Published : 18 Jul 2026, 11:24 AM
কেউ দেখেছেন নিজ চাখে, কেউ শুনেছেন গল্প, কেউ জেনেছেন নানাভাবে। কিন্তু প্রভাব প্রায় একইরকম। সবার হৃদয়েই চিরস্থায়ী জায়গা পেয়ে গেছেন স্যার গ্যারি সোবার্স। অনেকের চোখেই তিনি সর্বকালের সেরা ক্রিকেটার, তার শ্রেষ্ঠত্ব অবিসংবাদিত। এমন একজনের প্রয়াণে শোকের ছায়া নেমে এসেছে গোটা ক্রিকেট বিশ্বে। তার কীর্তি, তার প্রভাব, তার শ্রেষ্ঠত্বের কথা তুলে ধরছেন কিংবদন্তিদের অনেকেই।
আইসিসি বর্ষসেরা ক্রিকেটারের পুরস্কারের নামকরণ করা হয়েছে তার নামেই, ‘স্যার গারফিল্ড সোবার্স ট্রফি।’ আইসিসি সভাপতি জয় শাহ সেটি মনে করিয়ে দিয়ে বললেন, প্রজন্মের পর প্রজন্মে রয়ে গেছে সোবার্সের আবেদন।
“বিশ্ব ক্রিকেটের মহীরুহ এবং সত্যিকারের ক্রীড়া কিংবদন্তী স্যার গারফিল্ড ‘গ্যারি’ সোবার্সের প্রয়াণে আমি গভীরভাবে শোকাহত। তার অতুলনীয় সাফল্য এবং খেলার প্রতি তার অবিস্মরণীয় অবদান বিশ্বজুড়ে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ক্রিকেটারকে অনুপ্রাণিত করেছে। তার পরিবার, বার্বাডোজের জনগণ এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অঙ্গনের প্রতি আমার আন্তরিক সমবেদনা।
আইসিসি তার নামে বর্ষসেরা পুরুষ ক্রিকেটার পুরস্কারটির নামকরণ করে তার কীর্তিকে বহু আগেই স্বীকৃতি দিয়েছে। তার আত্মা চিরশান্তি লাভ করুক।”
ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিতেই ৩৬৫ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলেছিলেন সোবার্স। প্রথম সেঞ্চুরিতে এত বড় ইনিংস খেলতে পারেননি আর কেউ। সবচেয়ে কম বয়সে ট্রিপল সেঞ্চুরির রেকর্ডও এখনও সেটিই। ৩৬ বছর টেস্টের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত স্কোরের রেকর্ড ছিল এটি। ১৯৯৪ সালে সেই রেকর্ড ভেঙে ৩৭৫ রানের ইনিংস খেলেন ব্রায়ান লারা।
সেদিন মাঠে থেকেই লারাকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন সোবার্স। নানা সময়ে দুজনের ঘনিষ্ঠতা দেখা গেছে। পূর্বসূরীর বিদায়ে ত্রিনিদাদের রাজপুত্র বললেন, সোবার্সের কীর্তি কখনও ম্লান হবে না।
“আমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ ক্রিকেটার আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন।
তার পরিবারের প্রতিটি সদস্যের প্রতি আমার গভীর সমবেদনা, যারা তার পাশে ছিলেন এবং সবচেয়ে কঠিন সময়ে তাকে প্রয়োজনীয় শক্তি যুগিয়েছেন। এই অসহনীয় কঠিন সময়ে তারা যেন সান্ত্বনা ও শান্তি খুজে পান। শান্তিতে বিশ্রাম নিন, কিংবদন্তি। আপনার কীর্তি কখনও বিস্মৃত হবে না।”
সোবার্সের সঙ্গে একটি ছবি পোস্ট করে সাচিন টেন্ডুলকার স্মৃতিচারণা করেছেন তাদের দেখা হওয়ার সময়গুলোর। শেষবার দেখার কথাও বললেন ভারতের ক্রিকেট-ঈশ্বর।
“স্যার গ্যারি যে আর নেই, এটা মেনে নেওয়া সত্যিই খুব কঠিন। বছরের পর বছর আমাদের কাটানো স্মৃতিগুলো মনে করছি; ২০০৩ সালের বিশ্বকাপে টুর্নামেন্ট সেরা খেলোয়াড়ের ট্রফিটা তার হাত থেকে তুলে নেওয়া থেকে শুরু করে, শততম মাইলফলকে পৌঁছানোর পর তার দেওয়া আন্তরিক অভিনন্দন পর্যন্ত। তিনি সবসময়ই অসাধারণ অমায়িক ছিলেন।
