Published : 17 Jul 2026, 12:12 PM
গ্রীষ্মের ছুটিতে পৃথিবীর যে প্রান্তেই যাওয়া যাক না কেন অনেকের ক্ষেত্রে মশার কামড় খাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত। মশার কামড়ে তাদের দেহজুড়ে চুলকানি ও বড় বড় লাল ছোপ পড়ে যায়, যা সপ্তাহের পর সপ্তাহ ভোগায়।
অথচ একই জায়গায় থাকা অন্য আরেকজন হয়ত মশার একটিও কামড় খেলেন না, আর খেলেও তা কেবল ছোট্ট লাল বিন্দুর মতো হয়ে মিলিয়ে যায়। অনেকেই রসিকতা করে বলেন, মশার কামড় খাওয়া মানুষের রক্ত বুঝি ‘বেশি মিষ্টি’।
মশার কামড়ে অতিষ্ঠ হয়ে অনেকেই ভাবেন, ‘সব মশা কি কেবল আমাকেই কামড়ায়?’ এই রসিকতা বা সাধারণ ধারণাটি বৈজ্ঞানিকভাবে সত্য।
বিবিসি লিখেছে, মানুষের দেহ থেকে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ‘বায়োলজিক্যাল মার্কার’ বা জৈবিক উপাদান নির্গত হয়, যার মধ্যে রয়েছে নিঃশ্বাস ও দেহের গন্ধ। এসব উপাদান নির্ধারণ করে কার প্রতি মশার আকর্ষণ কেমন হবে।
কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এসব শারীরিক উপাদানের আকর্ষণ মশাদের কাছে এতটাই তীব্র থাকে যে, তারা হয়ে ওঠেন ‘মশার চুম্বক’। দূর থেকে দেহের বিভিন্ন সংকেত বিশ্লেষণ করে মশারা যেভাবে টার্গেট খুঁজে নেয় তা এইরকম–
কার্বন ডাই-অক্সাইডের সংকেতেই মশার হানা
মানুষের রক্ত চুষে খায় কেবল স্ত্রী মশা। ডিম উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিনের উৎস হিসেবে এরা মানুষের রক্তের সন্ধান করে। প্রায় ১০ মিটার বা ৩৩ ফুট দূর থেকেই এরা দৃষ্টিশক্তি ও ঘ্রাণশক্তি ব্যবহার করে নিজেদের লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করতে পারে। এ কাজে এদের অন্যতম প্রধান নিশানা মানুষের নিঃশ্বাস ও ত্বকের মাধ্যমে বাতাসে ছড়িয়ে পড়া কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাস।
মানুষের নিঃশ্বাসের সঙ্গে বের হওয়া কার্বন ডাই-অক্সাইডের সংকেত মশাদের ঘ্রাণেন্দ্রিয়কে সক্রিয় করে তোলে এবং মানুষের দিকে ছুটে যেতে প্ররোচিত করে। যেহেতু প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ শিশুদের তুলনায় বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড ত্যাগ করে ফলে মশাদের কাছে বড়রাই বেশি আকর্ষণীয় লক্ষ্যবস্তু।
নিঃশ্বাসের এ গ্যাসের প্রতি আকর্ষণ থাকায় মশারা মানুষের বাইরে অন্যান্য উৎস থেকে নির্গত কার্বন ডাই-অক্সাইডের দিকেও ছুটে যায়। এ কারণেই মশা ধরার ফাঁদ তৈরিতে ‘ড্রাই আইস’ ও বোতলজাত কার্বন ডাই-অক্সাইড বেশ কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হয়।
দেহের উত্তাপ বাড়ায় মশার আকর্ষণ
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, মশারা দেহের তাপ ও আর্দ্রতার প্রতি তীব্রভাবে আকৃষ্ট হয়। আর কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাসের উপস্থিতি তাপের প্রতি তাদের এ আকর্ষণকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
