Published : 15 Jun 2026, 10:46 AM
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটকে ঘিরে হাওরবাসীর প্রত্যাশা স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেশি ছিল। চলতি বছরের অকালবন্যা, ফসলহানি, নদী ভরাট, জীববৈচিত্র্যের সংকট এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির মুখে হাওরাঞ্চলের জন্য ৫০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ দাবি করেছিল হাওরভিত্তিক বিভিন্ন সংগঠন। তাদের এই দাবি আবেগের ছিল না, ছিল বাস্তবতার। কারণ হাওরের সংকট এখন আর কেবল আঞ্চলিক নয়, তা জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে।
কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেটে হাওরাঞ্চলের জন্য সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ রাখা হয়েছে। প্রশ্ন হলো—এই বরাদ্দ কি হাওরবাসীর প্রত্যাশার প্রতি ন্যায্যতা দিয়েছে, নাকি আবারও প্রয়োজন ও প্রাপ্তির দীর্ঘ ব্যবধানের সূচনা করেছে?
হাওরের গুরুত্ব কেবল ভৌগোলিক বা পরিবেশগত নয়, এটি অর্থনৈতিকভাবেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের মোট বোরো ধান উৎপাদনের একটি বড় অংশ আসে হাওরাঞ্চল থেকে, যা জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি। একই সঙ্গে দেশের মিঠাপানির মৎস্যসম্পদের বড় অংশ জোগায় এই জলাভূমি। ফলে হাওরের ফসলহানি মানে শুধু কৃষকের ক্ষতি নয়, জাতীয় খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর চাপ। আবার হাওরের জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হওয়া মানে শুধু পরিবেশগত ক্ষতি নয়, সামগ্রিক জাতীয় অর্থনীতির ক্ষতি। এ কারণেই হাওরের সংকটকে আঞ্চলিক সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি সরাসরি বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা, পরিবেশ সুরক্ষা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে যুক্ত।
সংখ্যার হিসাবে আড়াই হাজার কোটি টাকা ছোট কোনো অঙ্ক নয়। কিন্তু অর্থনীতিতে কোনো বরাদ্দের সার্থকতা তার পরিমাণে নয়, বরং তার উপযোগিতায়। যে অঞ্চলের ওপর দেশের খাদ্য নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ নির্ভরশীল, যে অঞ্চল প্রতিবছর জলবায়ু দুর্যোগের প্রথম আঘাত সহ্য করে, যে অঞ্চল জাতীয় মৎস্য উৎপাদনে বড় অবদান রাখে—সেই অঞ্চলের জন্য বরাদ্দ কতটা পর্যাপ্ত, তা নির্ধারণ করা উচিত ছিল প্রয়োজনের ওপর ভিত্তি করে।
অবশ্য এবারের বাজেটে অবকাঠামো, শিক্ষা, জলবায়ু অভিযোজন, সামাজিক সুরক্ষা এবং পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ রয়েছে। হাওর এলাকার এলিভেটেড রোড প্রকল্প, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও সেতু পুনর্নির্মাণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সুরমা-কুশিয়ারা অববাহিকার বন্যা ব্যবস্থাপনা প্রকল্প নিঃসন্দেহে প্রয়োজনীয়। দীর্ঘদিন ধরে বিচ্ছিন্ন যোগাযোগব্যবস্থা, দুর্বল শিক্ষা অবকাঠামো এবং দুর্যোগজনিত ক্ষয়ক্ষতি হাওরবাসীর উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করেছে। ফলে এসব খাতে বিনিয়োগকে স্বাগত জানাতেই হয়।
কিন্তু মূল সমস্যাটা অন্য জায়গায়। বাজেটের বড় অংশই মূলত চলমান প্রকল্পগুলোর ধারাবাহিক বরাদ্দ মাত্র। নতুন কোনো যুগান্তকারী দর্শন বা দীর্ঘমেয়াদি স্থায়ী সমাধানের পরিকল্পনা এখানে খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। অর্থাৎ হাওরের সংকটের সাময়িক উপশমের চেষ্টা আছে, কিন্তু সমস্যার মূল কারণগুলোর দিকে পর্যাপ্ত মনোযোগ নেই।
এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো অকালবন্যা। প্রতিবছর হাওরে ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণে শত শত কোটি টাকা ব্যয় হয়। আবার প্রতিবছরই অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। তদন্তও হয়। তারপর পরের বছর আবার একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে। প্রশ্ন হলো—এই বিশাল ব্যয় কি সত্যিই হাওরকে রক্ষা করতে পারছে, নাকি আমরা একটি ব্যর্থ ব্যবস্থার পেছনেই বছরের পর বছর টাকা ঢেলে যাচ্ছি?
