ পরিমাণে সেখানে রয়েছে। অথচ বিজ্ঞানীরা ওই মেঘে তিন কার্বনের শর্করার কোনো অস্তিত্বই খুঁজে পাননি।
নতুন এ গবেষণার প্রধান লেখক ইজাসকুন জিমেনেজ সেরা বলেছেন, “এ আবিষ্কারটি সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত। কারণ মহাকাশ রসায়নের প্রচলিত ধারণা অনুসারে, মহাশূন্যে ভাসমান বিভিন্ন আণবিক উপাদান কার্বন পরমাণুর একের পর এক ধারাবাহিক সংযোজনের মাধ্যমেই আকারে বড় হয়ে থাকে।”
বিজ্ঞানীদের ধারণা, আজ থেকে প্রায় ৪০০ কোটি বছর আগে ‘লেইট হেভি বম্বার্ডমেন্ট’ বা পৃথিবীতে উল্কাপাত ও গ্রহাণুর তীব্র আঘাতের যুগ চলাকালীন আনুমানিক ৫০ লাখ থেকে ৫ কোটি টন এই শর্করা বা চিনি পৃথিবীর বুকে আছড়ে পড়েছিল। এটাই পৃথিবীতে প্রাণের বিকাশ বাড়াতে সাহায্য করে থাকতে পারে।
‘ডিটেকশন অফ আ কাইরাল ফোর-কার্বন সুগার ইন ইন্টারস্টেলার স্পেস’ শিরোনামে গবেষণাপত্রটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞান সাময়িকী ‘নেচার অ্যাস্ট্রোনমি’তে।