এ কারণে গর্ভবতী নারীরা সাধারণ নারীদের তুলনায় দ্বিগুণ মশার কামড়ের শিকার হন। গর্ভাবস্থায় দেহে মেটাবলিক বা বিপাকীয় চাহিদা বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি শ্বাস-প্রশ্বাসের পরিমাণও বেড়ে যায়।
ফলে গর্ভবতী নারীদের দেহ থেকে বেশি মাত্রায় তাপ ও কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হয়। যুক্তরাজ্যের ‘ডারহাম ইউনিভার্সিটি’র পাবলিক হেলথ এন্টারমোলজি বিষয়ের অধ্যাপক স্টিভ লিন্ডসে বিষয়টিকে সহজভাবে ব্যাখ্যা করে বলেছেন, “গর্ভবতী নারীদের দেহের ভেতর যেন ছোট্ট একটি চুল্লি জ্বলতে থাকে। ফলে তাদের দেহ বেশি উত্তপ্ত থাকে।”
একই কারণে যারা শারীরিক কসরত বা ব্যায়াম করেন, বিশেষ করে ব্যায়াম করার সময় এবং ঠিক পর পর তারা সাময়িকভাবে মশাদের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন।
ব্যায়ামের কারণে দেহে মেটাবলিক চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন বাড়ে এবং দেহ অনেক গরম হয় ও ঘেমে যায়। এ ছাড়া অপেক্ষাকৃত ভারী বা বড় গড়নের মানুষেরাও সাধারণত বেশি তাপ উৎপন্ন করেন এবং বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড ত্যাগ করেন, যা মশাদের তাদের দিকে টেনে আনে।
ত্বকের গন্ধই নির্ধারণ করে মশার কামড়
মশারা যখন লক্ষ্যবস্তুর আরও কাছাকাছি বা ১০ মিটার বা ৩৩ ফুটেরও কম দূরত্বে চলে আসে তখন এরা ত্বক ও নিঃশ্বাসের গন্ধের মতো ধারাবাহিক কিছু সংকেত বিশ্লেষণ করে নিশ্চিতভাবে কামড়ানোর জায়গা নির্বাচন করে।
অধ্যাপক স্টিভ লিন্ডস বলেছেন, কাকে মশা কামড়াবে তা নির্ধারণ করে দেহের গন্ধ।
“সূক্ষ্ম ও দ্রুত বাতাসে মিলিয়ে যাওয়া রাসায়নিক উপাদানগুলোই এখানে মূল পার্থক্য গড়ে দেয়। মশারা রাসায়নিক জগতেরই বাসিন্দা।”
অনেকেই মনে করেন যাদের রক্ত ‘মিষ্টি’ তাদের মশা বেশি কামড়ায়। তবে স্টিভ লিন্ডসে ও অন্যান্য বিজ্ঞানীরা এ প্রচলিত ধারণাটিকে ভুল প্রমাণ করেছেন।
গবেষণায় উঠে এসেছে, মশারা আকৃষ্ট হয় মানুষের ত্বকের নিজস্ব গন্ধের প্রতি। মানুষের ত্বকে থাকা ‘মাইক্রোবায়োম’ বা অণুজীব ত্বকের কার্বোহাইড্রেট, ফ্যাটি অ্যাসিড ও পেপটাইডগুলোকে ভেঙে ‘ভোলাটাইল অর্গানিক কম্পাউন্ড’-এ রূপান্তর করে, যা সহজেই বাতাসে মিলিয়ে যায় এবং মশারা এই গন্ধের পার্থক্য ধরতে পারে। মানুষের ত্বকে এমন প্রায় ৫০০টিরও বেশি উদ্বায়ী জৈব যৌগ থাকে।
মানুষের ত্বকে থাকা অ্যামোনিয়া ও ল্যাকটিক অ্যাসিডের প্রতি মশারা এমনিতেই আকৃষ্ট হয়। তবে ত্বকে ‘কার্বক্সিলিক অ্যাসিড’ থাকলে মশাদের এ আকর্ষণ বহুগুণ বেড়ে যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘রকফেলার ইউনিভার্সিটি’র একদল গবেষক এ নিয়ে একটি পরীক্ষা চালিয়েছেন। তারা ৬৪ জন ব্যক্তির ত্বকের গন্ধ বিশ্লেষণের জন্য তাদের হাতার অংশে একটানা ছয় ঘণ্টা নাইলনের কাপড় পরিয়ে রাখেন।
পরবর্তী সময়ে এ নাইলন কাপড়ের টুকরোগুলোকে সুগন্ধি সংগ্রহের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে মশাদের সামনে দেওয়া হলে এরা স্পষ্টভাবেই এমন ব্যক্তিদের কাপড়ের দিকে বেশি ছুটে যায় যাদের ত্বক থেকে বেশি মাত্রায় কার্বক্সিলিক অ্যাসিড নির্গত হয়েছিল।