হাওরবাসীর দাবি ছিল নদী ও বিল পুনঃখননের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকার দীর্ঘমেয়াদি মেগা প্রকল্প নেওয়ার এবং চলতি বাজেটে অন্তত পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রাথমিক বরাদ্দ রাখার। কারণ হাওরের সমস্যা কেবল বাঁধের নয়, এটি মূলত নদীকেন্দ্রিক জলপ্রবাহ ব্যবস্থার সংকট। নদী ভরাট হতে থাকবে, জলধারণ ক্ষমতা কমবে, খাল-ছড়া নাব্য হারাবে—আর আমরা যদি শুধু বাঁধ উঁচু করতে থাকি, তবে সেটি সমস্যার স্থায়ী সমাধান আনবে না। বাঁধ উঁচু করা আসলে মূল রোগের চিকিৎসা না করে বাহ্যিক উপসর্গের চিকিৎসা করার মতো।
সুরমা-কুশিয়ারা অববাহিকার জন্য ১০০ কোটি টাকার বরাদ্দ গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা সংকটের গভীরতার তুলনায় খুবই সামান্য। হাওরের জন্য এখন প্রয়োজন একটি সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা, যেখানে নদী, বিল, জলাধার, বাঁধ, নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং জলবায়ুর তথ্য একসঙ্গে বিবেচনা করা হবে।
কৃষি খাতেও একই চিত্র দেখা যায়। চলতি বছরে হাওরের হাজার হাজার কৃষক ফসলহানির শিকার হয়েছেন। অনেকেই ঋণগ্রস্ত হয়েছেন, অনেকে চাষের পুঁজি হারিয়েছেন। অথচ কৃষি বীমা এখনো পরীক্ষামূলক স্তরেই রয়ে গেছে, বাস্তবে কার্যকর হয়নি। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য বিশেষ কোনো পুনর্বাসন কর্মসূচিও বাজেটে স্পষ্ট নয়। কৃষক কার্ড, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ এবং সার ভর্তুকির উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হলেও জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের জন্য আলাদা সুরক্ষা ব্যবস্থা না থাকলে এগুলোর কার্যকারিতা সীমিত হয়ে পড়ে।
বিশ্বের বহু দেশে কৃষি বীমা কৃষকের নিরাপত্তা বলয় হিসেবে কাজ করে। বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় শিকারদের অন্যতম হাওরের কৃষকেরা। তাই কৃষি বীমাকে আর পরীক্ষামূলক ধারণা হিসেবে না রেখে, জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করার সময় এসেছে।
তবে এবারের বাজেটের একটি ইতিবাচক দিক হলো টাঙ্গুয়ার হাওরের সহব্যবস্থাপনা প্রকল্পের প্রত্যাবর্তন। প্রায় ২৫৯ কোটি টাকার এই উদ্যোগ কেবল একটি প্রকল্প নয়, এটি একটি আদর্শগত সিদ্ধান্তের প্রশ্ন। কারণ পৃথিবীর অভিজ্ঞতা বলে, স্থানীয় জনগণকে বাদ দিয়ে কোনো জলাভূমি দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণ করা যায় না। টাঙ্গুয়ার হাওরকে বাঁচাতে হলে স্থানীয় জেলে, কৃষক ও বাসিন্দাদের অংশীদার করতেই হবে।
কিন্তু এখানেও সতর্কতার প্রয়োজন আছে। অতীতে বহু প্রকল্প কাগজে-কলমে সফল হলেও বাস্তবে কাঙ্ক্ষিত ফল দেয়নি। তাই প্রশ্ন হলো, নতুন সহব্যবস্থাপনা প্রকল্প কি স্থানীয় মানুষের প্রকৃত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারবে, নাকি এটিও আবারও প্রকল্পভিত্তিক আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার আরেকটি সংস্করণ হয়েই থাকবে?
