Published : 21 Jun 2026, 10:15 AM
জামায়াতে ইসলামীও এখন মুক্তিযুদ্ধের গৌরবে অংশীদার হতে চায়। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী দলটির এই ভোলবদলের রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবেই খোদ সংসদে দাঁড়িয়ে দলের আমির ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান নিজেকে ‘মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান’ বলে পরিচয় দেন। শুধু তা-ই নয়, দলের আরেক শীর্ষ নেতা, সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা ও জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরও নিজেকে দাবি করেন ‘শিশু মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে। তবে মুক্তিযুদ্ধের এই কৃতিত্ব নেওয়ার প্রতিযোগিতায় দলের সবাইকে ছাপিয়ে গেলেন জামায়াতের তরুণ সংসদ সদস্য আব্দুল মুনতাকিম।
গত কয়েকদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ দেশের মূলধারার সংবাদমাধ্যমেও নীলফামারী-৪ আসন থেকে নির্বাচিত জামায়াতের সংসদ সদস্য আব্দুল মুনতাকিমের ওই বক্তব্য নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা অব্যাহত রয়েছে। সংসদে দাঁড়িয়ে তিনি বলছেন, “আমার বাবা, আমার দাদা যুদ্ধে শহীদ। আমার আব্বারা সাত ভাই, চারজন মুক্তিযোদ্ধা। আমার দাদারা ১৯ জন, ১১ জন মুক্তিযোদ্ধা। আমার পরিবারে ৪৭ জন মুক্তিযোদ্ধা। আমার মা মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক।” পরে জুলাই অভ্যুত্থান নিয়ে আলাপের একপর্যায়ে নিজেকে একজন ‘জুলাই যোদ্ধা’ বলে দাবি করেন তিনি।
তবু তিনি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কথা বলতে না পারায় আক্ষেপ করেন সংসদে। তার এই বক্তব্য নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার শুরুতেই জানা যায়, আব্দুল মুনতাকিমের নিজের জন্ম ১৯৮১ সালে। তার বাবা যদি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়ে থাকেন, তাহলে তিনি ১৯৮১ সালে জন্মালেন কীভাবে? পরে আরও জানা গেল, তার বাবা আসলে এখনো জীবিত আছেন। তিনি নিজেই ভুল স্বীকার করে বলেছেন, বিষয়টি ‘মুখ ফসকে’ বলে ফেলেছেন এবং সংসদের বক্তব্য সংশোধনের জন্য ইতিমধ্যে স্পিকার বরাবর চিঠি দিয়েছেন বলেও জানিয়েছেন।
আব্দুল মুনতাকিমের ওই বক্তব্য নিয়ে বিস্তর বলা হয়ে গিয়েছে; তাই ওই বক্তব্য নিয়ে কথা না বাড়িয়ে তিনি কেন এমনটি বললেন এবং দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান সংসদে এহেন অসত্য তথ্য প্রদানের পর রাজনীতিবিদ হিসেবে ভবিষ্যতে তার গ্রহণযোগ্যতা কতটুকু থাকবে, সেদিকে দৃষ্টি ফেরানো প্রয়োজন।
বাংলাদেশের প্রথাগত রাজনীতি নিয়ে দেশের মানুষের হতাশা আছে। রাজনীতিবিদদের ক্রমাগত মিথ্যাচার দেশের মানুষকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। বিষয়টি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, তারা যা বলেন, জনগণ তার উল্টোটা বিশ্বাস করে; যা দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। সেই ক্ষতির মাত্রা বলে শেষ করা যাবে না।
রাজনীতিবিদদের অনেক সময়ই সত্য গোপন করতে হয়, তা জনগণ মেনেও নেয়। কিন্তু মিথ্যা কথা বলা কোনোভাবেই সমীচীন নয়। ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে ব্যবসা-বাণিজ্য, রাজনীতি, কূটনীতি—যে কোনো ক্ষেত্রেই আস্থা ও বিশ্বাসযোগ্যতাই একজন ব্যক্তিকে গ্রহণযোগ্য করে তোলে।