কয়েক বছর আগে লন্ডনে আমাদের দেখা হওয়ার সেই দিনগুলোতে বারবার ফিরে যাাচ্ছে আমার মন। আমরা শুধু বসে খেলা নিয়ে গল্প করছিলাম। এই মুহূর্তে এটা ভেবে আমার খুব কষ্ট হচ্ছে যে, সেটাই ছিল আমাদের শেষ দেখা। তিনি সত্যিই ছিলেন ‘একমাত্র ও অদ্বিতীয়’। তার অভাব ভীষণভাবে অনুভব করব। শান্তিতে থাকুন, স্যার গ্যারি।”
গল্প শুনে সোবার্সের প্রেমে পড়ে যাওয়াদের একজন দিলিপ ভেংসারকার। ক্যারিবিয়ান মহানায়কের শ্রেষ্ঠত্ব অবলীলায় মেনে নেন ভারতের ব্যাটিং গ্রেট।
“সত্যি বলতে, আমি সামনাসামনি তার খেলা কখনও। কিন্তু তার গল্প অনেক শুনেছি। অবশ্য তার ক্লিপ এবং তার ব্যাটিংয়ের যে চলচ্চিত্রগুলো রেকর্ড করা হয়েছে, সেগুলোও দেখেছি...। আমি বলব, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ অলরাউন্ডার তিনি।”
অবসরের পর সোবার্স যখন অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড এবং ভারতে ম্যাচ দেখতে এসেছিলেন, তখন তার সঙ্গে বেশ কয়েকবার দেখা হওয়ার স্মৃতিও মনে করলেন ভেংসারকার।
সোবার্সের বিপক্ষে ১৯টি টেস্টে খেলেছেন স্যার জেফ বয়কট। খুব ভালো করেই তাকে চেনেন এই ইংলিশ গ্রেট। মাঠের বাইরের সোবার্সকে কিছুটা তুলে ধরলেন তিনি।
“তিনি একজন মহতারকা এবং খুবই সহজ-সরল স্বভাবের একজন মানুষ ছিলেন। আমি তাকে কখনও অভিযোগ করতে বা অন্য ক্রিকেটারদের নিয়ে খারাপ কথা বলতে শুনিনি। বড় মনের মানুষ ছিলেন, নিজের সময় ও পরামর্শ দিয়ে উদার ছিলেন।
যারা তাকে তার সেরা সময়ে দেখেছেন, তাদের কাছে এই মহান ব্যাটসম্যান, সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডার, একজন আইকন, ‘জীবনে একবারই আসে’ এমন একজন ব্যতিক্রমী ক্রিকেটারের চমৎকার স্মৃতি থাকবে।”
ভারতের অফ স্পিনিং গ্রেট হারভাজান সিংয়ের চোখে শ্রেষ্ঠত্বের সংজ্ঞা সোবার্স।
“ক্রিকেট বিশ্ব তার অন্যতম উজ্জ্বল রত্নকে হারালো। স্যার গ্যারি সোবার্স ছিলেন কিংবদন্তির চেয়েও বেশি কিছু—তিনি ছিলেন গ্রেটনেসের জীবন্ত প্রতিমূর্তি, যিনি তার অসাধারণ প্রতিভা ও বিনয় দিয়ে প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করেছেন। স্যার, বিশ্বজুড়ে ক্রিকেটপ্রেমীদের হৃদয়ে আপনার কীর্তি চিরকাল বেঁচে থাকবে।
শান্তিতে থাকুন, স্যার গ্যারি সোবার্স। আপনাকে কখনও ভোলা যাবে না।”
ভারতের ব্যাটিং গ্রেট ভিভিএস লক্ষ্নণের মতে, ক্রিকেট ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবেন সোবার্স।
“স্যার গারফিল্ড সোবার্সের প্রয়াণে গভীরভাবে শোকাহত। তিনি ছিলেন এই খেলার সত্যিকারের এক কিংবদন্তী, যার অসাধারণ দক্ষতা, আভিজাত্য এবং ক্রীড়াসুলভ মনোভাব বিশ্বজুড়ে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ক্রিকেটারকে অনুপ্রাণিত করেছে।
ক্রিকেটের সমৃদ্ধ ইতিহাসে তার কীর্তি চিরকাল থেকে যাবে। তার পরিবার, প্রিয়জন এবং সমগ্র ক্রিকেট সমাজের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা।”
স্বীকৃত ক্রিকেটে ওভারে ছয়টি ছক্কা হাঁকানো প্রথম ব্যাটসম্যান ছিলেন সোবার্স। কাউন্টি চ্যাম্পিয়নশিপে তার সেই কীর্তির ৩৯ বছর পর টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে এক ওভারে ছয়টি ছক্কা মেরেছিলেন ইউভরাজ সিং। ভারতের বিশ্বকাপজয়ী অলরাউন্ডার সেই ছক্কার কীর্তি দিয়েই জানালেন শ্রদ্ধাঞ্জলি।
