Published : 17 Jul 2026, 01:10 PM
টিনএজারদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের আসক্তি কমাতে সন্তানদের স্ক্রিন টাইম নিয়ন্ত্রণে অভিভাবকদের আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
তারা বলছেন, জোর করে নিয়ম না চাপিয়ে খোলামেলা আলোচনা, নিজেদের অভ্যাস সংশোধন ও প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহারের মাধ্যমে কীভাবে সন্তানদের অতিরিক্ত ফোন স্ক্রলিং বন্ধ করা যায় তারই পাঁচ কার্যকর উপায় বিবিসির প্রতিবেদনে থেকে তুলে ধরা হল–
১. ছোট আকারে শুরু করুন ও বাস্তববাদী হন
যেসব অভিভাবক এরইমধ্যে তাদের সন্তানদের হাতে ট্যাবলেট বা স্মার্টফোন তুলে দিয়েছেন, তারা হয়ত ভাবছেন এগুলো একবারে কেড়ে নেওয়াই হবে সবচেয়ে ভালো সমাধান। তবে শিশু মনস্তাত্ত্বিক ড. জেন গিলমোর বলেছেন, এমনটা কোনো কার্যকর বা ফলপ্রসূ উপায় নাও হতে পারে।
“যে কোনো অভ্যাস পরিবর্তন করা সব সময়ই কঠিন।”
স্ক্রিন টাইম বা স্ক্রিন দেখার সময় কমানোর বিষয়ে সন্তানদের সঙ্গে তর্কের উত্তপ্ত মুহূর্তে কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়ে, পরিস্থিতি যখন শান্ত ও স্বাভাবিক থাকে তখন পরিবর্তনগুলো আনার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
তার ভাষায়, “শান্ত মস্তিষ্কই সবচেয়ে ভালো যোগাযোগ করতে পারে।”
স্ক্রিন টাইম কমানোর প্রাথমিক পদক্ষেপ হতে পারে ঘরের ভেতরে ডিভাইসের জন্য একটি নির্দিষ্ট স্থান বা আলমারি ঠিক করে দেওয়া।
ড. জেন গিলমোর বলেছেন, “চার্জার রাখার জন্য একটি নির্দিষ্ট জায়গা রাখুন... যাতে ফোন যখন সরিয়ে রাখা হবে তখন সেগুলো যেন সরাসরি চার্জে চলে যায় ও সেখানেই থাকে।”
২. মিলেমিশে বা আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিন
সন্তানদের ওপর জোর করে নিয়ম চাপিয়ে না দিয়ে স্ক্রিন টাইম নির্ধারণের আলোচনায় টিনএজারদেরও অন্তর্ভুক্ত করা উচিত বলে মনে করেন শিশু মনস্তাত্ত্বিক ড. মেরিহ্যান বেকার।
তিনি বলেছেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে ঘিরে বন্ধুদের মধ্যে যে ধরনের মানসিক চাপ তৈরি হয় তা অভিভাবকদের বুঝতে হবে। টিনএজারদের পাশে পেতে তাদের এভাবে বলা যেতে পারে, “আমি বুঝি যে এখানেই তোমরা বন্ধুরা মিলে আড্ডা দাও। এখানে না থাকলে বন্ধুরা কী ভাববে তোমার সেই সামাজিক চাপটাও আমি বুঝি।
“সুতরাং চলো আমরা নিজেরা আলোচনা করি, কীভাবে সারাদিনের ব্যস্ততার মধ্যে এমন কিছু সময় বের করা যায় যখন তুমি সারাক্ষণ ফোনে ডুবে থাকবে না।”
অভিভাবকত্ব বিষয়ক কোচ অলিভিয়া এডওয়ার্ডস বলেছেন, সন্তানদের সঙ্গে দৃঢ় সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারলে তাদের স্ক্রিন ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়ে যায়।
“আমাদের সন্তানের সঙ্গে আন্তরিক ও ঘনিষ্ট সম্পর্ক থাকতে হবে, কারণ এ বন্ধনই আমাদের পারস্পরিক সহযোগিতা ও দলগতভাবে কাজ করার দিকে নিয়ে যাবে।”
এর অংশ হিসেবে সন্তান অনলাইনে কী ধরনের কনটেন্ট বা ভিডিও দেখছে এর প্রতি অভিভাবকরা আন্তরিক আগ্রহ দেখাতে পারেন।
৩. স্ক্রিন টাইমকে শেখার সুযোগে রূপান্তর করুন
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দ্রুত পরিবর্তনশীল ট্রেন্ড বা ফ্যাশনের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে অনেক অভিভাবকই হিমশিম খান। তবে স্ক্রিন টাইম নিয়ে খোলামেলা আলোচনার মাধ্যমে এখানে যেমন বড়দের, তেমনই ছোটদেরও একে অপরের কাছ থেকে শেখার সুযোগ রয়েছে।
অলিভিয়া এডওয়ার্ডসের পরামর্শ হচ্ছে সন্তানকে এভাবে প্রশ্ন করা যেতে পারে, “তোমার কী মনে হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কীভাবে কাজ করে? মানুষকে ধরে রাখার জন্য এসব অ্যাপ কীভাবে তৈরি করা হয়েছে তা কি জানো? তুমি কি জানো মানুষ যত বেশি সময় এখানে কাটাবে, তাদের তত বেশি আয় হবে?”