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর জেন-জি নেতৃত্ব এবং দেশের সর্ববৃহৎ ধর্মভিত্তিক দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতারা দেশের বৃহৎ দুই দল বিএনপি ও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ক্রমাগত মিথ্যাচার, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও গণতন্ত্র হত্যার অভিযোগ করে আসছেন এবং তারা ক্ষমতায় গেলে একটি ন্যায়ভিত্তিক ও ইনসাফের সমাজ প্রতিষ্ঠা করবেন বলে প্রতিশ্রুতিও দিয়ে যাচ্ছেন। তারা বলছিলেন, ‘দুই দলকে তো আমরা দেখেছি; এবার জামায়াতকে দেখা যাক।’ বলাবাহুল্য এই কথার ভিত্তিতে জামায়াতকে অনেকেই ভোট দিয়েছে বলে অনুমান করা যায়, অন্তত নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা তাই বলে। দলটি এখন সংসদে প্রধান বিরোধী দল।
বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান চেষ্টা করছেন তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে—সেটি ভালো দিক। জামায়াতে ইসলামীর সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ বগুড়ায় বিএনপির প্রতিমন্ত্রীর সন্তান-সন্ততি ও পরিবারের নামে ইউনিয়নের নামকরণ নিয়ে সংসদে সত্য তথ্য দিয়ে প্রশংসিত হয়েছেন। সেই তথ্যের কারণে সেই প্রতিমন্ত্রীকে মোটামুটি ভালো রকমের রাজনৈতিক মূল্য দিতে হয়েছে এবং হচ্ছে।
তবে জামায়াতের সদস্যরা সংসদে মাঝেমধ্যেই অসত্য অথবা আংশিক সত্য তথ্য দেন। যেমন ইসলামী ব্যাংক নিয়ে আলোচনা কালে দলের নেতারা বললেন, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ইসলামী ব্যাংক লাভ করতে শুরু করেছিল। তাদের বক্তব্যের পর অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য দিয়ে বলেন, প্রভিশন বাদ দিলে ইসলামী ব্যাংক আসলে লোকসান করেছে।
ফিরে আসি মূল কথায়; নিজ পরিবার নিয়ে মুখ ফসকে অসত্য কথা বলার কারণে আব্দুল মুনতাকিম সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে এই ধারণা হবে যে, তার মুখের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ প্রচার করবে—যিনি নিজের বাবা সম্পর্কে মুখ ফসকে ভুল তথ্য দেন, তাকে কীভাবে বিশ্বাস করা যায়? রাজনীতিবিদ হিসেবে তার কোনো গ্রহণযোগ্যতা থাকবে না। ব্যক্তি মুনতাকিমের গ্রহণযোগ্যতার পাশাপাশি তিনি তার দলের গ্রহণযোগ্যতাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলেছেন। তার কথা দেশের প্রথাগত নেতিবাচক রাজনীতির চেয়েও খারাপ পর্যায়ে গেছে বললে ভুল বলা হবে না। নতুন রাজনীতি ও ইনসাফের যে কথা আমরা শুনেছি, সেটি আমরা বাস্তবে দেখছি না।
দ্বিতীয় কথা, তিনি কেন এমনটি বললেন? সংসদীয় রাজনীতিতে জামায়াত খুবই ছোট একটি দল ছিল। এবারই প্রথম তারা এতগুলো আসন পেয়েছে। সুতরাং, দলের নেতা-কর্মীরা মনে করছেন, তাদের দল আগামীতে ক্ষমতায় আসতে পারে।
বাংলাদেশে ক্ষমতায় আসতে গেলে প্রয়োজন উদারপন্থী ও মধ্যবিত্ত মানুষসহ সাধারণ জনগণের সমর্থন, যারা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে মাত্রাতিরিক্ত বাড়াবাড়ি যেমন পছন্দ করেন না, তেমনি মুক্তিযুদ্ধকে ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা, মুক্তিযুদ্ধকে খাটো করা, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করার চেষ্টাও গ্রহণ করেন না।
এই বিবেচনায় থেকে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে নির্বাচনের আগে জামায়াতকে রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস, যুদ্ধাপরাধী, গণহত্যাকারীর দল হিসেবে গালমন্দ করেছে তার বহুদিনের মিত্র বিএনপি। এখনও প্রয়োজন হলেই মনে করিয়ে দিচ্ছে, একাত্তরে জামায়াতের ঘৃণ্য ভূমিকার কথা।
জামায়াতের ইসলামীর আমির ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান একসময় জাসদ করতেন। সংসদে তিনি নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান বলে দাবি করেছেন। বিরোধীদলীয় উপনেতা আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেছেন, “আজকে আমাদের অনেক বেশি করে রাজাকার, আলবদর বলার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমরা যারা এখানে বসে আছি, আমরা কেউ রাজাকার বা আলবদর ছিলাম না। আমরা জামায়াতে ইসলামীর বর্তমান নেতৃত্ব। যদি বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কথা বলেন, তবে আমিও একজন শিশু মুক্তিযোদ্ধা।”