জলবায়ু অভিযোজন খাতে প্রায় এক হাজার ২০০ কোটি টাকার বিভিন্ন উদ্যোগ অবশ্যই আশাব্যঞ্জক। কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হলো, এর একটা বড় অংশ আন্তর্জাতিক অনুদানের ওপর নির্ভরশীল। রাষ্ট্র নিজে এখানে কতটা বিনিয়োগ করছে, সেটিও একটি বড় প্রশ্ন। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা কোনো দাতা-নির্ভর কর্মসূচি হতে পারে না, এটি মূলত রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব।
রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও হাওরের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের রাজনৈতিক আলোচনায় উপকূলীয় অঞ্চল, নগর উন্নয়ন কিংবা শিল্পাঞ্চল প্রায়শই অগ্রাধিকার পায়; কিন্তু হাওর অনেক সময় কেবল দুর্যোগের মৌসুমে আলোচনায় আসে। ফলে হাওরের উন্নয়নও নীতিগত না হয়ে কেবল প্রকল্পকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে। এই প্রবণতা বদলানো জরুরি। কারণ হাওরের সংকট কেবল সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ বা নেত্রকোণার সংকট নয়; এটি জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা, মিঠাপানির মৎস্যসম্পদ এবং জলবায়ু অভিযোজন সক্ষমতার সংকট।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো সুশাসন। বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন, কিন্তু তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন জবাবদিহি নিশ্চিত করা। হাওরের মানুষ বহু বছর ধরে দেখে আসছে—প্রকল্প আসে, বরাদ্দ আসে, প্রতিশ্রুতিও আসে; কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসে না। ফলে বাজেটের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে তা বাস্তবায়নের মাধ্যমে, শুধু মুখে ঘোষণার মাধ্যমে নয়।
বাস্তবতা হলো, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এক অর্থবছরে ৫০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া সরকারের পক্ষে হয়তো সম্ভব ছিল না। কিন্তু সেই বাস্তবতার অজুহাতে আড়াই হাজার কোটি টাকার বরাদ্দকে যথেষ্ট বলা যায় না। কারণ এই অর্থ হাওরের সামগ্রিক রূপান্তরের জন্য নয়, বরং বিচ্ছিন্ন কয়েকটি জরুরি প্রয়োজন মেটানোর জন্য রাখা হয়েছে।
হাওরের জন্য এখন প্রয়োজন পৃথক ও দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার। প্রয়োজন একটি 'হাওর পুনরুদ্ধার ও জলবায়ু সহনশীলতা মাস্টারপ্ল্যান', যেখানে নদী পুনঃখনন, কৃষি বীমা, জলবায়ু অভিযোজন, গবেষণা, মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ, দুর্যোগের পূর্বাভাস, সামাজিক সুরক্ষা এবং পরিবেশবান্ধব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে এক সুতোয় গাঁথা হবে। প্রয়োজন জাতীয় জলবায়ু তহবিলের একটি নির্দিষ্ট অংশ আইনগতভাবে হাওরের জন্য বরাদ্দ রাখা। অর্থাৎ, প্রয়োজন সাময়িক প্রকল্পের বদলে দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত অগ্রাধিকার।
রাসেল আহমদ সাংবাদিক ও সমাজকর্মী। ই-মেইল: [email protected]