গবেষকেরা প্রতিটি মানুষের মশা আকর্ষণের সক্ষমতার একটি স্কোর বা মান নির্ধারণ করেছেন। তারা বলছেন, সবচেয়ে বেশি মশা আকর্ষণকারী ব্যক্তির স্কোর সবচেয়ে কম আকর্ষণকারীর তুলনায় প্রায় ১০০ গুণ! এ পার্থক্যের বিষয়টি বছরের পর বছর ধরে একই রকম থাকে, মানুষের জীবনযাত্রার মান পরিবর্তন হলেও এর কোনো হেরফের হয় না।
এ বিষয়ে অধ্যাপক স্টিভ লিন্ডসে বলেছেন, “মশাদের কাছে আপনার আকর্ষণীয় হয়ে ওঠার বিষয়টি স্থায়ী বা নির্ধারিত থাকে।”
ত্বকের মাইক্রোবায়োম বা অণুজীবও মানুষের মশার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
নেদারল্যান্ডসের ‘ওয়াগেনিংগেন ইউনিভার্সিটি’র গবেষকেরা বলেছেন, ‘অ্যানোফিলিস’ বা ম্যালেরিয়ার জীবাণু বাহক মশা যাদের বেশি কামড়ায় তাদের ত্বকের ব্যাকটেরিয়ার ধরন অন্যদের চেয়ে আলাদা। এদের ত্বকে ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা বেশি হলেও বৈচিত্র্য বা প্রকারভেদ থাকে কম।
মানুষের দেহের গন্ধ তৈরিতে ত্বকের ব্যাকটেরিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলেই এমনটা হয়ে থাকে। কারণ ব্যাকটেরিয়া না থাকলে মানুষের ঘামে কোনো গন্ধই পাওয়া যায় না।
যমজ সন্তানদের ওপর করা বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে, অভিন্ন বা আইডেন্টিক্যাল বা একই রকম দেখতে যমজদের মশারা সমানভাবেই আকর্ষণ করে।
অন্যদিকে ভিন্ন বা নন-আইডেন্টিক্যাল যমজদের ক্ষেত্রে মশার আকর্ষণের তীব্রতায় তারতম্য দেখা যায়। এ থেকে ইঙ্গিত মেলে, ত্বকের যে গন্ধের কারণে মশা বেশি কামড়ায় তা বংশগত বা জিনগতভাবেও উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া যেতে পারে।
সব মশার কামড়ের প্রতিক্রিয়া এক নয়
মশার কামড়ের পর মানুষের দেহের প্রতিক্রিয়া একেক জনের ক্ষেত্রে একেক রকম হতে পারে। ‘জিনোম-ওয়াইড অ্যাসোসিয়েশন’-এর গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার জিনের সঙ্গে মশার কামড়ের প্রতিক্রিয়ার জিনগত সম্পর্ক রয়েছে। এই জিনের সঙ্গে বিভিন্ন অ্যালার্জির জিনেরও মিল রয়েছে।
এ ছাড়া, কারও কারও ক্ষেত্রে মশার কামড়ে তীব্র চুলকানি ও বড় চাকা তৈরি হওয়ার প্রবণতা বেশি থাকে, যার কারণে তাদের মনে হতে পারে যে মশারা তাদেরই বেশি কামড়ায়।
এ বিষয়ে গবেষক ফার্গুসন বলেছেন, “কিছু মানুষ মনে করেন তাদের বেশি কামড়ানো হচ্ছে কারণ তাদের দেহে প্রতিক্রিয়া বেশি দেখা যায়। আবার এমনও অনেক মানুষ আছেন যাদের প্রায়ই মশা কামড়ায় তবে তাদের দেহে তেমন কোনো প্রতিক্রিয়াই হয় না।”
জৈবিকভাবে কেউ মশার সহজ লক্ষ্যবস্তু হোক আর নাই হোক মশাদের রেডার থেকে পুরোপুরি সুরক্ষিত কেউ নন।
ফার্গুসনের ভাষায়, “আপনার যদি মনেও হয় যে আপনাকে মশা কামড়ায় না তবুও আপনার নিজের সুরক্ষার ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।”