সংসদ সদস্য মুনতাকিমের বক্তব্য ওই সব বক্তব্যেরই ধারাবাহিকতা। জামায়াতে ইসলামী বুঝতে পেরেছে যে, রাজাকার-আলবদর তকমা বজায় থাকলে ক্ষমতায় যাওয়া কঠিন হবে। বিরোধী দল থেকে এক ধাপ এগিয়ে দলকে ক্ষমতায় নিতে হলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তাদের অবদান রয়েছে—একথা বলতে হবে। জামায়াত যে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী দল এবং দলের তখনকার শীর্ষ নেতারা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে পাকিস্তানের পক্ষে গিয়ে বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন, সেটিকে কাউন্টার করতে হবে। তাই মুনতাকিম বলার চেষ্টা করেছেন, জামায়াতে শুধু রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস নয়, মুক্তিযোদ্ধাও রয়েছেন। যেমন সাতক্ষীরার শ্যামনগর থেকে একাধিকবার নির্বাচিত গাজী নজরুল ইসলাম মুক্তিযুদ্ধে রণাঙ্গনে যুদ্ধ করেছেন—সেই কথা স্পিকার ও খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা হাফিজ উদ্দিন আহমদ নিজেই সংসদে বলেছেন। আবার অষ্টম সংসদে নীলফামারী থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য মিজানুর রহমান চৌধুরীও মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন।
মুনতাকিমের বক্তব্য জামায়াতে ইসলামীর জন্য বুমেরাং হলেও জামায়াতে ইসলামী সম্মিলিতভাবে অনুভব করতে পেরেছে যে, ক্ষমতায় যেতে হলে মুক্তিযুদ্ধের কথা বলতে হবে এবং কেবল ২০২৪ সালের জুলাই-অগাস্ট গণহত্যার জন্য আওয়ামী লীগকে ফ্যাসিবাদ বলে গালমন্দ করলেই হবে না।
এটি একদিকে ভালো যে, নতুন প্রজন্মের জামায়াত নেতারা হয়তো একদিন তাদের পূর্বপুরুষদের কলঙ্কিত অতীতের জন্য জাতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবেন এবং দলকে পরিচ্ছন্ন করার চেষ্টা করবেন। তবে, দলের আরেক অংশ এর বিরোধী। তাদের মতে, আনুষ্ঠানিক ক্ষমা চাওয়ার একটি বিরাট রাজনৈতিক ঝুঁকি আছে। সেক্ষেত্রে প্রতিপক্ষ বলবে, জামায়াত যদি গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ না-ই করে থাকে, তাহলে তারা মাফ চাইল কেন? তাদের বিরুদ্ধে থাকা অপরাধগুলো তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রমাণিত হবে।
এই প্রসঙ্গে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি প্রধান আন্দালিব রহমান পার্থ সংসদে একটি গল্প বলেছেন। তিনি বলেন, ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলকে একজন বলেছিলেন যে, তিনি মদ্যপ (ড্রাঙ্ক)। জবাবে চার্চিল বলেছিলেন, “আমি আজকে মদ্যপ অবস্থায় আছি; কালকে ঠিক হয়ে যাব। কিন্তু তুমি কুৎসিত (আগলি); এবং তুমি কুৎসিতই থাকবে।” তিনি বলেন, সেরকম জামায়াতকে সারা জীবনের জন্য মুক্তিযুদ্ধে তাদের ভূমিকার জন্য কলঙ্ক (স্টিগমা) নিয়ে বাঁচতে হবে।
আব্দুল মুনতাকিম হয়তো দলকে এই কলঙ্ক থেকে বাঁচাতেই নিজের বাবা এবং পরিবার নিয়ে মিথ্যে কথা বলেছেন এবং মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ার পর নিজের ভুল স্বীকার করেছেন।
তার অবস্থা কেমন, সেটি নিয়ে একটি গল্প বলেই শেষ করব। এক দুষ্টু ছেলে রাতে এক গৃহস্থের গাছ থেকে ডাব চুরি করতে গেছে। গাছে উঠেছেও। কিন্তু বাড়ির মালিক টের পেয়ে গেছেন। তিনি গাছের কাছে এসে বললেন, “কে? ডাব গাছে কে রে?” দুষ্টু ছেলে জবাব দেয়, “চাচা, আমি আক্কাছ।” তিনি বলেন, “তুই এত রাতে গাছের মাথায় কী করছিস?” ছেলের জবাব, “চাচা, ঘাস কাটতে উঠেছি।” মুরুব্বি ক্ষিপ্ত হয়ে বললেন, “আরে ডাব গাছে কি ঘাস থাকে? গাধা কোথাকার!” ছেলের জবাব, “তাই তো দেখছি চাচা, এখানে কোনো ঘাস নাই। সেজন্যই নেমে আসতেছি।”
কামরান রেজা চৌধুরী পেশায় সাংবাদিক–সংসদীয় রাজনীতি নিয়ে প্রতিবেদক হিসেবে কাজ করছেন দুই দশকেরও বেশি। ই-মেইল: [email protected]