ড. জেন গিলমোরও বলেছেন, অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের বাস্তবসম্মত উপায়ে ডিজিটাল সাক্ষরতা বা ‘ডিজিটাল লিটারেসি’ শেখাতে পারেন।
“এমন কিছু কনটেন্ট থাকতে পারে যা আপনারা একসঙ্গে বসে দেখতে এবং সন্তানকে বলতে পারেন, ‘আচ্ছা, তোমার কী মনে হয় এটা কি সত্যি? এটা সত্যি না মিথ্যা তা নিশ্চিত হওয়ার উপায় কী?’”
৪. নিজে ভালো উদাহরণ তৈরি করুন
শিশুরা যে তাদের মা-বাবাকে অনুকরণ করে তা আর নতুন কিছু নয়। ফলে সন্তানদের মধ্যে ভালো স্ক্রিন বা ফোন ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তুলতে হলে প্রথমে নিজেদের অভ্যাস নিয়ে একটু ভাবা প্রয়োজন।
ড. মেরিহ্যান বেকার এ বিষয়ে একটি সহজ ও হালকা মনোভাব নিয়ে আলোচনা করার পরামর্শ দিয়েছেন।
“আমরা আমাদের সন্তানদের সঙ্গে কিছুটা আত্ম-সমালোচনামূলক আলোচনা করতে পারি, যেমন ‘আমরা সবাই আসলে এই দোষে দুষ্ট, ফোনের সঙ্গে আমার নিজের সম্পর্কটাও যতটা ভালো হওয়া উচিত ততটা ভালো নয়’।”
ফোন ও ট্যাবলেট সব বয়সী মানুষের জন্যই বিনোদনের সার্বক্ষণিক মাধ্যম হয়ে উঠেছে। তবে শিশু মনস্তাত্ত্বিক জেন গিলমোর বলেছেন, বড় ও ছোট উভয় পক্ষের জন্যই মাঝেমধ্যে কিছুটা অলস বা একঘেয়ে সময় কাটানো বেশ উপকারী হতে পারে।
“স্ক্রিনে থাকার সময় আমরা সারাক্ষণ বাইরের জগতের দিকে তাকিয়ে থাকি। তবে আমরা যখন নিজেদের ভেতরের জগতে প্রবেশ করি ও শূন্য দৃষ্টিতে বা দূরে তাকিয়ে থাকি তখন তা আমাদের অতীত নিয়ে ভাবার এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে কল্পনার সুযোগ দেয়, যা মানুষের মধ্যে সৃজনশীলতাও বাড়ায়।”
“ফলে আপনার সন্তানরা যখন কিছু করার নেই বলে অভিযোগ করে কেবল শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকবে তখন ভয়ের কিছু নেই। এমনটা আসলে ইতিবাচক বিষয়।”
৫. আতঙ্কিত হবেন না
সন্তান লালন-পালন করা কখনোই সহজ ছিল না। তবে এমন সময়ে সন্তানদের বড় করে তোলা, যেখানে আশপাশে কেবল স্ক্রিন আর স্ক্রিন ও এগুলো মানুষের ওপর ঠিক কী প্রভাব ফেলছে তা আমরা এখনো পুরোপুরি বুঝতে শিখছি তখন উদ্বিগ্ন হওয়াটাই স্বাভাবিক।
যুক্তরাজ্যের ‘ইউনিভার্সিটি অফ এসেক্স’-এর ডিজিটাল কমিউনিকেশন বিষয়ের রিডার ড. টনি স্যাম্পসন বলেন, অভিভাবকদের এমন পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত বা বিভ্রান্ত হওয়া উচিত নয়।
“উদ্বিগ্ন মা-বাবাদের মধ্যে সংবাদমাধ্যমের তৈরি করা আতঙ্ক বা গুজবে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা দেখা যায়। তারা মনে করতে শুরু করেন, সব টিনএজারের মস্তিষ্কই বুঝি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের আসক্তির জন্য স্থায়ীভাবে তৈরি হয়ে গেছে।”
শিশু ও টিনএজারদের মস্তিষ্কে ‘নিউরোপ্লাস্টিসিটি’ বা মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে। ফলে বড়দের তুলনায় তাদের মস্তিষ্ক যে কোনো পরিস্থিতি সামলে দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে পারে।
ড. স্যাম্পসন বলেছেন, “সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কীভাবে মনোযোগের ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে তা নিয়ে আমরা প্রচুর লেখালেখি পড়ি। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম মানুষের মনোযোগের সক্ষমতা ছোট বা নষ্ট করে দেয় না, বরং মনোযোগকে কেড়ে নিয়ে তাদের বাণিজ্যিক কনটেন্ট বা বিজ্ঞাপনের দিকে ঘুরিয়ে দেয়।
“প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহার আসলে মানুষের সৃজনশীলতা, নতুন কিছু অনুসন্ধান ও শিক্ষার জন্য মস্তিষ্কের এসব নিউরোপ্লাস্টিসিটিকে আরও বাড়িয়ে তুলতে সাহায্য করতে পারে।”