“এক ওভারে ছয়টি ছক্কা হাঁকানো প্রথম ব্যক্তি হিসেবে স্যার গারফিল্ড সোবার্স বিশ্বকে দেখিয়েছিলেন যে, শ্রেষ্ঠত্বের কোনো সীমা নেই। ক্রিকেট বিশ্বে তিনি কী ছিলেন, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। মাঠে এমন সব কাজ করেছেন, যা বেশিরভাগ লোকে কেবল স্বপ্নই দেখতে পারে। তিনি সেসব করেছেন সাবলীলতা, নম্রতা ও আনন্দের সঙ্গে।”
ক্রিকেটার হিসেবে সোবার্সের মতো আর কাউকে দেখেন না আর্জুনা রানাতুঙ্গা। শ্রীলঙ্কার বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক শোনালেন তার নিজের জীবন ও ক্যারিয়ারে এই মহাতারকার অবদান।
“ক্রিকেটে অনেকেই উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছেন, কিন্তু স্যার গ্যারির কীর্তির সমকক্ষ কেউ নেই। তিনি নিঃসন্দেহে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ক্রিকেটার ছিলেন।
আমার যৌবনে স্যার গ্যারির সঙ্গে সাক্ষাৎ হওয়াটা আমার জন্য অত্যন্ত সৌভাগ্যের ছিল। কারণ তার অবিরাম পথনির্দেশনা না থাকলে, আমি হয়তো আজকের এই ক্রিকেটার হতে পারতাম না। ১০ বছর আগে তার ৮০তম জন্মদিনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। এই মাসের শেষে তার ৯০ বছর বয়স হতো। স্যার গারফিল্ড ছিলেন এক অনন্যসাধারণ নেতা; তিনি অনেকের কাছেই মেন্টর ছিলেন, কিন্তু আমার কাছে তিনি ছিলেন একজন প্রিয় বন্ধু। যখন অন্য কেউ আমার মধ্যে সম্ভাবনা দেখেনি, তখন স্যার গ্যারিই তা দেখেছিলেন। আমার অর্জনগুলো তার কীর্তিরই প্রতিফলন।”
ভারতের ১৯৮৩ বিশ্বকাপজয়ী দলের অলরাউন্ডার মাদান লালের মতে, অলরাউন্ডাদের শিরোমনি সোবার্স। এমন কেউ আর কখনও আসবে না বলেই মনে করেন তিনি।
“এমন অলরাউন্ডার আর কখনও জন্মায়নি, ভবিষ্যতেও আর কেউ আসবে না। বোলার, ব্যাটসম্যান এবং ফিল্ডার হিসেবে, একজন সত্যিকারের অলরাউন্ডার কেমন হওয়া উচিত, গ্যারি সোবার্স সেই মানদণ্ড স্থাপন করেছেন। খেলার প্রতিটি বিভাগেই তিনি ছিলেন অনন্য। একারণেই তাকে বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ অলরাউন্ডার হিসেবে গণ্য করা হতো।
কিংবদন্তির চেয়েও বেশি কিছু ছিলেন স্যার গ্যারি - তিনি ছিলেন শ্রেষ্ঠত্বের এক জীবন্ত সংজ্ঞা, যিনি তার অসাধারণ প্রতিভা এবং বিনয় দিয়ে প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করেছেন। স্যার, বিশ্বজুড়ে ক্রিকেটপ্রেমীদের হৃদয়ে আপনার কীর্তি চিরকাল বেঁচে থাকবে।”
সোবার্সের ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষেই ১৯৭১ সালে অভিষেক সিরিজে ৭৭৪ রানের অবিস্মরণীয় কীর্তি গড়েছিলেন সুনিল গাভাস্কার। বরাবরই তিনি ছিলেন সোবার্সের গুণমুগ্ধ, দুজনের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগও ছিল। গোটা ক্রিকেট দুনিয়ার সবার অনুভূতির মূল সুর যেন ফুটে উঠল গাভাস্কারের প্রতিক্রিয়ায়।
“ক্রিকেট খেলাটির সবচেয়ে দুঃখের দিন সম্ভবত এটি। এই পৃথিবীতে বিচরণ করা সেরা ক্রিকেটারটি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। ক্রিকেটার স্যার গ্যারি সোবার্সের শ্রেষ্ঠত্ব কোনো ভাষায় পুরোপুরি প্রকাশ করা সম্ভব নয় এবং ছেলেবেলায় কেউ প্রথমবার ব্যাট বা বল হাতে তুলে নেওয়ার সময় যা যা স্বপ্ন দেখে, সোবার্স ছিলেন সেসবেরই মূর্ত প্রতীক...।”